ইসিতে আস্থাহীন বিএনপির শেষ ভরসাস্থল ইসিই!

ইসিতে আস্থাহীন বিএনপির শেষ ভরসাস্থল ইসিই!

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আস্থা নেই বলে রোজ রোজ অভিযোগ করা বিএনপির শেষ ভরসাস্থল হিসেবে দেখছে নির্বাচন কমিশনকেই। গণহারে গ্রেফতারের প্রতিকার পাওয়া এবং নির্বাচনে সমান সুযোগ নিশ্চিত করার দাবিতে নিত্যদিনই কমিশনে যাওয়া আসা এবং চিঠি চালাচালি চলছে দলটির পক্ষ থেকে। সর্বশেষ মনোনয়ন হারানো দলীয় প্রার্থীদের প্রার্থিতা ফেরানো সর্বোপরি বিএনপির কারাবন্দি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার প্রার্থিতা ফিরে পেতে সেই ইসিরই দ্বারস্থ হয়েছেন দলটির শীর্ষ নেতারা। অপেক্ষায় থাকছেন ইসির সুবিচারের আশায়। মুক্ত বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়েই নির্বাচনী মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতার খেলায় নামতে পারবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অনেকে।

বিএনপি অবশ্য ইসির প্রতি নিজেদের আস্থার বিষয়টি স্বীকার করছে না। কোথাও যাওয়ার জায়গা না থাকায় ইসিতেই আসতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানান দলটির নেতারা। তবে একবারে অস্বীকারও করছেন না কেউ। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বুধবার নির্বাচন কমিশনে এ বিষয়ে বলেন, আমরা নির্বাচন কমিশনের প্রতি যদি আস্থাশীল থাকতাম, তাহলে তো সরকারে এখন যারা আছেন, সরকারের প্রতিনিধিদের মতো একমাস পরে একদিন আসতাম। আমাদের তো প্রতিদিনই আসতে হচ্ছে। যেহেতু আমাদের যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই, তাই আস্থা থাকা না থাকার চেয়েও বড় প্রশ্ন তো হচ্ছে আমরা যাব কোথায়? আমাদের তো এখানেই আসতে হবে। সেজন্যই আসা।

এদিকে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে আপিল জমা দিতে নির্বাচন কমিশনে আসা বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক কায়সার কামাল বলেন, নির্বাচন কমিশনের প্রতি পূর্ণ আস্থা রয়েছে। খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র যে গ্রাউন্ডে বাতিল হয়েছে তা এখানে প্রযোজ্য নয়। ইসি সংবিধান ও আইন অনুসরণ করলে এবং বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে বিশ্বাসযোগ্য সিদ্ধান্ত নিলে খালেদা জিয়া প্রার্থিতা ফিরে পাবেন।

রিটার্নিং কর্মকর্তাদের মনোনয়নপত্র বাতিলের আদেশের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে গত তিনদিন ধরে আপিল চললেও দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে আপিল করেননি কেউ। যে কারণে সবাই ধরেই নিয়েছিলেন বিএনপিতে খালেদার সময় ফুরিয়েছে। কিন্তু আপিলের শেষ দিনে গতকাল বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র ‘আইনবহির্ভূতভাবে’ বাতিল হয়েছে দাবি করে তার প্রার্থিতা ফিরে পেতে তিন আসনের জন্য একইসঙ্গে তিনটি আপিল করা হয়েছে। তিন আইনজীবী তিন আসনে খালেদা জিয়ার পক্ষে ইসিতে আপিলের আবেদন জমা দেন। ফেনী-১ আসনে কায়সার কামাল, বগুড়া-৬ আসনে নওশাদ জমির এবং বগুড়া-৭ আসনে মাসুদ আহমেদ তালুকদার এসব আবেদন জমা দেন।

