ঈদপরবর্তী রাজনীতি

বিশ্বজিত রায় :
চলছে শোকাবহ আগস্ট। রাজনীতিতে আগস্টের বৃহত্তর প্রভাব রয়েছে। জনকহারা জাতির কাছেও আগস্ট হাজির হয় বেদনার বীভৎস যন্ত্রণা নিয়ে। এই শোকাতুর আগস্টে বর্তমান রাজনীতির ধারা কোন পথে এগিয়ে চলছে। নির্বাচন সম্মুখে দাঁড়িয়ে রাজনীতির গতি-প্রকৃতি অনেকটা সুনসান। টুকিটাকি বক্তব্য পাল্টা বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ বর্তমান রাজনীতির পথচলা। তবে ঈদপূর্ব রাজনীতি কিছুটা অস্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে গেলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দক্ষতায় রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। ছাত্র আন্দোলনে রাজধানী শহর ঢাকা অরাজক পরিবেশের মুখোমুখি হলে ছাত্রদের সেই অহিংস আন্দোলনে সওয়ার হয়ে বিএনপি রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের সেই প্রচেষ্টা গুড়েবালি।
ক্ষমতাসীনদের সুচিন্তিত কৌশলের কাছে আবারো মাঠের বিরোধী দল বিএনপির ঘটে রাজনৈতিক পরাজয়। এ ছাড়া ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সরকার বিরোধী একটা মহল বিভ্রান্তি, বানোয়াট ও মিথ্যা প্রচারণায় সাধারণ মানুষের মাঝে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে রাজনীতিতে সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করে। অভিশপ্ত রাজনীতির ধোকাবাজ এই চক্র সোশ্যাল মিডিয়ায় সর্বদা অসত্য তথ্য ও ছবি প্রচার করে বর্তমান সরকার তথা রাজনীতির সুস্থ ধারাকে বেকায়দায় পতিত করার অপচেষ্টা চালায়। এ ছাড়া সরকার সমর্থিত ছাত্রলীগের বাড়াবাড়ির খবরও রাজনীতিতে উত্তাপ সৃষ্টি করে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় ঈদপূর্ব এই অরাজকতা থমকে যায়। রাজনীতিতে ফিরে আসে শান্ত স্বাভাবিক পরিবেশ।
ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত আমেজ কাটিয়ে রাজনীতি এখন নির্বাচনের প্রহর গুনছে। গত ১৬ আগস্ট নির্বাচন কমিশন থেকে আগামী নভেম্বরে তফসিল এবং ডিসেম্বরের শেষে ভোটের ঘোষণা দেয়ার পর দেশজুড়ে ভোটের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। এ জন্য ঈদের আনন্দঘন মুহূর্তেও নির্বাচনমুখী রাজনীতি ছিল অনেকাংশে চাঙ্গা ও তৎপর। রাজধানী শহরের রাজনীতি পাড়া ছেড়ে রাজনীতিকরা জেলা শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছুটে গিয়েছিলেন ভোট রাজনীতির আলো ছড়াতে। ঈদ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তারা সাধারণ মানুষের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। উদ্দেশ্য নির্বাচনমুখী রাজনীতির প্রার্থী সম্ভাব্যতা জানান দেয়া এবং সরকার কর্তৃক উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সফলতার চিত্র তুলে ধরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষে ভোট প্রার্থনায় শামিল হওয়া। এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই বিএনপি। সরকারের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কথা জানান দিয়ে এক ধরনের মৌন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে