ইজতেমায় না গিয়েই দেশ ছাড়ছেন সা’দ

কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে টঙ্গীর তুরাগ তীরে লাখো ধর্মপ্রাণ মুসল্লির অংশগ্রহণে আজ শুক্রবার বাদ ফজর আ’ম বয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে তবলিগ জামাতের ৫৩তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম দফা। মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় সমাবেশ ব্যাপক আতঙ্কের মধ্য দিয়ে এ ইজতেমা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও শের্ষ পর্যন্ত সরকারের হস্তক্ষেপে তবলিগ জামাতের দুই অংশের সমঝোতার মধ্যে এটি নিরসন হয়। শঙ্কা কাটলেও ইজতেমায় যোগ না দিয়ে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ ছাড়বেন দিল্লির মাওলানা মোহাম্মদ সা’দ কান্ধলভি। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বরাষ্টমন্ত্রী অসাদুজ্জামান খান কামাল এ তথ্য জানিয়েছেন। দ্বিতীয় দফায় ইজতেমা শুরু হবে আগামী ১৯ জানুয়ারি।

দিল্লির মাওলানা মোহাম্মদ সা’দ কান্ধলভির ঢাকায় আসা নিয়ে তবলীগের শূরা সদস্যদের মধ্যে সম্প্রতি মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। ইজতেমায় আসার আগেই সাদ কান্ধলভি নিজেকে তবলিগের আমির দাবি ও একই সঙ্গে কওমি শিক্ষা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করে বিতর্কিত হয়ে পড়েন। ফলে তার বিশ্ব ইজতেমায় যোগদান নিয়ে বাংলাদেশে তবলিগের মূল দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। একই সঙ্গে বিতর্কিত মন্তব্যের জের ধরে দিল্লির মুরুব্বি মাওলানা সা’দের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন ভারতের দেওবন্দের আলেমরা। এরই জের ধরে বাংলাদেশেও কওমি আলেমরা তাকে প্রতিহত করার ঘোষণা দেন। ইজতেমায় অংশ নিতে গত বুধবার মাওলানা সা’দ ঢাকায় এলে বিমানবন্দরেই তাকে প্রতিহতের উদ্দেশে তবলিগের একাংশ ও কওমিপন্থী আলেমরা প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। তবে গত বুধবার বিকেলে বিশেষ পুলিশ পাহারায় তাকে কাকরাইলের তবলিগ মসজিদে আনা হয়। এ ঘটনায় সেদিন বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকায় টানা ৭ ঘণ্টা যানজটে মারাত্মক দুর্ভোগ পোহাতে হয় রাজধানীবাসীকে।

অপরদিকে বিষয়টির কোনো সমাধান না হওয়ায় গতকাল বৃহস্পতিবার সা’দবিরোধীরা বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট এলাকায় আন্দোলন শুরু করে। এ অবস্থায় উদ্ভূত সমস্যার সমাধানে উভয়পক্ষকে গতকাল দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বৈঠকে বসার আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। বৈঠকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক বিশ্ব ইজতেমায় যোগ না দিয়েই বাংলাদেশ ছাড়তে হচ্ছে মোহাম্মদ সা’দ কান্ধলভিকে। তবলিগের দুই পক্ষকে নিয়ে টানা দুই ঘণ্টা বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, উনি ইজতেমায় যাবেন না। সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ থেকে চলে যাবেন। দু’পক্ষই এ সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো জানান, সা’দ যে ক’দিন বাংলাদেশে থাকবেন, কাকরাইল মসজিদেই থাকবেন, বৈঠকে ঠিক করা হয়েছে।

