ইন্টারনেট ব্যবহারে ঝুঁকিতে শিশুরা

ইন্টারনেট একদিকে যেমন আশীর্বাদ, অন্যদিকে বয়ে নিয়ে এসেছে বিড়ম্বনা। বিশেষ করে শিশু-কিশোররাই এই বিড়ম্বনার শিকার বেশি হচ্ছে। বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ব্যাপকহারে বাড়ছে। গত ১৯ বছরে এই সংখ্যা ৮০০ গুণ বেড়েছে। বাংলাদেশে অনলাইন জনগোষ্ঠীর গড় বয়স ক্রমেই কমছে। এমনকি ১১ বছরের শিশুরাও প্রতিদিন ইন্টারনেটে প্রবেশ ও ব্যবহার করছে। যদিও ছোট শিশুদের তুলনায় বেশি বয়সী শিশুরা অনলাইনে ভয়ভীতির সম্মুখীন হওয়ার বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তবে ক্ষতিকর সামগ্রী, যৌন নিগ্রহ ও অপব্যবহার এবং ভয়ভীতির সম্মুখীন হওয়ার ঝুঁকি থেকে শিশুরা কখনোই মুক্ত নয়।

এ প্রসঙ্গে ইউনিসেফ সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৩২ শতাংশ শিশু অনলাইন সহিংসতা, অনলাইনে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ডিজিটাল উৎপীড়নের শিকার হওয়ার মতো বিপদের মুখে রয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি অনলাইনে শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা মোকাবিলা ও প্রতিরোধে সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।

মঙ্গলবার রাজধানীর কাওরান বাজারে সফটওয়্যার পার্কের সম্মেলন কক্ষে ইউনিসেফ আয়োজিত ‘বাংলাদেশে শিশুদের জন্য অনলাইন নিরাপত্তা’ বিষয়ক সম্মেলনে এই বিষয়গুলো উঠে আসে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার।

‘বাংলাদেশে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা’ শিরোনামে ইউনিসেফ বাংলাদেশ পরিচালিত সাম্প্রতিক এক সমীক্ষার জন্য দেশের স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার ১ হাজার ২৮১ জন স্কুল-বয়সী (১০ থেকে ১৭ বছর) শিশুর ওপর জরিপ পরিচালনা করা হয়, যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করে। বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধের মধ্যে ধর্মীয় উস্কানি দেয়ার বিষয়টিও সমীক্ষায় উঠে এসেছে। জরিপে অংশগ্রহণকারী প্রায় ১০ শতাংশ শিশু ধর্মীয় উস্কানিমূলক বিষয়বস্তুর মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ করে। কিশোর বয়সীরা (১৬ থেকে ১৭ বছর) অন্য বয়সী শিশুদের তুলনায় অনেক বেশি এই ধরনের উস্কানিমূলক বিষয়বস্তুর সম্মুখীন হয়।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ২৫ শতাংশ শিশু (১০-১৭ বছর বয়সী) ১১ বছর বয়সের আগেই ডিজিটাল জগতে প্রবেশ করতে শুরু করে। এ ছাড়া, শিশুদের একটি বড় অংশ (৬৩%) প্রাথমিকভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের স্থান হিসেবে তাদের নিজেদের কক্ষটিকেই ব্যবহার করে। এটা ‘বেডরুম কালচার’-এর ব্যাপকতা নির্দেশ করে, যা অপেক্ষাকৃত কম নজরদারির মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে।

বাংলাদেশে উচ্চমাত্রায় অনলাইনে প্রবেশাধিকারে সুযোগ ও ব্যবহারের দিক থেকে ছেলেরা (৬৩%) মেয়েদের (৪৮%) চেয়ে এগিয়ে আছে। ইন্টারনেটে নিয়মিত সবচেয়ে বেশি যে দুটি কাজ করা হয় তা হচ্ছে, অনলাইন চ্যাটিং (বার্তা আদান-প্রদান) ও ভিডি দেখা। প্রতিদিন গড়ে ৩৩ শতাংশ সময় অনলাইন চ্যাটিং এবং ৩০ শতাংশ সময় ভিডিও দেখা হয়ে থাকে। সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে, ৭০ শতাংশ ছেলে ও ৪৪ শতাংশ মেয়ে অনলাইনে অপরিচিত মানুষের বন্ধুত্বের অনুরোধ গ্রহণ করে। এমনকি জরিপে অংশগ্রহণকারীদের একটি অংশ তাদের নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলে সেই অনলাইন ‘বন্ধুদের’ সঙ্গে সরাসরি দেখা করার কথাও স্বীকার করে।

