ইতিহাস আর ঐতিহ্যে মোড়ানো সেই ঠাকুরবাড়ি

হাজি মোহাম্মদ মহসীন:
ঢাকা থেকে ২৬ কিলোমিটার পাড়ি জমালেই মোগরাপাড়া বাসস্ট্যান্ড। গুনতে হবে ৫৫/৬০ টাকা। সময় লাগবে ৪৫/৬০ মিনিট। এখান থেকে হাড়িয়া চৌধুরীপাড়া সিএনজি চেপে যেতে লাগবে মাত্র ১৫/২০ টাকা ‘ঠাকুরবাড়িটি’ দেখতে। নান্দনিক সৌন্দর্যে ভরা বাড়িটি প্রথমে চোখে পড়বে। ঘুরে আসতে পারেন পরিবার-পরিজন নিয়ে যে কোনো ছুটির দিনে। ব্যানার্জির বাড়িটিতে মন জুড়াতে অনেকে আসেন প্রাচীন ইতিহাস আর ঐতিহ্যের মজা পেতে। বিষ্ণুপদ ব্যানার্জির বাড়ি এবং আশপাশের গাঁও-গ্রামগুলোতেও বর্তমানে আধুনিকভাবে কারুকাজ সুনিপুর্ণ নতুনভাবে ইমারত নির্মাণশৈলীতে তৈরি করা হয়েছে। প্রায় দেড়শ’ বছরের পুরনো ঐতিহ্য এবং ভ্রমণপিপাসু ও জ্ঞানপিপাসু পর্যটকদের মুগ্ধ করবে গ্রামের প্রাচীন নিদর্শনটি। ব্যানার্জির বাড়িটির নতুন প্রজšে§র কাছে দর্শনীয় ও মন জুড়ানোর অপূর্ব একটি জায়গা। এলাকার লোকজন এক সময় ‘ঠাকুরবাড়ি’ বলে জানলেও কালের বিবর্তনে সেই বাড়ির ইতিহাসটি হারিয়ে যেতে বসেছে। বর্তমানে এই ঠাকুরবাড়িটিই স্থানীয়দের কাছে একটি আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। যাই হোক গোড়ার দিকের কথা হচ্ছে, তৎকালীন বিষ্ণুপদ ব্যানার্জি নামে এক জমিদার ছিলেন। সম্মান দেখিয়ে ওই সময়ে স্থানীয়রা ব্যানার্জিকে ঠাকুর বলে সম্বোধন করতেন। তাই সেই বাড়িটি ‘ঠাকুরবাড়ি’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বিষ্ণুপদ ব্যানার্জি ও তার স্ত্রী, একমাত্র কন্যা বিভাবতী ও সৎভাই সতেন ব্যানার্জিকে নিয়ে বাড়িতে বাস করতেন। জনশ্রুতিতে আছে, প্রায় ৮ একর ৪০ শতাংশ জায়গা নিয়ে বসবাস করতেন ব্যানার্জি পরিবার। ব্যানার্জি পাক ভারত উপমহাদেশ ভাগাভাগির পর বাড়িঘর ফেলে চলে যান। তখন এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা একত্রিত হয়ে ব্যানার্জির বাড়িতে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করেন। ওই সময়ে যার নাম ছিল ‘বৈদ্যেরবাজার পাক হাইস্কুল’। বিভিন্ন কারণে বিষ্ণুপদ ব্যানার্জি বাড়িটি দেখভালের জন্য ভুবন মোহন দাস বাড়ির পাহারাদার ছিলেন। দীর্ঘ কয়েক বছর বাড়িতে থাকার পর যে কোনোভাবেই হোক কেয়ারটেকার (ভুবন মোহন দাস) মালিক হয়ে দাতা হিসেবে সেই বিদ্যালয়ের জন্য ১৯৬২ সালে কিছু জমি দান করেন। যার দলিল নং-৮২৯৯, পরিমাণ ছিল ২ একর ৩৭ শতাংশ। পরে ১৯৫৭ সালে বিদ্যালয়ের নাম বদল করা হয় বৈদ্যেরবাজার এনএএম মেমোরিয়াল ইনস্টিটিউশন। তারপর পর্যায়ক্রমে সর্বশেষ বিদ্যালয়টির সরকারিভাবে নামকরণ করা হয় বৈদ্যেরবাজার এনএএম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়। বৈদ্যেরবাজার এলাকার একমাত্র বিদ্যালয়টি স্থানীয়দের কাছে একটি আদর্শ বিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত লাভ করলেও এখনো মানুষ মধু ঠাকুরের বাড়ি হিসেবেই বিদ্যালয়টিকে চেনেন। বিদ্যালয়টি প্রশস্ত করতে পরবর্তীতে উত্তরাধিকার সূত্রে ১৯৯৪ সালে ৬১৯৬ নং দলিলে আরো ৪ একর ২৪ শতাংশ জমি দান করেন হাজি লাল মিয়া সরকার। কয়েক ভাগে জমিদানের পর বিদ্যালয়ের এরিয়া প্রশস্ত হলেও নতুনভাবে রাস্তা-ঘাট হওয়ার ফলে এরিয়াটা দিন দিন সঙ্কুচিত হতে দেখা যাচ্ছে। এলাকাবাসীর প্রশ্ন-ঠাকুর পরিবারের বাকি ১.