এদিকে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসল্লির ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠছে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দান। বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে টঙ্গী এখন ধর্মীয় উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে। পুরো এলাকা টুপি-পাঞ্জাবি পাজামা পরা মানুষে ভরে গেছে। ময়দানের আশপাশে চলছে মুসল্লিদের অজু, গোসল আর রান্নার আয়োজন। শাখা রাস্তাগুলোয় বাঁশের লাঠি হাতে অসংখ্য তবলিগি স্বেচ্ছাসেবক দাঁড়িয়ে রয়েছেন এবং উচ্চস্বরে বলছেন, ‘যার যার ডাইনে চলি ভাই, জিকিরে-ফিকিরে চলি ভাই’।

সরেজমিন দেখা গেছে, তুরাগ পাড়ের প্রায় ১৬০ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ইজতেমা মূল শামিয়ানা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এরই মধ্যে শীতের কুয়াশা উপেক্ষা করে দেশ-বিদেশ থেকে আসতে শুরু করেছেন মুসল্লিরা। মুসল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার্থে থাকছে বাস ও ট্রেনের বাড়তি ব্যবস্থা। বিদেশি নিবাসে উঠছেন ভারত, পাকিস্তান থেকে শুরু করে ইউরোপ, আমেরিকাসহ পৃথিবীর নানা দেশের মুসল্লিরা। তবলিগের বিভিন্ন মেয়াদের চিল্লায় থাকা আর ইজতেমার দাওয়াতের কাজে যারা ছিলেন সেসব মুসল্লিরাও দলে দলে ইজতেমা ময়দানে আসছেন। সকালে ইজতেমা ময়দানের বিদেশি মেহমানদের নিবাস এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সৌদী আরব, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, রাশিয়া, তার্কিস্থান, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের মুসল্লিরা অবস্থান করছেন। থাকার খিত্তার ব্যবস্থাপনা আর ওজু, গোসলখানা ও নিরাপত্তাসহ সব ধরনের আয়োজন নিয়ে সন্তুষ্ট তারা। এবার ৩২ জেলাকে ২ ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

এবারো ঢাকা জেলার তবলিগ অনুসারীরা দুই পর্বেই শরিক থাকবেন। বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বে খিত্তাওয়ারি অবস্থান নিবেন ঢাকাসহ ১৪ জেলার মুসল্লিরা। এই মুসল্লিদের অবস্থান নিরূপণে ইজতেমা ময়দানকে ২৮টি খিত্তায় ভাগ করা হয়েছে। প্রথম পর্বে মুসল্লিরা খিত্তাওয়ারি যেভাবে অবস্থান নেবেন, তা হলো- ১ নম্বর থেকে ৮ নম্বর, ১৬, ১৮, ২০ ও ২১ নম্বর খিত্তায় ঢাকা জেলা, ৯ নম্বর খিত্তায় পঞ্চগড়, ১০ নম্বর খিত্তায় নীলফামারী, ১১ নম্বর খিত্তায় শেরপুর, ১২ ও ১৯ নম্বর খিত্তায় নারায়ণগঞ্জ, ১৩ নম্বর খিত্তায় গাইবান্ধা, ১৪ নম্বর খিত্তায় নাটোর, ১৫ নম্বর খিত্তায় মাদারীপুর, ১৭ নম্বর খিত্তায় নড়াইল, ২২ ও ২৩ নম্বর খিত্তায় লক্ষ্মীপুর, ২৪ নম্বর খিত্তায় ঝালকাঠি, ২৫ ও ২৬ নং খিত্তায় ভোলা, ২৭ নং খিত্তায় মাগুরা এবং ২৮ নং খিত্তায় পটুয়াখালী জেলা।