আপিল আবেদন জমা দিয়ে আইনজীবী কায়সার কামাল সাংবাদিকদের বলেন, রিটার্নিং অফিসার আইন বহির্ভূতভাবে, অন্যায়ভাবে বিএনপি চেয়ারপার্সনের তিনটি মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন। এটা সরকারের ষড়যন্ত্রেরই অংশ। আমাদের কাছে প্রদত্ত ক্ষমতা বলে তিনটি আসনে প্রার্থীর পক্ষে আপিল দায়ের করলাম। আইন নিজস্ব গতিতে চললে খালেদা জিয়া প্রার্থিতা ফিরে পাবেন বলে দাবি করেন বিএনপির এই আইন বিষয়ক সম্পাদক। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন ফেয়ারলি ডিসিশন নিলে ইসি থেকে খালেদা জিয়ার পক্ষে রায় পাব আশা করি। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য জাতি অপেক্ষা করছে। খালেদা জিয়া ছাড়া নির্বাচন হলে তা প্রহসনের নির্বাচন হবে। দেশ ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য খালেদা জিয়ার সুবিচার চাই আমরা।

দুই বছরের বেশি দণ্ডের পর নির্বাচনে অযোগ্যতার বিষয়ে নির্বাচনী আইনের বাধ্যবাধকতা ও ভোটে অযোগ্যতায় আদালতের আদেশের পরও কীভাবে আপিলে খালেদা জিয়ার প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে কায়সার কামাল বলেন, একেকটা কেসের ধরন একেক রকম। খালেদা জিয়ার কেসটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমরা আশা করি, ইসি আইন ও সংবিধান অনুসরণ করবেন। ইসি নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। দেশনেত্রীর বিষয়ে বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে, পক্ষপাতিত্ব না করে খালেদা জিয়া যেভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন সে ব্যবস্থা করবেন ইসি।

এদিকে বুধবার বিকেলে নির্বাচন ভবনে কমিশন সচিবের কাছে চিঠি দিতে আসা বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল মুক্ত বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়েই বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সাংবাদিকদের কাছে তিনি বলেন, আমরা সর্বশেষ সময় পর্যন্ত আশাবাদী যে, মুক্ত বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়েই আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব। তিনি বলেন, যাদের প্রার্থিতা প্রাথমিক পর্যায়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা কর্তৃক বাতিল বলে ঘোষিত হয়েছে। সেগুলো আপিলের যে কর্মকাণ্ড এখন চলছে, এ কর্মকাণ্ড বিস্তৃত করা হয়েছে আগামী ৮ তারিখ পর্যন্ত। আমাদের পক্ষ থেকে আমরা বলেছি এটা ৮ তারিখ পর্যন্ত না নিয়ে ৬ এবং ৭ তারিখের মধ্যে সম্পন্ন করা যায় কিনা। অথবা নির্বাচন কমিশনের নিজেরদের বিবেচনা প্রসূত কোনো পদ্ধতিতে অতিদ্রুত সম্পন্ন করে দিলে প্রার্থীদের জন্য মঙ্গলজনক হবে। কারণ ৯ তারিখ হচ্ছে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। ৮ তারিখ ৫টা পর্যন্ত যদি এটি চলতে থাকে তাহলে অনেক ক্ষেত্রে এটি প্রার্থীদের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে একটি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি বলেন, গ্রেফতার ও হয়রানি বাণিজ্য এখনো চলছে। বাম্পার ফলন যেভাবে হয়, সেভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও গ্রেফতারের বাম্পার ফলন শুরু করা হয়েছে। মঙ্গলবারও একজন মহিলা কমিশনারসহ কয়েক প্রার্থীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ওইদিন কোম্পানীগঞ্জে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের গাড়িতে সশস্ত্র হামলা করা হয়েছে। সেটিও অবহিত করেছি এবং এই গ্রেফতার বাণিজ্য বন্ধ করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে দ্রুত এবং জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য বলেছি।

মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে নিবন্ধিত ৮টি দল ছিল, বিএনপির প্রতীক ধানের শীষে যারা নির্বাচন করবে। পরবর্তী সময়ে সেখানে ১১টি দল হয়েছে। সে সম্পর্কিত একটি চিঠি ইসিকে আমরা আগেই দিয়েছিলাম। সেই চিঠিটি আবার দিয়ে পুনরায় মনে করিয়ে দিয়েছি, যাতে নির্বাচন কমিশন যে প্রচণ্ড কর্মযজ্ঞের মধ্যে আছেন, কোনো ধরনের ত্রুটির কারণে এ জিনিসটির মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি না হয়।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.