দলটির নেতৃস্থানীয় নেতারা। নির্বাচনবিমুখ বিএনপি অনেকটা নীরবে ভোট রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করছে। রাজনীতির মাঠে আওয়ামী লীগ-বিএনপি ছাড়াও অন্যান্য ক্ষুদ্র সমমনা দলও রয়েছে সরব। এক কথায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বর্তমান রাজনীতি পুরোদস্তুর নির্বাচনমুখী। আর মাস দুয়েক পরেই বেজে উঠবে নির্বাচনের হাঁকডাক। সেই প্রস্তুতিতেই ব্যস্ত রাজনীতি।
ঈদপরবর্তী রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের আশা করে সাধারণ মানুষ। সরকার ও সরকার বিরোধী দল ঈদের মতো সর্ববৃহৎ উৎসবকে সামনে রেখে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে শান্ত থাকার চেষ্টা করে। এ সময় কঠোর কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হয় না পক্ষ বিপক্ষ রাজনৈতিক বলয়। উভয় পক্ষের গম্ভীর রাজনীতি দেখে সাধারণ মানুষ ভেবে নেয় হয়তো ঈদের পর ভিন্ন রূপে দেখা যেতে পারে রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে। কিন্তু বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতা দেখলে, ঈদপরবর্তী রাজনীতিতে তেমন কোনো তারতম্য ধরা পড়েনি। যদিও কোনো কোনো রাজনৈতিক দল বরাবরই বলে আসছে ঈদের পর এইটা করব, রোজার পর সেইটা করব। মানে আন্দোলন জমিয়ে তোলার হুমকি-ধমকির সস্তা বয়ান অবশেষে অনর্থক বুলিতে পরিণত হয়। তাই ঈদপরবর্তী রাজনীতিতে বিশেষ কিছু হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবে অন্যান্য ঈদের অতীত বাস্তবতা থেকে সদ্য গত হওয়া ঈদপরবর্তী সময়ের তাৎপর্য অনেকটা ভিন্ন। কারণ নির্বাচনের একেবারে কাছাকাছি মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি। এ ছাড়া ১৫ আগস্টের শোক ও ২১ আগস্টের নির্মমতা মাথায় নিয়ে এবারকার ঈদুল আজহা অতিবাহিত হয়েছে। ইতিহাসের কলঙ্কিত নগণ্যতম নজির দুটি বাঙালি ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্য যেমন অত্যন্ত বেদনার তেমনি রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বে কাবু বিএনপির জন্য বেদনাহীন বিষয় বটে।
এবার ঈদপূর্ব সময়ে ২১ আগস্টের ভয়াবহ দিনটি স্মরণ করে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার কথা বলতে গিয়ে আইনমন্ত্রী এ মামলার রায় সেপ্টেম্বরের হওয়ার আভাস দেন। আইমন্ত্রী আনিসুল হক ইতিমধ্যে গণমাধ্যমকে জানিয়ে দিয়েছেন ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার কাযক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে। সেপ্টেম্বরের মধ্যেই এই মামলার রায় হয়ে যাবে। ক্ষমতাসীনদের মুখে এমন বক্তব্য শোনে বিএনপির অন্তর্জ্বালা বেড়ে গেছে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে তখনকার বিএনপি ও জামায়াত জোট সরকারের পরোক্ষ মদদে পরিচালিত এই বীভৎস অপকর্মের বিচারের রায় সম্পর্কিত বিষয়টিকে কেন্দ্র করে রাজনীতি অনেকটা উত্তপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ সংক্রান্ত বিষয়টিতে আওয়ামী লীগ-বিএনপির পাল্টাপাল্টি অভিযোগে ঈদপরবর্তী রাজনীতি এক ভিন্নরকম আবহে বন্দি হয়ে পড়েছে।

হিসাব-নিকাশ
নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ ফেলে রাজনীতিতে এখন ২১ আগস্ট হামলা মামলার বাহাস শোনা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ বলছে, রায়ের পর তারা রাজনৈতিক সংকটে পড়বে। আর বিএনপির অভিযোগ, এটি হবে ফরমায়েশি রায়। তবে ক্ষমতাসীন রাজনীতি এক্ষেত্রে প্রকৃত আসামিদের সর্বোচ্চ সাজার প্রত্যাশায় নির্ভার থাকলেও এ নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্ব দোষী সাব্যস্থ হলে দলটি রাজপথ সরগরম করবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। কিন্তু সংবাদপত্রের বরাতে বিএনপি সূত্র জানায়, আগামী মাসে রায় ঘোষণা হলেও রাজপথ গরম হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ এ ইস্যুতে বিএনপির বড় কোনো আন্দোলনে যাওয়ার পরিকল্পনা নেই। বিক্ষিপ্ত কিছু কর্মসূচি থাকতে পারে। তার মানে ঈদপরবর্তী রাজনীতি জ্বলে ওঠার তেমন সম্ভাবনা নেই।
বর্তমান রাজনীতির অবস্থান
বর্তমান রাজনীতিতে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। উন্নয়ন অগ্রগতি সফলতায় টানা দুই মেয়াদ অতিক্রম করার শেষ প্রান্তে অবস্থান করা আওয়ামী লীগের রাজনীতি তাই ফুরফুরে। নির্বাচন নিয়ে কোনো ধরনের জটিলতা সংশয় কাজ করছে না আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন চৌদ্দ দলীয় মহাজোটে। জোটপ্রধান শেখ হাসিনার নেতৃত্ব পরিপক্কতায় গা ভাসানো আওয়ামী লীগ নির্বাচন ভাবনায় দুর্বল নয়। আর এদিকে ভাবনাব্যাকুল বিএনপি একেবারে মুমূর্ষু প্রায়। নির্বাচন বর্জন ও অপসিদ্ধান্ত গ্রহণই বিএনপিকে পথে এনে দাঁড় করিয়েছে। যেনতেন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করা আওয়ামী লীগের যোগ্যতর নেতৃত্বে ধরাশায়ী বিএনপি এখন অভিভাবকহীন এতিমের মতো সংলাপের প্রার্থনা করছে। নির্বাচন সন্নিকটে দাঁড়িয়ে বিএনপি এতটাই দুর্বল যে, আন্দোলনে নামার সাহস দেখাতে পারছে না। একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সরকারের বিরোধিতা করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়াই বিএনপিকে ভগ্ন রাজনীতির প্রতীক বানিয়েছে। দলীয় চেয়ারপার্সন জেলে এবং দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান বিদেশের মাটিতে থাকায় রাজনীতি থেকে অনেকটা ছিটকে পড়েছে বর্তমান বিএনপি। দেশের বৃহৎ এই দলটির ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা বিষয়ে দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ৪টি নির্দেশনা দিয়েছেন বলে পত্রিকান্তরে জানা গেছে। তিনি জাতীয় ঐক্যের চেয়ে দল ও জোটের ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বেশি। বিএনপি প্রধানের চার নির্দেশনার মধ্যে রয়েছেÑ আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতি, নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকা, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের বক্তব্যের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন এবং তার মামলা পরিচালনার বিষয়ে কোনো রকম ভুল না করে সতর্কতা অবলম্বন করা। ঈদপরবর্তী বিএনপি মহাসচিব