ইতিহাসের সাক্ষী ঝিনাইদহের মিয়া দালান

আমাদের দেশে এক সময় জমিদারি শাসন ব্যবস্থা ছিল। স্থানীয় জমিদার বা শাসকরা বিলাসবহুল দৃষ্টিন্দন ইমারত নির্মাণ করতেন। একসময় জমিদারি শাসনের পতনও ঘটে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে রয়ে গেছে জমিদারদের সেই স্থাপত্য। যা পরিণত হয়েছে দর্শনীয় স্থানে। ঝিনাইদহে প্রায় ১৯০ বছর ধরে এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে জমিদারদের নিদর্শন ‘মিয়া দালান’। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার মুরারীদহ গ্রামে নবগঙ্গা নদীর উত্তরে এটি অবস্থিত। প্রতিদিন দেশ-বিদেশের পর্যটকরা এই বাড়ি দেখতে আসেন। তবে এটি অযত্ন আর অবহেলায় ধ্বংস হতে চলেছে। স্থানীয়রা দাবি জানিয়েছেন এটি সরকারিভাবে সংরক্ষণ করে পর্যটন কেন্দ্র করার।

ইতিহাস থেকে জমিদার সলিমুল্লাহ চৌধুরীর দ্বিতল এই বাড়িটি নির্মাণ করেন। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি মিয়া সাহেব বলে পরিচিত ছিলেন। সে জন্য এই বাড়িটির নাম মিয়ার দালান বলে পরিচিত। তার পিতার নাম বধুই বিশ্বাস। বধুই বিশ্বাস ছিলেন নলডাঙ্গা রাজবংশের একজন অন্যতম বিচক্ষণ দেওয়ান। যে কারণে সলিমুল্লাহ চৌধুরী ওরফে মিয়া সাহেব জীবন ইতিহাসে নলডাঙ্গা রাজবংশের সঙ্গে জড়িত। তিনি বহু ধন-সম্পত্তির মালিক ও বিলাসী ছিলেন। কথিত আছে বধুই বিশ্বাসের মৃত্যুর পর সলিমুল্লাহ নলডাঙ্গা রাজ বংশের অন্যতম মুসলমান কর্মচারী হিসেবে যথেষ্ট যোগ্যতার পরিচয় দেন এবং তাকে চৌধুরী উপাধি দেয়া হয়। সলিমুল্লাহ চৌধুরী মুরারী নামে নিম্ন বর্ণের এক হিন্দু রমণীর প্রেমে মুগ্ধ হয়ে তাকে বিয়ে করেন। পরবর্তী সময়ে তার নাম পরিবর্তন করে বিবি আসরফনেছা রাখা হয়।

প্রাচীন ঐতিহ্য অনুযায়ী ইমারতের প্রধান ফটকে নির্মাণকালের কথা কাব্যিকভাবে খোদাই করা আছে। তাতে লেখা আছে- ‘শ্রী, শ্রী রাম, মুরারীদহ গ্রাম ধাম, বিবি আশরাফুন্নেসা নাম, কি কহিবা হুরির বাথান। ইন্দ্রের অমরাপুর নবগঙ্গার উত্তর ধার, ৭৫,০০০ টাকায় করিলাম নির্মাণ। এদেশে কাহার সাধ্য বাধিয়া জল মাঝে কমল সমান। কলিকাতার রাজ চন্দ্র রাজ, ১২২৯ সালে শুরু করি কাজ, ১২৩৬ সালে সমাপ্ত দালান।’

খরস্রোত নবগঙ্গা নদীর ধারে ইটের গাঁথুনিতে এই বাড়িটি তৈরি। ধারণা করা হয় বাংলা ১২৩৬ সন ইংরেজি ১৮৩০ সালে বাড়িটি নির্মাণ করা হয়। হিসাব মতে, এই বাড়িটির বয়স প্রায় ১৯০ বছর। এই বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছে অনেক কষ্ট করেই। বাড়িটি দেখলে মনে হয় নদীগর্ভে এটি দাঁড়িয়ে আছে। চুন-সুড়কির সঙ্গে ইটের গাঁথুনিতে এই বাড়িটি তৈরি করা হয়েছে। বাড়িটির দেয়াল ২৫ ইঞ্চি পুরু। উত্তর-দক্ষিণে দৈর্ঘ্য প্রায় ৮২ ফুট। পূর্ব-পশ্চিমে এর প্রস্তর প্রায় ৬৬ ফুট। এই ভবনে ছোট বড় ১৬টি কক্ষ রয়েছে। দ্বিতীয় তলার ছাদের ওপর রয়েছে একটি চিলেকোঠা। শ্বেতপাথর দিয়ে আচ্ছাদিত এই চিলেকোঠা নামাজ ঘর হিসেবে তৈরি হয়েছিল। এই বাড়িটির পাশে একাধিক খেজুর গাছ আছে। যে গাছগুলোতে একাধিক মাথা ছিল। প্রতিটি মাথা থেকে রস আহরণ করা হতো।

ইতিহাস থেকে আরো জানান যায়, দেশ ভাগের সময় ১৯৪৭ সালে ভবনটি বিক্রি করা হয় সেলিম চৌধুরী নামের এক ব্যক্তির কাছে। তাই ভবনটিকে স্থানীয়ভাবে কেউ কেউ সেলিম চৌধুরীর বাড়ি বলেও জানে। বঙ্গাব্দ ১২৩৬ সনে নির্মাণ শেষ হওয়া এই ইমারতটি ঠিকঠাক মতো রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে এটি হতে পারে ঝিনাইদহ শহরের একটি উল্লেখযোগ্য বিনোদন কেন্দ্র। এটি দেখতে হলে আসতে হবে ঝিনাইদ আরাপপুর বাসস্ট্যান্ডে। এর পর মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে ইজিবাইক কিংবা রিকশাভ্যানে এই মিয়ার দালান জমিদার বাড়িতে যাওয়া যায়।

মানবকণ্ঠ/এএএম

Leave a Reply

Your email address will not be published.