আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারেরও যাত্রী

আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারেরও যাত্রী

নিরাপদ সড়কের দাবিতে গত কয়েক দিন শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে। তাদের দাবি সরকার মেনে নেয়ায় ইতোমধ্যে তারা ক্লাশ রুমেও ফিরে দিয়েছে। এ আন্দোলনে আমার বাড়ির আশপাশের সব স্কুলের ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে এসে প্রধান সড়কে উঠে এসেছিল। সেইসঙ্গে সেøাগান। আমার ফ্ল্যাটের বিপরীতে স্কুল ও কলেজের ছাত্রছাত্রীরাও সেøাগান মুখে নিয়ে বেরিয়ে আসে এবং মিছিলে যোগ দেয়। সঙ্গে সঙ্গে আমি ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারিতে ফিরে নিয়ে ছিলাম। সেদিনের চিত্রটা ছবির মতো আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ১৩ বছরের কিশোর আমি তখন। সকালে টিনের চোঙায় কারো আহ্বান কানে ভেসে এলো। স্টেশন মাস্টারের বাড়ির দিক থেকে শব্দটা আসছে। দরজা খুলে দেখি আমাদের সিনিয়র ভাই লুৎফর রহমান একটি ঘোড়ার গাড়ির ওপর থেকে বলছেন যে, মাড়োয়ারী হাই স্কুলের ছেলেরা যেন সবাই বেলা দশটার মধ্যে স্কুলে পৌঁছি। আমাদের রেলের বাসাটা রাস্তার ওপর। তাই আমার বাসার সামনে এলে দেখি তার সঙ্গে আরো দু/তিনজন ছাত্র। আমি ক্লাস ফাইভে। লুৎফর ভাই নাইনে এবং সম্ভবত স্কুলের ক্যাপ্টেন। আমাকে দেখে বললেন ‘দশটার মধ্যে চলে এসো।’ ঘোড়ার গাড়ি স্কুলের দিকে এগিয়ে গেল। বললেন ‘ঢাকায় ছাত্রদের ওপর পুলিশ গুলি করেছে। ক’জন মারা গেছে। বেলা এগারোটায় স্কুল থেকে মিছিল বের হবে।’

দশটার অনেক আগে স্কুলে পৌঁছলাম। দেখি তখনই বহু ছাত্র জড়ো হয়েছে। যারা সচরাচর স্কুলে খুব বেশি একটা আসে না, তারাও উপস্থিত। সামনের ফুটবল মাঠে সবাই একত্রিত হচ্ছে। কয়েকজন শিক্ষক ছাত্রদের বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করছেন। এগারোটায় দুটো লাইন করে আমরা স্কুলের চত্বর ছেড়ে সামনের রাস্তায় উঠি। আমাদের সামনে এসে মিছিলে দাঁড়ালেন কয়েকজন শিক্ষক। যাদের কথা স্পষ্ট মনে আছে তারা হলেন- বিভূতিভূষণ চৌধুরী, মজিবর রহমান, আরশাদ আলী (১৯৬৮ সালে ডাকসু’র নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক মোর্শেদ আলীর বাবা), আরো ক’জন। রাস্তায় গার্লস স্কুলের মেয়েরা বের হয়ে এসে মিছিলে যোগ দিল। এতে সবার মনের জোর বেড়ে গেল। দক্ষিণের রেলগেট হয়ে মিছিলটি ঈশ্বরদী বাজারের দিকে মোড় নিল। গন্তব্য লোকোশেড। পথেই সদ্য প্রতিষ্ঠিত নাজিমুদ্দিন হাইস্কুল, দেশভাগের পর ভারত থেকে আসা বিহারি ছেলেদের জন্য। সেই স্কুলের সামনে দিয়ে পার হবার সময় স্কুল থেকে ইট-পাথর ছুঁড়ে আমাদের আক্রমণ করল। মিছিলের পেছনে আসছিল জনাদশেক পুলিশ। তারা নির্বিকার। একটা পাথরের টুকরো এসে আমার কপালে আঘাত করলে ঝরঝর করে রক্ত পড়তে লাগল। রুমাল দিয়ে চেপে ধরে আমরা এগিয়ে চললাম। পথেই রেলওয়ে মেডিকেল সেন্টারে ফাস্ট্রেড নিয়ে লোকোশেডের ফুটবল মাঠে জনসভা করলাম। সেখানে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা নুরুল ইসলাম ফকির, মহিউদ্দিন আহমেদসহ ছাত্রনেতারা বক্তৃতা দিলেন এবং পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলনের ডাক দিলেন। পরদিন ঈশ্বরদীর আশপাশের সব স্কুলসহ বাজারহাটে ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। ’৫২ সালের আঘাতের ক্ষতটা এখনো কপালে বহন করে চলছি।

