আশাবাদী আওয়ামী লীগ বিব্রত বিএনপি

রাজশাহী মহানগর। বিন্দুর মোড়। সকাল ৬টা। মেঘে মেঘে অন্ধকার সকাল বেলা। এখনো আড়মোড় ভেঙে জেগে ওঠেনি শহর রাজশাহী। তবে এরই মধ্যে শহরের বিভিন্ন রাস্তায় টহল দিতে শুরু করেছে র‌্যাব এবং বিজিবি। দূর থেকে ভেসে আসছে শ্রমজীবী মানুষের গন্ধ, ভোর সকালে জীবনের প্রয়োজনে যাত্রা শুরু করেছেন দিনমজুরের দল।

বড় রাস্তায় এবং গলির মোড়ে খুলতে শুরু করেছে হোটেল রেস্তোরাঁ, খবরের কাগজ নিয়ে দ্বারে দ্বারে ছুটছে হকার, আর যাত্রীর খোঁজে রাস্তায় নামতে শুরু করেছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। এ অটোরিকশাই এ শহরের প্রধান বাহন। বিন্দুর মোড়ে আমাকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে এলেন একজন অটোচালক। তার সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথা শেষে আমার যাত্রা শুরু করালাম শহরের ‘জিরো পয়েন্টের’ দিকে- রাজশাহীর নির্বাচনী মিশন শূন্য থেকে শুরু করার উদ্দেশে।

অটোচালক জামালের কাছে জানতে চাইলাম নির্বাচন নিয়ে তিনি কি ভাবছেন। জবাবে তিনি বলেন, দেখতে পাচ্ছেন না! শহরজুড়ে শুধু আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন ভাইয়ের পোস্টার। লিটন ভাই ছাড়া এখন এ শহরে কি আর কেউ আছে। সব জায়গায় শুধু লিটন ভাইয়ের পোস্টার আর আওয়ামী লীগের সভা, সমাবেশ, মিছিল। এবার তিনিই জিতবেন।

জিরো পয়েন্টে নেমেই কথা হয় পত্রিকা হকার আনোয়ারের সঙ্গে। নির্বাচন বিষয়ে তিনি বলেন, এবার আওয়ামী লীগের জোয়ার। তাই আমার লিটন ভাই, লিটন ভাই ছাড়া অন্য কাউকে নিয়ে ভাবছি না। এবারের নির্বাচনে লিটন ভাই জিতবেন। তবে তার কথার রেশ শেষ না হতেই পাশে ফুল বিক্রেতা জামিল বলেন, এখনো কিছুই বলা যাচ্ছে না। ভোট সুষ্ঠু হলে বুলবুল ভাইয়েরও জেতার সম্ভাবনা আছে।

জিরো পয়েন্টের পর যাই সোনাদীঘির মোড়ে। এখানে কথা হয় বই বিক্রেতা জুয়েলের সঙ্গে। তিনি বলেন, রাজশাহী শহরের মানুষ চায় বিএনপির প্রার্থী বুলবুল জিতুক। কিন্তু বুলবুল মেয়র হয়ে রাজশাহীর জন্য কিছুই করতে পারেনি। এজন্য এবার অধিকাংশ ভোটার দল নিয়ে ভাবছে না। ভাবছে শহরের উন্নয়ন নিয়ে। সবাই মনে করছে, এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন জিতলে রাজশাহীর উন্নয়ন হবে। এজন্য এবার লিটনের জেতার সম্ভাবনা বেশি।

শহরের কুমারপাড়া এলাকায় কথা হয় নারী উদ্যোক্তা সীমা দাসের সঙ্গে। নির্বাচন বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাকে ভোট দেব তা এখনো ঠিক করিনি। ভোটের এখন দুদিন বাকি। এ দুদিন চিন্তা করে দেখব কাকে ভোট দিলে রাজশাহীর উন্নয়ন হবে, তাকেই ভোট দেব।