কারাগারে দেখা করতে গেলে বেগম জিয়া এই নির্দেশনা দেন। এতে বর্তমান বিএনপির ভঙ্গুর রাজনীতি কতটুকু চাঙ্গা হবে তা সময়ই বলে দেবে। বিএনপির ভুলের ধারাবাহিকতা ক্ষমতাসীনদের রাজনীতিকে আরো শক্তিশালী করেছে। ভুলের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে একসময় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে বিএনপি। আর দেশের বৃহৎ এই দলটি রাজনীতির মাঠে না থাকলে একনায়কতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। গণতন্ত্রের স্বার্থে বিএনপিকে আবারো রাজনীতির সুস্থ ধারায় ফিরে আসতে হবে।

নির্বাচনপূর্ব রাজনীতিকের চরিত্র
নির্বাচন উত্তাপে উš§ত আমাদের রাজনৈতিক চরিত্রগুলো। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মাটি মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছেন তারা। নির্বাচনকে সামনে রেখে জনসংযোগ, সভা-সমাবেশ করে যাচ্ছেন। নির্বাচন বৈতরণী পার হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে এ দেশের রাজনীতিক চরিত্রে এক ধরনের মৌন ও ভদ্র ভাব ফুটে ওঠে। তারা এ সময় সাধারণ মানুষের সঙ্গে সুবোধ বালকের মতো আচরণ করেন। দয়া-মায়া, দান-খয়রাত, সাহায্য-সহযোগিতার ক্ষেত্রে যেন চাক্ষুস দেবদূতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। কথার ফুলঝুরিতে যেমন থাকে সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়ার প্রাণপণ প্রচেষ্টা তেমনি আদর-আপ্যায়নে হয়ে ওঠেন অতি আপনজন। অজপাড়াগাঁয়ের মাটি-ঘামে আচ্ছন্ন পরিশ্রান্ত মানুষটিকে বুকে টেনে নিয়ে শোনান জীবনবিলাসী কথাবার্তা। হাতে হাত মিলিয়ে চলে কুশল বিনিময় জিজ্ঞাসা। মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ দোয়া চাওয়ার নমুনা দেখলে হƒদয়ে আশার সঞ্চারিত হয়। অজান্তেই মন বলে ওঠে, এমন নেতাই আমাদের প্রয়োজন। সাধারণ মানুষকে ঘায়েল করার এমন মার্জিত আচরণ হরহামেশাই আমাদের সামনে ভেসে উঠছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসে রাজনীতিকের চরিত্রে ভালোবাসা ও ভদ্রতা ততই অধিক আকার ধারণ করে। তখন তাদের কোমল মনটা যেন শুধু জনসেবাই করতে চায়। জনগণের সার্বিক কল্যাণ ব্যতীত অন্যকোনো ভাবনা রাজনৈতিক নেতার নির্মল অবয়বে দেখা মেলে না। রাজনীতির সঙ্কুচিত মাঠে নির্বাচনকালীন সময়টায় রাজনৈতিক চরিত্রে কিছুটা হলেও সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতি এসে ভর করে। তখন বদলে যায় পরিবেশ, বদলে যায় রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতি। নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নেতাদের চালচলন ও চলাফেরার শুচিশুদ্ধ নমুনা মানুষকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে বাধ্য করে। এভাবেই এগিয়ে যায় নির্বাচনমুখী রাজনীতি।

নির্বাচনপরবর্তী রাজনীতিকের চরিত্র
