আর্থ-সামাজিক বিড়ম্বনার শিকার স্থানীয়রা

রাখাইনে নতুন করে সেনা অভিয়ান শুরু হলে সেখান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের স্থানীয় জনগণ আর্থ-সামাজিক বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন। এই দু’ উপজেলার হাটবাজারে পাইকারি, খুচরা ব্যবসায়ীরা চরমভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। বিচ্ছিন্নভাবে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ সহায়তা দেয়া বন্ধ করে এবং সাপ্তাহিক বা মাসিক ভিত্তিতে ত্রাণ দেয়ার মাধ্যমে ব্যবসা সচল রাখার দাবি জানিয়েছেন ওই দু’ উপজেলার ব্যবসায়ীরা।

মোট জনসংখ্যার কয়েকগুণ বেশি রোহিঙ্গা বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় বেশ দুশ্চিন্তায় রযেছেন এখানকার লোকজন। অতিরিক্ত রোহিঙ্গার চাপে স্বাভাবিক জীবনযাপন ও আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে তাদের চরম বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে।

উখিয়ার থাইংখালী বাজারের মুদি দোকানদার ইউছুপ আলী জানান, প্রায় এক মাস আগে যখন ব্যাপকহারে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা আসা শুরু হয় তখন থেকে সপ্তাখানেক ধরে ব্যবসাপাতি উল্লেখযোগ্যহারে ভালোই চলছিল। এখন আর বেচা-কেনা তেমন নেই। কারণ আশ্রিত রোহিঙ্গারা বহুমুখী উৎস থেকে চাহিদার অতিরিক্ত নানা রকমের ত্রাণসামগ্রী ও গোপনে নগদ অর্থ সহায়তা পেয়ে যাচ্ছে নিয়মিত।

কুতুপালং বাজারের মুদি দোকানদার মো. শাহ জাহান জানান, সবেচেয়ে বেশি রোহিঙ্গাদের অবস্থান কুতুপালংয়ে। নতুন, পুরাতন ও নিবন্ধিত রোহিঙ্গারা যেভাবে ত্রাণ পাচ্ছে তা আগে দেখা যায়নি। চাল, আটা, ডাল, ময়দা, বোতলজাত তেল, পানি, পেঁয়াজ, রসুনসহ প্রায় সব ধরনের প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী নানা উৎস থেকে পাচ্ছে তারা।

এ দু’ ব্যবসায়ীর মতে যেভাবে ত্রাণ ও গোপন অর্থ সহায়তা পাচ্ছে সে তুলনায় তাদের আশ্রয়ের ঘর অপরিসর । ফলে এগুলোর (ত্রাণের) অনেকাংশ তারা স্থানীয় লোকজন ও আশ্রয় শিবিরকেন্দ্রিক রোহিঙ্গা নেতাদের সমন্বয়ে স্থানীয়দের গড়ে তোলা সিন্ডিকেটগুলো তা সস্তায় কিনে নিয়ে গোপনে মজুদ করে বিক্রি করছে। প্রতি লিটার বোতলজাত ভোজ্য তেল ৬০/৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আটা, ময়দা, গুঁড়ো দুধ স্বভাবতই খেতে অভ্যস্ত নয়। এখানে প্যাকেটজাত আটা ময়দা প্রতি কেজি ১৫/১৭ টাকায়, গুঁড়ো দুধের আধা কেজি প্যাকেট ৪৫/৫০ টাকায়, কেজির প্যাকেট ৮০/৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী স্থানীয়ভাবে দোকানে স্বাভাবিক বেচাকেনা কমে গেছে। কারণ সস্তায় হাতের নাগালে ভোক্তারা এসব পণ্য পাওয়ায় নির্ধারিত মূল্যে কেউ সহজে এগুলো আর কিনতে চায় না বলে তারা জানান।