ইজতেমার শীর্ষ মুরুব্বি মাওলানা গিয়াস উদ্দিন জানান, এরই মধ্যে ইজতেমার মূল শামিয়ানা, বয়ানমঞ্চ প্রস্তুত করা হয়েছে। খিত্তায় খিত্তায় অবস্থান নিয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মুসল্লিরা। মুজাকারাসহ চলছে নানা ধর্মীয় বয়ান। বিদেশি নিবাসে গ্যাস সংযোগ ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আর আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে প্রথম পর্বের তিন দিনের ইজতেমা শেষ হবে ১৪ জানুয়ারি রোববার জোহরের নামাজের আগে যে কোনো মুহূর্তে। চারদিন বিরতি দিয়ে দ্বিতীয় পর্বের তিনদিনের ইজতেমা শুরু হবে আগামী ১৯ জানুয়ারি। দুই পর্বের বিশ্ব ইজতেমা শেষ হবে ২১ জানুয়ারি। স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল বলেন, সরকার ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের সুবিধার্থে ইজতেমা মাঠের ব্যাপক উন্নয়ন করেছে। এর মধ্যে ১৩টি উৎপাদক নলকূপের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি গ্যালন খাবার ও ওজু গোসলের পানি সরবরাহ করবে। ৮ হাজারের বেশি মুসল্লির একসঙ্গে প্রসাব-পায়খানাও করতে অসুবিধা হবে না বলেও জানান তিনি।

আজ বৃহত্তম জুমার নামাজ: আজ শুক্রবার ইজতেমা ময়দানে জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। জুমার নামাজে অংশ নিতে গাজীপুরসহ আশপাশের জেলার কয়েক লাখ মুসল্লি ইজতেমা ময়দানে উপস্থিত হবেন। টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে ১৬০ একর এলাকাজুড়ে নির্মিত চটের প্যান্ডেল ইতোমধ্যে মুসল্লিদের দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। মুসল্লিদের টঙ্গীতে আসা অব্যাহত রয়েছে। আগামী রোববার আখেরি মোনাজাতের আগ পর্যন্ত মুসল্লিদের আসা অব্যাহত থাকবে।

ইজতেমায় বিনামূল্যে স্বাস্থ্য ক্যাম্প: টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে আয়োজিত বিশ্ব ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের সুবিধার্থে ইজতেমা ময়দানের পাশে স্থাপন করা হয়েছে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প। এসব মেডিকেল ক্যাম্প থেকে ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের স্বাস্থ্যসেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেয়া হচ্ছে বিনামূল্যে। হামদর্দ ছাড়াও রয়েছে টঙ্গী ওষুধ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি, ইবনে সিনা, যমুনা ব্যাংক, র‌্যাব, হোমিও প্যাথিক ডক্টর অ্যাসোসিয়েশন, ইমাম সমিতি, গ্রামীণফোন, রবি, আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামসহ অর্ধশতাধিক বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মেডিকেল ক্যাম্প ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন।

গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ গতকাল বৃহস্পতিবার ইজতেমায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তিনি বলেন, খিত্তায় খিত্তায় সাদা পোশাকের পুলিশ মোতায়েনসহ পুরো ময়দান সিসিটিভি ও ওয়াচ টাওয়ারের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পুলিশ সুপার আরো বলেন, ইজতেমা উপলক্ষে মোড়ে-মোড়ে, গলিতে-গলিতে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। ইজতেমার প্রবেশ পথগুলোতে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। এ ছাড়া একটি অত্যাধুনিক কন্ট্রোল রুম ও পাঁচটি সাব কন্ট্রোল রুম করা হয়েছে। পুরো ইজতেমা এলাকাকে পাঁচটি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি সেক্টরে একজন করে অ্যাডিশনাল এসপিকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

তবলিগের মুরুব্বিদের দেয়া তথ্য মতে, ১৯৪৬ সালে প্রথম কাকরাইল মসজিদে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর লোকসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ১৯৬৬ সালে গাজীপুরের টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে বর্তমান স্থলে বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। অবশ্য এর আগে দুই বছর টঙ্গীর পাগাড়ে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। বিগত ১৯৯৫ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকার তুরাগ তীরের ১৬১ একর জমি স্থায়ীভাবে ইজতেমার জন্য বরাদ্দ দেন।

মানবকণ্ঠ/এসএস