‘আমি মেধাবী ডিরেক্টর না, পরিশ্রমী’ চয়নিকা চৌধুরী

২০০১ সালের আজকের দিনে নাট্য নির্মাতা হিসেবে মিডিয়াতে যাত্রা শুরু করেন চয়নিকা চৌধুরী। এরপর গত ১৬ বছরে ৩৪৭টি নাটক নির্মাণ করেছেন তিনি। সম্প্রতি মানবকণ্ঠে এসেছিলেন জনপ্রিয় এই নাট্য নির্মাতা। জানিয়েছেন মিডিয়াতে নাটক নির্মাণ শুরুর গল্প ও ১৬ বছরে নিজের সফলতার নানা বিষয়। চয়নিকা চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন- রেজাউর রহমান রিজভী

>>মিডিয়াতে আপনার শুরুর গল্পটা বলুন-
আমি নাটক লিখি ১৯৯৫ সাল থেকে। তবে পরিচালনায় আসি আরো ৬ বছর পর। ২০০১ সালে লাইট অ্যান্ড শ্যাডোর কর্ণধার মুজিবুর রহমানের কাছে আমার লেখা একটি নাটকের স্ক্রিপ্টের সম্মানী আনতে গিয়েছি। তখন কথা প্রসঙ্গে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, নাটকটি কে পরিচালনা করবে? তখন মুজিব ভাই বললেন, কেন তুমি! তার কথা শুনে আমি কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে রইলাম। যেহেতু আমি একটু আবেগী মানুষ, তাই জীবনে অনেক কাজই আমি না ভেবে করেছি। এইবারও অনেকটা আবেগের বশেই রাজি হয়ে গেলাম। নাটকটির নাম ছিল ‘শেষ বেলা’। এতে ইশিতা, জয়া আহসান, আবুল হায়াতসহ আরো অনেকে অভিনয় করেন। তারিখটি ছিল ২০০১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর। নাটকটি বিটিভিতে প্যাকেজ নাটক হিসেবে জমা পড়ে। নাটকটি অনএয়ার হওয়ার আগেই একদিন আমার বোন তমালিকা কর্মকার আমাকে এসে বলে, আমাকে একটা নাটকের স্ক্রিপ্ট দে তো। নাটকটি তুই নিজেই পরিচালনা করবি। নাটকটির নাম ছিল ‘এক জীবন’। নাটকটি ছিল আমার বাসায় কাজ করা এক ছুটা বুয়ার জীবনের সত্য ঘটনা অবলম্বনে। এটি প্রচারিত হওয়ার পর আমি যে পরিমাণ দর্শক রেসপন্স পেয়েছি সেটি আমার সারা জীবন মনে থাকবে। এটিই মূলত আমার পরিচালনায় প্রচারিত প্রথম নাটক। এ নাটকের জন্য তিন জায়গা থেকে আমি অ্যাওয়ার্ড পাই।

>>নাটক পরিচালনায় ১৬ বছর পার করলেন। নিজের মূল্যায়ন কিভাবে করবেন?
আমি একদমই মেধাবী কোনো ডিরেক্টর না, বরং পরিশ্রমী। আমি পরিশ্রম দিয়েই এ জায়গাতে এসেছি। এ জন্য আমি প্রথমেই সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাই। আর কিছু মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই যারা সব সময় আমার সঙ্গে থেকেছেন। যাদের কথা না বললেই না তাদের মধ্যে অন্যতম- লাইট অ্যান্ড শ্যাডোর কর্ণধার মুজিবুর রহমান, অ্যাড মিডিয়ার জায়েদা রাব্বী, ইমদাদুল হক মিলন, মাহফুজ আহমেদ, আমার পরিবারের সদস্য ও নাটকের কলাকুশলীগণ।

আর মূল্যায়ন যদি বলতে বলেন, তবে আমি বলবো, আজ থেকে ১৬ বছর আগে আমি নাটকে ক্যান্ডেল দিয়ে ঘর সাজিয়ে ছিলাম, বৃষ্টি দিয়েছিলাম, ফুল দিয়ে সেট সাজিয়েছিলাম। মোট কথা ভালোবেসে ১৬ বছর আগে আমি যা যা করেছিলাম, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন নির্মাতার কাজেও কিন্তু সেগুলোই অনেক সময় দেখতে পাই। ১৬ বছর আগে আমি নাটকের মাঝে গান সংযোজন করা শুরু করি। যাতে নাটক দেখতে দর্শক বোর ফিল না করেন। সেটা আমার একটা ইউনিক স্টাইল হিসেবেও অনেকে গণ্য করতে শুরু করে। এরপর অনেকেই কিন্তু সেটি ফলো করেছে। এটাই আসলে আমার পরিতৃপ্তির অন্যতম জায়গা।

