‘আমি তো অনেকটা ভালো হয়ে গেছি, তাই না আব্বু?’

মুক্তামণি

বিরল রোগে আক্রান্ত ছোট্ট মুক্তামণি অস্ত্রোপচারের ধকল খানিকটা কাটিয়ে উঠেছে। হাতটা হঠাৎ করে যেন অনেকটা হালকা হয়ে গেছে। ভারমুক্ত হওয়ায় মুক্তামণি তার মনের জোর ফিরে পেতে শুরু করেছে। রোববার সকালে বাবার কাছে জানতে চাইছে, আমি তো আগের চাইতে অনেক ভালো হয়ে গেছি, তাই না আব্বু?

মুক্তামণির বাবা ইব্রাহিম হোসেন জানান, আল্লাহর রহমত, চিকিৎসকদের চেষ্টা আর কোটি কোটি মানুষের দোয়ায় মেয়ে আমার অনেক ভালো আছে। শনিবার অপারেশনের পর জ্ঞান ফিরেই কথা বলেছে। রোববার বারবার জানতে চাইছে, ও ভালো আছে কি না। ওর শরীরটা তো এখন অনেক হালকা হয়ে গেছে। এখন হাতে যন্ত্রণা থাকলেও ভালো আছে। সকালে স্যুপ খেয়েছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের প্রধান সমন্বয়ক সামন্ত লাল সেন বলেন, মুক্তামণি ভালো আছে। আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) তাকে দেখতে গেলে নিজে থেকেই বলে- আমি ভালো আছি। খিদে লেগেছে।

সামন্ত লাল সেন আরো বলেন, এখন থেকে অল্প অল্প করে স্বাভাবিক খাবার খাওয়া শুরু করতে পারবে মুক্তামণি।

এরআগে শনিবার সকাল ৮টা ২০ মিনিটে মুক্তামণিকে অস্ত্রোপচার কক্ষে নেয়া হয়। বেলা সোয়া ১১টার দিকে চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচার কক্ষ থেকে বের হয়। এরপর সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়ক সামন্ত লাল সেন বলেন, প্রায় আড়াই ঘণ্টার অস্ত্রোপচারে তার ডান হাতের আক্রান্ত অংশটি ফেলে দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে সফল। হাতটি রক্ষা করে ডিজিজড অংশটি কেটে নেয়া হয়েছে। হাতের ফুলে যাওয়া সংক্রমিত অংশটি কেটে ফেলে দেয়ার পর হাতটি ভালো আছে। তবে তিনি জানান, মুক্তামণির পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে আরো পাঁচ-ছয়টি অস্ত্রোপচার করতে হবে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. আবুল কালাম বলেন, স্কিন গ্রাফটিংসহ আরো পাঁচ-ছয়টি অপারেশন লাগতে পারে তার। প্রতি সপ্তাহে অথবা ১০ দিন অন্তর এই অপারেশনগুলো হবে। ডান হাতটি প্রিজার্ভ করাই ছিল আমাদের মূল লক্ষ্য। সম্মিলিত প্রচেষ্টার কারণেই প্রাথমিক সফলতা পেয়েছি।

ডা. আবুল কালাম বলেন, বুক ও কাঁধের সংক্রমিত অংশ এখনো রয়ে গেছে। আমরা তা সরিয়ে দেব। এতে কিছুটা সময় লাগবে। হাতের যেসব অংশে এগ্রেসিভ সংক্রমণ হয়েছিল আমরা প্রথমে তা সরিয়ে দিয়েছি। আগামী ৪-৫ দিন মনিটরিংয়ে রাখব। এরপর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
মুক্তামণির মা-বাবা অস্ত্রোপচার সফল হওয়ায় ডাক্তারদের ধন্যবাদ দেন। তারা গণমাধ্যমের মাধ্যমে মেয়ের সুস্থতার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চান। এদিকে, মুক্তামণির সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমও চিকিৎসক দলকে তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

১২ বছরের ছোট্ট মুক্তামণি জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে এখন পুরোপুরি শয্যাশায়ী। তার ডান হাতে শরীরের চেয়ে বেশি ওজনের মাংসপিণ্ড ছিল। যা তার স্বাভাবিক জীবন-যাপন পুরোটাই ব্যাহত করেছে। এখন ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের আইসিইউতে সময় কাটছে তার। মাত্র দেড় বছর বয়সে মুক্তামণির এই রোগ দেখা দেয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন চিকিৎসা চললেও সুস্থতার বদলে এ রোগ বাড়তে থাকে। সর্বশেষ একটি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে মুক্তামণিকে ঢাকায় আনা হয়। তার চিকিৎসার সমস্ত দায়িত্ব নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরের হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা অস্বীকৃতি জানায়। এরপর গত বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন করে ঢাকা মেডিকেলই মুক্তামণির চিকিৎসা করবেন বলে জানান চিকিৎসকরা। তার জন্য হাসপাতালের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট দল গঠন করা হয়েছে। ওই দলের তত্ত্বাবধানে মুক্তামণির চিকিৎসা চলছে।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.