এরপর কথা হয় স্থানীয় দৈনিক সোনালী সংবাদের নির্বাহী সম্পাদক জামাল কাদরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের একটি রাজনৈতিক ইমেজ আছে। তিনি জাতীয় নেতা এই এইচ এম কামারুজ্জামানের সন্তান। ’৭৫-এর ৩ নভেম্বর নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন এ এইচ এম কামারুজ্জান। এজন্য লিটনের প্রতি অনেকেরই দুর্বলতা আছে। তা ছাড়া এবার মানুষ রাজনীতি নিয়ে খুব একটা ভাবছেন না। দলমত নির্বিশেষে রাজশাহীর উন্নয়নের কথা ভাবছেন। ফলে লিটনের জয়ের সম্ভাবনাই বেশি।
আর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আব্দুল কুদ্দুস ববি জানান, তিনি এবার ভোট দিতে যাবেন না। বিগত নির্বাচনে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। এ নিয়ে তিনি ভীষণ বিব্রত।

এদিকে রাজশাহী সিটি নির্বাচন নিয়ে নানা কারণেই বিব্রত বিএনপি। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের রাজশাহীর উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে না পারা, শরিক দল জামায়াতে ইসলামী পাশে না থাকা এবং পথসভায় নিজেদের ককটেল বিস্ফোরণ নিয়ে বেকায়দায় আছে দলটি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং জাতীয় ৪ নেতার অন্যতম শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান সম্পর্কে বুলবুলের অসম্মানজনক কটূক্তি। এর প্রতিবাদে গতকাল সকালে শহরের জিরো পয়েন্টে মানববন্ধন করেছে ‘সর্বস্তরের জনগণ’।

এ মানববন্ধনে বুলবুলের প্রার্থিতা বাতিল করতে নির্বাচন কমিশনের প্রতি দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এমপি ফজলে হোসেন বাদশা। তবে বিএনপির নেতারা বলছেন, তাদের একমাত্র ভয় ভোট ডাকাতি। অন্য কিছুকেই তারা জয়ে প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখছেন না। অন্যদিকে নির্বাচনে জয় নিয়ে আত্মবিশ্বাসী আওয়ামী লীগ। তাই বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। তারা বলছেন, মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল মেয়র নির্বাচত হয়েও জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। এর বিপরীতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন মেয়র থাকাকালে উন্নয়ন দিয়ে নগরীর চেহারা পাল্টে দেন। তাই ভোটাররা এবার তাকেই নির্বাচিত করবেন।

এদিকে গতকালও আওয়ামী লীগ প্রার্থী এ এইচ এম খায়রুজ্জামান এবং বিএনপি মেয়র প্রার্থী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল একে অপরের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন ও পরিবেশ নষ্টের অভিযোগ করেছেন।

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন করতে সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শহরে গতকাল শনিবার থেকে মোতায়েন করা বিজিবি ও র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা টহল দিতে শুরু করেছে। গতকাল রাত ১২টায় শেষ হয়েছে প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা।

আজ রোববার সকাল ১১টায় ব্যালট পেপার, অমোচনীয় কালি ও সিলসহ নির্বাচনী সামগ্রী ৩০টি ওয়ার্ডে ১৩৮ কেন্দ্রে পাঠানোর কাজ চূড়ান্ত করবে নির্বাচন কমিশন। এসব কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন করতে ১৫ প্লাটুন বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ৪ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে একইসঙ্গে কাজ করবেন ৪০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত। বর্তমান পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ অনুকূলে রয়েছে বলছেন কর্মকর্তারা।

৩০ জুলাই সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কোনো বিরতি ছাড়াই ৫ মেয়র ও কাউন্সিলরসহ ২১৭ জন পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেয়ার সুযোগ পাবেন নারী ও পুরুষ ভোটার। এবারের নির্বাচনে নতুন ভোটার আছেন প্রায় ৩১ হাজার। আর দুটি কেন্দ্রে ইভিএমের মাধ্যমে ভোট দেয়ার সুযোগ পাবেন প্রায় ৩৪শ’ নারী-পুরুষ।

মানবকণ্ঠ/এএএএম