>>রোমান্টিক নাটকের কারিগর হিসেবে আপনার বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। কেন?
প্রথমত মনে হয় আমি নিজে রোমান্টিক। দ্বিতীয়ত হলো, ভালোবাসা ছাড়া জীবনে কিছুই সম্ভব না। আপনি যখন এ লেখাটি লিখবেন তখন ভালোবেসে যতœ নিয়েই লিখবেন। তেমনি আমি যখন কোনো কাজ করি, তখন ভালোবেসে যত্ন নিয়েই করি। ভালোবাসা আর যত্ন এ ছাড়া আমি কিছু বুঝি না। ছোটবেলা থেকেই আমি আমার ছেলে-মেয়েকে বলতাম, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। ছোট্ট বাচ্চাটা হয়তো ভালোবাসি কথাটার কিছুই বুঝত না। সেও বলতো, আমি তোমাকে ভালোবাসি। তবে আই লাভ ইউ বলাটা মানেই কিন্তু ভালোবাসার নাটক না। আমি তোমাকে ভালোবাসি বলার আগের যে এক্সপ্রেশন, আমি তোমাকে ভালোবাসি বলার পরের যে এক্সপ্রেশন এবং পরিবেশ- এটা নিয়েই কিন্তু একটা ভালোবাসার নাটক হয়। আর ভালোবাসার নাটক কিন্তু সারা বছর সব চ্যানেলের জন্যই বানানো যায়। আমি যেহেতু মানুষকে ভালোবাসি, তাই আমি ভালোবাসার নাটক বানাতে পারি।

>>ধারাবাহিক নাটক নির্মাণে আপনাকে কম পাওয়া যায় কেন?
এ পর্যন্ত আমি ৩৪৭টি খণ্ড নাটক-টেলিফিল্ম এবং ১৪টি ধারাবাহিক নাটক নির্মাণ করেছি। দুটি কারণে ধারাবাহিক নির্মাণে আমাকে কম পাওয়া যায়। প্রথম, সারা বছরই বিভিন্ন উপলক্ষে আমাকে খণ্ডনাটক নির্মাণ করতে হয়। ফলে ধারাবাহিক নাটকের জন্য সময় করাটা অনেক সময়ই কঠিন হয়। আর দ্বিতীয়ত, ভালো স্ক্রিপ্টের অভাব। যদিও সবাই জানে ধারাবাহিক নাটক নির্মাণ করেই আর্থিকভাবে বেশি লাভবান হওয়া যায়। তবে আমার কাছে মানসিক তৃপ্তি পাওয়াটাই আগে।

>>এবারের ঈদে আপনার পরিচালিত নাটকগুলো সম্পর্কে বলুন-
ঈদে আমার পরিচালনায় ৮টি নাটক অনএয়ার হয়েছে। এবার আমি বিশেষ করে গল্পের ওপর জোর দিয়েছি। ফলে সব নাটকই ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হয়েছে। তবে এই ৮টি নাটকের মধ্যে মাসুম শাহরিয়ারের লেখা ‘কালো চিঠি’ নাটকটি দর্শকরা পছন্দ করেছে। এ নাটকের মাধ্যমে ২৫ বছর পর দর্শকরা শমী কায়সার, মাহফুজ আহমেদ ও আফসানা মিমিকে একত্রে দেখলেন। আমার মতে, এক বসাতে দেখার মতো নাটক এটি। আরেকটি নাটকের কথা না বললেই না, সেটি হলো ফারিয়া হোসেনের লেখা ‘সবটুকু’। এ নাটকে আনিসুর রহমান মিলন অসাধারণ অভিনয় করেছে।

>>ঈদে অন্যদের নাটক-টেলিফিল্ম সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি?
এবারের ঈদে আমি অনেকের কাজ দেখেছি। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাহফুজ আহমেদের ‘পাহাড়ে মেঘের ছায়া’, মিজানুর রহমান আরিয়ানের ‘ব্যাচ ২৭: দ্য লাস্ট পেজ’ ও ‘বড় ছেলে’, কাজী হায়াত মাহমুদের ‘ভাঙন’, মাবরুর রশীদ বান্নার ‘আমি তুমি আমরা’, সাফায়েত মনসুর রানার ‘আমরা ফিরব কবে’, শ্রাবণী ফেরদৌসীর ‘প্রেম’, ইমরাউল রাফাতের ‘মিসম্যাচ’, ‘পাঞ্চক্লিপ’ প্রভৃতি।

নতুন নির্মাতারা আসছেন ও ভালো কাজ করছেন, এটা আমাদের মিডিয়ার জন্য ইতিবাচক। এ ছাড়া ইদানীং ব্র্যান্ডের কাজ বেশি হচ্ছে বলে নাটক দেখার মাঝে বিজ্ঞাপনের সময়ও সীমিত হয়েছে। ফলে মানুষ এখন কেবল ইউটিউবেই নয়, টিভিতেও সরাসরি নাটক দেখছে।

>>চলচ্চিত্র পরিচালনায় আপনাকে কবে নাগাদ পাওয়া যাবে?
সব কিছু যদি ঠিক থাকে তবে আগামী বছর নাগাদ আমাকে চলচ্চিত্র পরিচালনায় দেখা যাবে।

মানবকণ্ঠ/এসএস