ত্রাণসাগ্রী বেচাকেনা না করার জন্য ত্রাণ কাজে নিয়জিত সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় লোকজনদের বারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও গোপনে এগুলো চলে আসছে। তবে ব্যতিক্রম পান, সিগারেট, চা দোকান, ঔষুধের দোকান, মোবাইল ফোনের লেনদেন, এলপি গ্যাসের দোকান ও মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশের দোকানগুলোতে। রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরগুলোকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন নতুন নতুন গড়ে উঠছে এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। উখিয়া সদর, কুতুপালং, ঘুমধুম, উখিয়ার ঘাট, কাস্টমস, বালুখালী পানবাজার, থাইংখালী, পালংখালী বাজারে মোবাইল লোড ও বিকাশের দোকান রয়েছে শতাধিক। লেনদেনও হচ্ছে দৈনিক কোটি টাকার ওপরে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, থাইংখালী বাজার ও বালুখালী পানবাজারের একাধিক বিকাশ এজেন্ট জানান, গত মাস দু’য়েক ধরে উল্লেখিত স্পটগুলোতে বিকাশের লেনদেন বেড়েছে অস্বাভাবিক।

বিকাশের উখিয়ার এজেন্ট সালমা ট্রেডার্সের মালিক নুরুল ইসলামও আর্থিক লেনদেনের কথা স্বীকার করে বলেন, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো এজেন্ট দৈনিক/সাপ্তাহিক বা মাসিক কি পরিমাণের লেনদেন করছে তা বলার নিয়ম নেই। তবে এখানে প্রতি মাসে ২২/২৫ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে বলে তিনি জানান।

উখিয়া সদরের কামাল অটো রাইস মিল মালিক ফরিদ সওদাগর বলেন, গুদামে বিপুল পরিমাণে চাল মজুদ থাকলেও বেচা-বিক্রি নেই। যে মানের চাল রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ হিসেবে প্রদান করা হচ্ছে সে মানের চাল প্রতি ৫০ কেজির বস্তায় পাইকারি মূল্য ১৮/২২শ টাকা মূল্যে বিক্রি করতে হয়। কিন্তু গত দু’ মাস ধরে এখানে চালের পাইকারি ব্যবসায় এক প্রকার ধস নেমেছে। গত ২৫ আগস্টের পূর্বে যেসব পাইকারি চালের দোকানগুলোতে প্রতিদিন ২/৩ টন চাল বিক্রি হতো, সেখানে বর্তমানে ১ টনও বিক্রি করা যাচ্ছে না।

উখিয়া অটো রাইস মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. কবির বলেন, রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে প্রতিদিন চাল বিতরণে অনিয়মের কারণে ও রোহিঙ্গাদের অতিরিক্ত ত্রাণ প্রদানের ফলে কোনো না কোনোভাবে প্রতিদিন অন্তত ২০/২৫ টন চাল পাচার হয়ে খোলা বাজারে চলে আসছে। বিনামূল্যের চালসহ ত্রাণ সামগ্রী রোহিঙ্গারা ভুয়া নামে এক পরিবার একাধিকবার পেয়ে থাকে। অতিরিক্ত এসব ত্রাণ সামগ্রী খুব সস্তায় রোহিঙ্গারা বাইরে বিক্রি করে দিচ্ছে। ফলে উখিয়া সদরসহ হাট-বাজারগুলোর পাইকারি, খুচরা ব্যবসায়ীরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

কোটবাজার বণিক সমিতির সভাপতি আদিল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, যত দ্রুত সম্ভব বিচ্ছিন্নভাবে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ সামগ্রী দেয়া বন্ধ করে তাদের নিবন্ধনের আওতায় এনে সংশ্লিষ্ট রোহিঙ্গা পরিবারের সদস্য সংখ্যা অনুসারে নির্দিষ্টহারে সাপ্তাহিক বা মাসিক ভিত্তিতে ত্রাণ কার্ড প্রদানের মাধ্যমে চাহিদা অনুযায়ী ত্রাণ সামগ্রী প্রদান করার মাধ্যমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা যেতে পারে। ত্রাণ সংক্রান্ত ব্যাপারে ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে বেশ কিছু আইনশৃঙ্খলা অবনতিজনিত ঘটনাও ঘটেছে। রোহিঙ্গা শিবিরগুলো থেকে ব্যাপকহারে ত্রাণ সামগ্রী বেচাকেনা বন্ধ করা না হলে এখানকার আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার চরম অব্যবস্থা ও বিশৃঙ্খলা ঘটতে থাকবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

মানবকণ্ঠ/এসএস