আসন ধরে রাখতে মরিয়া আওয়ামী লীগ, জামায়াতকে ছাড় দেবে না বিএনপি

পাবনা প্রতিনিধি :
পাবনা-১ আসনটি পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন আর একটি পৌরসভা এবং বেড়া উপজেলার বেড়া পৌরসভা আর হাটুরিয়া নাকালিয়া ইউনিয়ন, নতুন ভারেঙ্গা ইউনিয়ন, চাকলা ইউনিয়ন ও কৈটলা ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এখানে মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৪৯ হাজার।
পাবনা-১ আসন ( সাঁথিয়া-বেড়া) এ আসনটির বর্তমান এমপি আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু। শুধু বর্তমান সময়ে নয় স্বাধীনতা পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে বিজয়ী যেই হয়েছেন তিনিই সরকারের মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন, এমনকি এ আসন থেকে যে দলের প্রার্থী বিজয়ী হন সে দল ক্ষমতায় যায়। জিয়াউর রহমান সরকারের আমলে মির্জা আবদুল হালিম ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রী। এরশাদ সরকারের আমলে মেজর (অব.) মনজুর কাদের ছিলেন ত্রাণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী।
আওয়ামী লীগ সরকারে শেখ হাসিনার আগের মেয়াদে (১৯৯৬-২০০১) অধ্যাপক আবু সাইয়িদ ছিলেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী। বিগত চারদলীয় জোটের সময় (২০০১-২০০৬) জামায়াতের তৎকালীন আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ছিলেন কৃষিমন্ত্রী পরে শিল্পমন্ত্রী। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু ১ লাখ ৪৫ হজার ১২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন এবং স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে এবং অধ্যাপক আবু সাইয়িদ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এতে অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু জয়লাভ করেন। পরাজিত করেন। চারদলীয় জোটের পক্ষে মতিউর রহমান নিজামী পান এক লাখ ২২ হাজার ৯৪৪ ভোট। বিভিন্ন দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের ভোটের লড়াইয়ের কারণে পাবনা তথা সারা দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আসন পাবনা-১।
এ এলাকাতে বরাবরই আওয়ামী লীগ-বিএনপি দু’দলেরই অবস্থান প্রায় সমানে সমান।
জামায়াতের অবস্থানও চোখে পড়ার মতো। তবে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার মতো যথেষ্ট ভোট তাদের নেই। যদিও এ আসন থেকে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী দুই দু’বার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন তবে তা বিএনপির সঙ্গে গাটছড়া বেঁধে, তাদের বিশাল ভোট ব্যাংক কাজে লাগিয়ে।
আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা জামায়াতকে আর সে ছাড় দিতে রাজি নন। তারা তাদের এ আসনটিতে নিজের দলের প্রার্থী দেখতে চান। এবার বিএনপি দলীয় প্রার্থী দেয়ার জন্য হাইকমান্ডে তারা জোরালো আবেদন জানাবেন বলে উপজেলা বিএনপির অনেক নেতাকর্মী জানিয়েছেন। জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় এবং যুদ্ধাপরাধের মামলায় মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি হয়ে যাওয়ায় বিএনপি নেতাকর্মীদের এ আসনের প্রতি দাবি আরো জোরালো হয়েছে। বিএনপির উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী জানান, তারা আর তাদের মাথায় জামায়াতকে কাঁঠাল ভেঙে খেতে দিতে রাজি নন।
ক্ষেতুপাড়া ইউনিয়নের এক তৃণমূল নেতা বলছিলেন, আমরা আওয়ামী লীগের আমলে যতটুকু না অবহেলার শিকার হচ্ছি তার চেয়ে বেশি উপেক্ষার শিকার হয়েছিলাম জামায়াতের আমলে। সাঁথিয়া উপজেলা কমিটির এক শীর্ষ নেতা বলেন, এখানে আমাদের দলীয় প্রার্থী নির্বাচন না করায় আমরা হয়ে যাচ্ছি ‘ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা।’ অর্থাৎ আওয়ামী লীগের সময় যেমন আমাদের দুর্দশা আবার বিএনপি ক্ষমতায় আসলেও আমরা গণনার বাইরে থাকি। এ জন্য তারা এবার বিএনপি দলীয় প্রার্থী দেয়ার জন্য হাইকমান্ডে জোরালো আবেদন জানাবেন বলে উপজেলা বিএনপির অনেক নেতাকর্মী জানিয়েছেন।
এদিকে আওয়ামী লীগ থেকে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুর নাম শোনা যাচ্ছে। তিনি এলাকায় অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করে চলেছেন। টুকু বলেছেন তিনি এলাকার মানুষের জন্য গত কয়েক যুগ ধরে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। এলাকার মানুষও তাকে ভালোবাসে। মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রে হাইকমান্ড সিদ্ধান্ত নেবে।
এদিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থিতার ব্যাপারে টুকুর পাশাপাশি সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদের নাম শোনা যাচ্ছে। তিনি ২০০৮ ও ২০১৪ সালে মনোনয়ন লাভে ব্যর্থ হন। এবারো তিনি দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে লোকমুখে শোনা যাচ্ছে। অধ্যাপক আবু সাইয়িদ জানান, ‘আমি গত ৬ দশক ধরে মানুষের কল্যাণে রাজনীতি করছি। বঙ্গবন্ধুর ডাকে রাজনীতিতে এসেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে জনকল্যাণের রাজনীতিতে এসেছি। রাজনীতিকে কখনো পেশা হিসেবে নেইনি। সন্ত্রাস, দুর্নীতি বা কলুষিত রাজনীতি করিনি। সাঁথিয়া-বেড়ার মানুষের প্রতিটি পরিবারের সঙ্গে বলতে গেলে আমার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। তাদের সুখ-দুঃখের সঙ্গে রয়েছি। এলাকার মানুষ আমার সঙ্গে রয়েছে।’ তিনি জানান দল মনোনয়ন তিনি তার বিজয়ের ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত।