৭৯ একর ভূমি কোথায় গেল? বৈদ্যেরবাজার এনএএম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের পাশাপাশি যেখানে একে একে প্রতিষ্ঠিত হয় হাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চবিদ্যালয়ের আওতায় পরিচালিত দুটি ভোকেশনালের জন্য (কারিগরি) ভবন এবং এসএসসি প্রোগ্রাম (বাউবি) ভবন। তবে বিদ্যালয়গুলো প্রাতিষ্ঠিত হলেও ব্যানার্জির বসতবাড়িটি এখনো রয়েছে প্রায় আগের মতোই। বাড়িটি চতুর্ভুজ একতলা আকৃতির ভবন। বাড়ির চারদিকেই রয়েছে বারান্দা। সৌন্দর্যের কমতি নেই একটুও। বাড়ির ভেতর-বাহির যাতায়াতের জন্য রয়েছে তিন দিকে রাস্তা। বাড়ির পূর্বদিকে ফটকের সামনেই রয়েছে শত বছরের একটি পুরনো কাঁঠাল ও লিচু গাছ। বাড়িটি পূর্বদিকে পাকা করা দুটি বসার ঘাটসহ একটি পুকুর ছিল। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঘাট দুটি ধ্বংস হয়ে যায়। তার পশ্চিম কোনো একটি পুকুর রয়েছে তাতেও একটি পাকা ঘাট ছিল, সেই ঘাটটিও ভেঙে যাওয়ার পর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তা নতুনভাবে নির্মাণ করার পরও সেটি নষ্ট হয়ে যায়। দক্ষিণে আরো একটি পুকুর ছিল। তা বালু দ্বারা ভরাট করে ঐতিহ্যকে নষ্ট করে দোকানপাট তৈরি করা হয়েছে। আর উত্তর দিকে লম্বালম্বি একটা খালের মতো ছিল। যার কারণে বাইরের মানুষ সহজে ঠাকুরবাড়িতে প্রবেশ করতে না পারে। এখন আর সে সব দেখা যায় না, যা কয়েক বছর আগেও দেখে মানুষ মন জুড়াত। চারদিকে সবুজের সমারোহের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ‘ঠাকুরবাড়ি’ আজো রয়েছে। কৃষ্ণপুরা গ্রামের নিবাসী মাহাবুব মামুন সিকদার বলেন, বিদ্যালয়টি যখন প্রতিষ্ঠা করা হয় তখন নানা সামসুল হক চেয়ারম্যান (দুদু) মাস্টারের ভূমিকাই সবার কাছ থেকে বেশি ছিল। যখন বিদ্যালয়টি শুরু করা হয় তখন বিদ্যালয়ে মাস্টার ছিল না, তখন তিনি শিক্ষার্থীদের পড়াতেন কিন্তু বেতন নিতেন না। এ কারণে সম্মান দেখিয়ে সামসুল হক ওরফে দুদু মাস্টার বলে ডাকতেন। দুদু মাস্টার হাজি নেকবর আলী সাহেবের দ্বিতীয় ছেলে। তবে নেই শুধু ঠাকুর পরিবার আর সেই সময়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্য। কালের বিবর্তনে সব কিছুই পরিবর্তন হয়েছে। সেই সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন আনেক নিদর্শন। যা আমাদের পরের প্রজšে§র জন্য রক্ষা করা খুবই জরুরি। বর্তমানে শুধু বিদ্যালয়ের দিকেই সবার দৃষ্টি। যা দৃষ্টিটা একটু ফিরিয়ে দেখা যায়, তাহলেই আপন মনে কৌতুহল জাগবে ইতিহাস জানার। আরো জানার ইচ্ছা থাকবে সোনারগাঁওয়ের বড় কুটুম জয়দেবপুর ভাওয়াল পরগনার রাজকুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায়ের শ্বশুরবাড়ি। বাড়িটি ঘিরে ঠাকুরের মেয়ে বিভাবতী ও ভাওয়াল সন্ন্যাসী রাজার কাহিনী রূপকথাকেও হার মানায় এমন কথা জনশ্রুতিতে আছে। হ্যাপি জার্নি ডেস্ক