সম্মেলনে মোস্তাফা জব্বার বলেন, শিশুদের জন্য ইন্টারনেট নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অ্যাপসহ খারাপ কন্টেন্ট ফিল্টারিংয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিশুদের ইন্টারনেট সম্পর্কে সচেতন বাড়াতে প্রাথমিক স্তর থেকে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা অপরিহার্য। তিনি বলেন ডিজিটাল শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের ডিজিটাল হতে হবে, একই সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি এডুয়ার্ড বেগবেদার বলেন, শিশু অধিকার বিষয়ক কনভেনশন গ্রহণের এবং ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব’ সৃষ্টির ৩০ বছর পর সরকার, পরিবার, শিক্ষাক্ষেত্রে ও বেসরকারি খাতের জন্য শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠীকে ডিজিটাল নীতিমালার কেন্দ্রে রাখার এখনই সময়। ইন্টারনেটের সবচেয়ে খারাপ দিক থেকে সুরক্ষিত রেখে সবচেয়ে ভালো দিকগুলো ব্যবহারের সুযোগ তীর করার মাধ্যমে, আমরা প্রত্যেকে ভালোর জন্য ভারসাম্য আনতে সহায়তা করতে পারি।

মোস্তাফা জব্বার এ সময় বলেন, শিশুরা কিভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের মনে রাখতে হবে শিশুদের কাছে আমরা কী কন্টেন্ট দিচ্ছি? শিশু উপযোগী কন্টেন্ট আমরা ইন্টারনেটে রাখিই না। শিশু পছন্দ করে এমন কন্টেন্ট দরকার। তিনি বলেন শিশুদে জ্ঞানার্জনের পদ্ধতির সঙ্গে আমাদের বিদ্যমান পদ্ধতিটি বিপরীতমুখী। সরকারের এখনকার চেষ্টা হচ্ছে শিশুসহ নাগরিকদের খারাপ কন্টেন্ট থেকে রক্ষা করা। আবার খারাপ কন্টেন্টগুলোর উৎপত্তিস্থল কিন্তু বাংলাদেশ নয়। সে জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ আমাদের জন্য। আরো একটি বড় বিষয় হচ্ছে, যারা কন্টেন্টগুলো দুনিয়াব্যাপী ছড়াচ্ছেন তারা তাদের নিজেদের স্ট্যান্ডার্টে চলেন, আমাদের স্ট্যান্ডার্টে চলেন না। তবে এক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। আমাদের দেশের আইন পরিপন্থী অনেক বিষয়ের প্রতি তারা সম্মান দেখাতে সম্মত হয়েছে। এটাও ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের একটি বড় সফলতা। ডিজিটাল প্রযুক্তি বিশেষ করে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা গত দশ বছর আগেও ছিল মাত্র ৮ লাখ । বর্তমানে তা প্রায় ৯ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। এটাও সরকারের বিশাল এক অর্জন। তিনি বলেন, ইন্টারনেট থেকে শিশুদের নিরাপদ রাখতে অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। অভিভাকদেরও নিরাপদ ব্যবহারের দক্ষতা প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। প্যারেন্টাইল গাইড নামে ইন্টারনেটের একটা অপশন আছে যা প্রয়োগের মাধ্যমে খারাপ কন্টেন্ট থেকে শিশুদের নিরাপদ রাখা যায় বলে মন্ত্রী জানান।

তথ্য বা ডাটা নিরাপদ রাখা বর্তমান ডিজিটাল বিপ্লবের যুগে আরো একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে মোস্তাফা জব্বার বলেন, এই বিষয়েও নজর দেয়া হবে। ইতোধ্যে কন্টেন্ট ফিল্টারিং করার সক্ষমতা বাংলাদেশ অর্জন করেছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, আগামী মার্চে এ প্রযুক্তি চালু করা সম্ভব। এটি চালু হলে পর্নোসহ বিপথগামী অনেক সাইট বন্ধ করে শিশুদের রক্ষা করতে পারব।

এডুয়ার্ড বেগবেদার বলেন, বাংলাদেশ এবং বিশ্বব্যাপী শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠীর কথা আমরা শুনেছি এবং তারা যা বলছে তা পরিষ্কার- ইন্টারনেট একটি নির্দয় মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। এ জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট দিবসে ইউনিসেফ তরুণ জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব অনুসরণ করছে ও অনলাইনে তাদের প্রতি সদয় হতে সবার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে। একই সঙ্গে সবার জন্য, বিশেষ করে শিশুদের জন্য ইন্টারনেটকে নিরাপদ একটি জায়গায় পরিণত করতে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণেরও আহ্বান জানাচ্ছে ইউনিসেফ।

প্রসঙ্গত, অনলাইনে হয়রানী এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন ব্যাপক ক্ষতির কারণ হতে পারে। কারণ এটা দ্রুত অনেকের কাছে পৌঁছে যেতে পারে এবং অনলাইনে অনির্দিষ্টকাল ধরে এগুলো থেকে যেতে পারে। অন্য শিক্ষার্থীদের তুলনায় যারা অনলাইনে ভয়ভীতির শিকার হয়, তাদের অ্যালকোহল ও মাদকে আসক্ত হওয়ার এবং স্কুল ফাঁকি দেয়ার হার বেশি। এ ছাড়া তাদের পরীক্ষায় ফল খারাপ করা, আত্ম-সম্মান কমে যাওয়া ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দেয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে। চরম পরিস্থিতিতে, অনলাইনে ভয়ভীতি প্রদর্শন এমনকি আত্মহত্যার দিকেও ঠেলে দিতে পারে।

মানবকণ্ঠ/এআর

Leave a Reply

Your email address will not be published.