আওয়ামী লীগের টিকিটে এ আসন থেকে নির্বাচন করতে ইচ্ছুক উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক উপজেলা চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা নিজাম উদ্দিন। তিনি আগামী সংসদ নির্বাচন করবেন বলে এ প্রতিনিধিকে নিশ্চিত করেছেন।
সাঁথিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল্লাহ আল মাহমুদ দেলোয়ার জানান, সাঁথিয়া-বেড়া এলাকায় আওয়ামী লীগের অবস্থান সুশৃঙ্খল এবং এবং সুসংহত। তিনি মাঠ পর্যায় থেকে রাজনীতি করে ওঠে এসেছেন। তিনি এবার দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে জানান।
এদিকে এ আসনে বিএনপির পক্ষে সবচেয়ে সক্রিয়ভাবে মাঠে রয়েছেন জাতীয়তাবাদী তাঁতী দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি হাজী ইউনুছ আলী। তিনি সাঁথিয়া-বেড়া এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক কাজ করার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও গরিব-দুঃখীদের সেবা করে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছেন। বেড়ায় নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবারকে নিজ জমিতে পুনর্বাসন করে তাদের নামে দলিল সম্পাদন করে দিয়েছেন। দাতব্য চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান করে এলাকার হতদরিদ্র মানুষের চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করেছেন। তার ক্লিন ইমেজ এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। বিএনপির অনেকে বলছেন প্রতিটি গ্রামে ইউনুছ আলী তার প্রভাব বিস্তার করেছেন। তিনি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এলাকায় গণসংযোগ ও প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার পক্ষে এলাকায় একটি জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। প্রচার প্রচারণা এবং জনমত গঠনে তিনি মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক রয়েছে।
উপজেলা বিএনপির সভাপতি কেএম মোর্শেদ জ্যোতি ও সাধারণ সম্পাদক শামসুর রহমান উভয়েই নির্বাচন করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। সাঁথিয়া-বেড়ার বিএনপি নেতাকর্মী সমর্থকদের সঙ্গে তার নিবিড় বন্ধন দাবি করে তিনি মনোনয়ন লাভে আত্মবিশ্বাসী বলে জানান।
সাঁথিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি কেএম মোর্শেদ জ্যোতি জানান, সাঁথিয়া-বেড়া উপজেলার মানুষের সঙ্গে তার ব্যাপক যোগাযোগ রয়েছে। তিনি আগামী সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন চাইবেন বলে জানান। এ ছাড়া সাঁথিয়ার ধোপাদাহ ইউনিয়নে পর পর দু’বার নির্বাচিত চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন আহম্মেদ পিপিএম মনোনয়ন চাইবেন বলে শোনা যাচ্ছে।
জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান এবং জাতীয় তাঁতী পার্টির কেন্দ্রীয় সভাপতি সরদার শাহজাহান সম্ভাব্য প্রার্থী। তিনি বলেন, ১৯৭৩-৭৪ ব্যাচের ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম দফতর সম্পাদক ছিলাম। রাজনীতি করতে গিয়ে মিথ্যে মামলায় ১২ বার কারগারে গেছেন আর ৩ বছর জেল খেটেছেন। তার স্বচ্ছ ইমেজ ও জনসেবা তাকে জনগণের কাছে নিয়ে গিয়েছে। ব্যাপক পোস্টারিং ও গণসংযোগ করে এলাকায় তিনি সাড়া ফেলেছেন। তিনি জানান, জাতীয় পার্টির একটি বিশাল ভোট ব্যাংক রয়েছে এ এলাকায়। বিগত কয়েক বছরে তার পরিশ্রমে ও গণসংযোগে এ এলাকার জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা আবার সংগঠিত হয়েছেন। পুরনো সমর্থক ও কর্মীরা অবার দলে ভিড়ছেন বলে তিনি জানান। তিনি জনগণের ভাল সাড়া পাচ্ছেন বলে জানান। মনোনয়ন পেলে তিনি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।
এদিকে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে বেড়া উপজেলা আমির ডা. আবদুল বাসেত খানের নাম শোনা যাচ্ছে। তিনি দলীয় অথবা বিএনপি জোট থেকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগামী নির্বাচনে বিএনপি হাইকমান্ড জামায়াতকে আসনটি ছেড়ে দিলেও বিএনপির তৃণমূল কর্মীরা এত উদারভাবে সে প্রার্থীকে ছাড় দেবেন না। বিএনপির অনেক নেতাকর্মী মনে করেন আওয়ামী লীগের মতো সুসংগঠিত ও শক্তিশালী দলের প্রার্থী শামসুল হক টুকু বা অধ্যাপক আবু সাইয়িদ বা অন্য কারো সঙ্গে এখানে টক্কর দেয়ার জন্য বিএনপির একজন শক্তিশালী প্রার্থী প্রয়োজন। হাজী ইউনুছ, কেএম মোর্শেদ জ্যোতি, শামসুল ইসলামসহ অন্যরা জানান, আওয়ামী লীগের যে কোনো প্রার্থীর সঙ্গে নির্বাচনী লড়াই করে জেতার সামর্থ তাদের রয়েছে। সাঁথিয়ায় জামায়াতের কয়েক শীর্ষ নেতার সঙ্গে কথা বললেও তারা এ ব্যাপারে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তারা জানান, সময় এলে দেখা যাবে।