নির্বাচন পরবর্তী রাজনীতিকের চরিত্রে পরিবর্তনের আমূল সুর বেজে ওঠে। ঘরে ঘরে চষে বেড়ানো বেচারা তখন যোগ্য জনপ্রতিনিধি। চেহারা ও অঙ্গসজ্জায় চাকচিক্য ভাব। সাধারণ মানুষ তখন তার কাছে ঘেঁষার সাহস পায় না। নির্বাচনপূর্ব কথাবার্তা ভুলে গিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন সর্বেসর্বা। ক্ষমতার পঙ্খিরাজ ঘোড়া তাকে বিপথে পতিত করে। প্রতিশ্রুতির পূর্বকথা নির্বাচিত নেতার কাছে তখন অপ্রিয় হিসেবে ধরা দেয়। ভোগবিলাসিতায় আড়ষ্ট রাজনীতিক চরিত্রটির কাছে সাধারণ জনগণ জঞ্জালে পরিণত হয়। নির্বাচিত হওয়ার পর রাজনীতিক নামধারী এসব নেতা রাজনীতির সুস্থ ধারাকে কলঙ্কিত করছে বৈকি। আমাদের দেশের ভোট বাস্তবতায় শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনই নয়, স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাও একই আচরণ করে থাকেন। নির্বাচনকালীন সময়ে এক ধরনের আচরণ, নির্বাচন পরবর্তী আরেক ধরনের আচরণ সাধারণ মানুষকে উপহার দেয় কষ্টভরা থলে। নির্বাচিত নেতৃত্ব শুধু প্রতিশ্রুতির বড়খেলাপই করছে না, ক্ষমতার দাপট তাদেরকে এমন পর্যায়ে নিয়ে দাঁড় করায় যেন তারা এলাকায় বিবেকভ্রষ্ট বিচারহীন অবিচারসুলভ এক মহাজন হিসেবে আবির্ভূত হন। এমন আচার-ব্যবহার মানুষ আশা করে না। সাধারণ মানুষ তাদের ভোট আমানতে জয়ী মানুষটাকে দুঃখ-দুর্দশায় সর্বদা পাশে চান।

প্রতিশ্রুতির রাজনীতি
রাজনীতিতে প্রতিশ্রুতি থাকবে। থাকবে অতিকথন। প্রতিশ্রুতি রক্ষার বাস্তবতা যেমন থাকবে তেমনি থাকবে প্রতিশ্রুতিহীন আলোচনা সমালোচনা। আমাদের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষা না রক্ষার রাজনীতি নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। আমাদের রাজনীতিতে রয়েছে প্রতিশ্রুতির ব্যাপক আধিপত্য। এ দেশের রাজনীতিবিদরা কথায় কথায় প্রতিশ্রুতি দিয়ে সস্তা ভালোবাসা কুড়িয়ে নেয়ার ভেল্কিবাজিতে সর্বদা গা ভাসান। ক্ষমতা পেলে তারা যেমন প্রতিশ্রুতির বিরুদ্ধাচরণ করেন তেমনি মানুষ ঠকানোর প্রতিযোগিতায় বনে যান অন্যতম প্রতিযোগী। তাই প্রতিশ্রুতি বেচারা একশ্রেণির ভোগবিলাসী রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধির মুখনিসৃত ভ্রান্ত বাক্যবাণে আটকা পড়ে গেছে। গলাটিপে হত্যা করা প্রতিশ্রুতির একটি উদাহরণ তুলে ধরতে চাই। ‘আমি কাজের লোক হতে চাই। আপনার বাড়ির কাজের লোক মনে করে আমায় একটু সুযোগ দিন।’ আহারে কী মধুর বাক্যবাণ! সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলার মুখরোচক কত কথাবার্তা। একেবারে অনুনয়-বিনয়ের সুরে ভোট প্রার্থনা। ব্যবহারে কত মার্জিত বাচনভঙ্গি। মনে হয় কোনো মহানুভব ব্যক্তি। বলতে চাচ্ছি আমার এলাকার নির্বাচিত এক ইউপি চেয়ারম্যানের নির্বাচনপূর্ব আচরণের আংশিক বাস্তবতা। কিন্তু চেয়ারম্যান হওয়ার পর সহজেই ভুলে গেলেন প্রতিশ্রুতির প্রজ্ঞাবাণ অতীত স্মৃতি। তিনি এখন কাজের লোক থেকে চেয়ারম্যান বাবু। হাওর দুর্নীতির দুরন্ত বালক। গুণধর এই চেয়ারম্যান ভোট প্রার্থনার মাঠে যাদের তিনি কাজের লোক হিসেবে সুযোগ দানের কথা বলেছিলেন শেষ পর্যন্ত ওই কৃষক ভোটারদের বারোটা বাজিয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন। অসময়ের পানিতে হাওর তলিয়ে যাওয়ার ভয়ে ভাবনাব্যাকুল কৃষকরা যখন বাঁধ রক্ষার কাজে বাঁধে ব্যতিব্যস্ত তখন ওই ‘কাজের লোক’ চেয়ারম্যান বেটা নিখোঁজ এলাকাছাড়া। কৃষকের এই দুঃসময়ে ‘কাজের লোক’ বনার বিপরীতে তিনি ভাটির ভূমি হাওর পার ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার কারণটা কী হতে পারে একটু ভাবলেই হয়তো পেয়ে যাবেন প্রকৃত সত্যটা। এভাবে আমাদের রাজনীতিতে বইছে প্রতিশ্রুতির বন্যা। তাদের মুখে নির্বাচনপূর্ব কত কথাই শোনা যায়। পরবর্তীতে হারিয়ে ফেলেন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কথাবার্তা।