আমার ঢাকার ফ্ল্যাটের সামনে দিয়ে যাওয়া মিছিল আমাকে স্মৃতিপাগল করে তুলেছিল। আজ প্রায় আশি বছর বয়সে তাদের সঙ্গে পা মেলাতে না পেরে মনটা ভারি হয়ে নিয়েছিল। তারপর গত ক’দিন তাদের কীর্তিকলাপ দেখে আমি থ বনে গেছি। পুলিশের সঙ্গে তেমন কোনো বড় ধরনের সংঘর্ষ না হওয়ায় স্বস্তি পেয়েছি। পুলিশ তেমন কোনো আক্রমণাত্মক মনোভাব দেখায়নি। কোনো কোনো রাস্তায় বাচ্চা মেয়েদের পুলিশের হাতে গোলাপ ফুল তুলে দিতে দেখে মনটা ভরে গেল। দেখেছি সেনাবাহিনীর একটি গাড়ির লাইসেন্স না থাকায় ছেলেমেয়েরা সেটি আটকে দিয়েছিল। তবু গাড়ির সেনা সদস্যরা কোনো উগ্র মনোভাব প্রকাশ করেননি। এই ক’দিন ট্রাফিক কন্ট্রোলে আন্দোলনরত ছেলেমেয়েরা ট্রাফিক পুলিশকে নানাভাবে সাহায্য করেছে, চোখে না দেখলে লিখে তা কাউকে বোঝানো যাবে না। এত বড় একটা আন্দোলনে আর কোনো প্রাণহানি হয়নি, এটা বড় সান্ত¡না। প্রধানমন্ত্রী তাদের নয় দফা মেনে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুমে ফিরে গেছে। দেশবাসী সেটাই চেয়েছে। কিন্তু আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করব- এই আন্দোলনে অংশ নেয়ার জন্য যেন কোনো স্কুল তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য পাবনা জেলা স্কুলের কতিপয় নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তারা বিভিন্ন স্কুল থেকে পরীক্ষা দিয়ে ম্যাট্রিক পাস করেছিলেন। এবারের ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন সরকারবিরোধী ছিল না। নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন যা সবারই দাবি। টিভি সংবাদে দেখলাম ৩৫ হাজার গাড়ির মধ্যে ১৯ হাজার চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। সত্যি হলে এটা একটা ভয়াবহ চিত্র। সেজন্যই প্রতিদিন দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছে। এটা অবশ্যই প্রতিবিধানযোগ্য। সরকার কঠোর হলে বিনা লাইসেন্সে কেউ গাড়ি নিয়ে রাজপথে নামতে পারবে না।

জাতীয় সংসদে বসে শাসক শ্রেণি যেসব আইন তৈরি করেন, তা তারা যখন তখন পরিবর্তন করতে পারেন, ভঙ্গও করতে পারেন। এ কথাটি মার্কস, আইনস্টাইন পাওল ফ্রেইরি এবং সম্প্রতি চমস্কিও বলছেন। কথাটা যে কত বড় সত্য, আমাদের খুদে ছেলেমেয়েরা তা প্রমাণ করে দিল। মন্ত্রীসহ সংসদ সদস্যরা যে লাইসেন্সবিহীন গাড়িতে ঘুরে বেড়ান ও তাদের গাড়ির ড্রাইভারেরও যে লাইসেন্স নেই, এ সত্যটা আজ আর দেশবাসীর কাছে অজানা নয়। আমার প্রাণপ্রিয় ছাত্রছাত্রীরা তা উলঙ্গভাবে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেছে।
কিন্তু কোনো লাভ হবে কি? বেআইনিভাবে যাদের চলাচলের অভ্যাস, তারা কি কখনো আইন মেনে চলতে পারবে? দু’জন সন্তানের মৃত্যুতে যে লোকটা দাঁত বের করে ভারতের উদাহরণ দিয়েছিলেন, তিনি কি জানেন ট্রেন দুর্ঘটনার পুরো দায়-দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে নিয়ে ভারতের রেলমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী পদত্যাগ করেছিলেন। কারণ তিনি একজন শিক্ষিত, গণতন্ত্রমনা ব্যক্তি ছিলেন। মন্ত্রিত্ব ছাড়া তার আরো গুণ ছিল। কিন্তু আমাদের অধিকাংশ মন্ত্রীর মন্ত্রিত্ব ছাড়া আর কোনো গুণ নেই। তাই তারা লজ্জার মাথা খেয়েও ওই মধুর পদটি ছাড়তে নারাজ। অতীতে যারা দুর্ধর্ষ মন্ত্রী ছিলেন, তাদের অধিকাংশের নাম তাদের আত্মীয়গোষ্ঠীর বাইরের কারো মনে নেই। তেমনি বর্তমানের অনেক মন্ত্রীর নাম মানুষ ভুলে যাবে। অতীতে যেমন তারা কেউ-না ছিলেন, ভবিষ্যতেও তারা কেউ-না হয়ে যাবেন। শুধু এখন যা কামিয়ে নিচ্ছেন, সেই সম্পদের ‘সন্ত্রাসবাদের’ নামে লোকে তাদের অস্তিত্ব টের পাবেন।

শিশু কিশোরদের স্যালুট জানাব, তারা যে ইতিহাস রচনা করল, তা কখনো মুছে যাবে না। নিরাপদ সড়কের জয় হোক।
-লেখক: সাবেক অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মানবকণ্ঠ/এসএস