গণতন্ত্রের পথ
রাজনীতিতে দেশের বৃহত্তম দুই দল আওয়ামী লীগ বিএনপি ছাড়া অন্যান্য দলের প্রতি তেমন কোনো আগ্রহ নেই মানুষের। মাঝেমধ্যে জাতীয় পার্টির নাম শোনা গেলেও চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মাতলামি কথপোকথনে আস্তা হারিয়ে ফেলেন সাধারণ মানুষ। আর ছোট-মাঝারি অন্যান্য দলের প্রতি আস্তা-বিশ্বাস কোনোটি নেই সাধারণ মানুষের। রাজনীতির জনপ্রিয় ধারা থেকে ছিটকে পড়া বেশ কয়েকজন রাজনীতিকের নেতৃত্বে সৃষ্ট কৃষক-শ্রমিক ও জনতা লীগ, গণফোরাম, বিকল্প ধারা, এলডিপি, নাগরিক ঐক্য ও বিএনএফের মতো দল নামকাওয়াস্তে টিকে থাকলেও ভোটের মাঠে এরা একেবারে জনসমর্থনহীন অকেজো সংগঠন হিসেবে পরিচিত। মাঝেমধ্যে এসব দল নেতৃত্বের মুখে গণতন্ত্র রক্ষা ও দেশ পরিচালনার দিকনির্দেশনামূলক নানা কথা শোনা যায়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এক সময়ের এই জাঁদরেল রাজনীতিকরা বর্তমান সরকারের অগণতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই করতে পারছেন না। সরকারকে বাধ্য করার মতো তেমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারছেন না তারা। এখন তারা ঈদপরবর্তী নির্বাচনমুখী রাজনীতিতে কতটুকু জনবান্ধব ভূমিকা রাখতে পারেন সেটাই দেখার বিষয়। তবে রাজনীতিতে সুস্থ ধারা ফিরে আসা জরুরি। এ জন্য সব রাজনৈতিক দলকেই গণতন্ত্রের চর্চা করতে হবে। ক্ষমতার মোহে আড়ষ্ট হয়ে বিপক্ষ বলয়কে চিরতরে নির্মূলের পথ পরিহার করতে হবে। রাজনীতির মাঠে ছোট-বড় সব দলকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীন দলসহ সব দলকে গণতন্ত্রের সঠিক পথে হাঁটতে হবে।
বর্তমান রাজনীতির শান্ত পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, আগামী নির্বাচন কি আদৌ সব দলের অংশগ্রহণে শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হবে, না আবার বিএনপিকে ছাড়াই আরেকটি অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখবে দেশবাসী? গণতান্ত্রিক রাজনীতির সর্বশেষ পরীক্ষা হচ্ছে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন গণতন্ত্র ও রাজনীতির অন্যতম অলঙ্কার হিসেবে বিবেচিত। দেশ পরিচালনার এই পবিত্র ভূষণ অর্থাৎ নির্বাচন রাজনীতিতে কড়া নাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বড় দুই দলকেই মনোযোগী হতে হবে। নিজেদের একগুঁয়েমি মনোভাব পরিবর্তন করে সুস্থ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ খুঁজতে হবে। এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীনদের দায়িত্বই একটু বেশি। তারা যেন মাঠের বিরোধী দল বিএনপিকে গণতান্ত্রিক অধিকার দিতে কার্পণ্য না করে। সুস্থ রাজনীতির স্বার্থে সুস্থ চিন্তা জরুরি।