আমার মাহফুজা তাঁহার মাহফুজা

আঁখি সিদ্দিকা :
রবীন্দ্রনাথকেও তুমি দাওনি ধরা/ কাজীদা অভিমানে তোমার বিপরীতে/ ফিরায়েছে গাল/ আবার কেন ধরেছ অনুজের পাছ/ তুমি ছাড়া নেই আমার কবিতার বিষয়/ যেমন ছিল না কিটসের/ বোদলেয়ার নেরুদাও খুঁজেছে তোমাকে/ আমিও যেন না জানি তোমার অনাবিষ্কৃত বিষয়/ তোমাকে জানলে মানুষের নষ্ট হবে আহারে রুচি/ করবে না আবাদ বন্ধ্যা জমি/ নিজেরাই পরস্পর মেতে রবে ভ্রƒণ হত্যায়/ তোমাকেই জানলেই কেয়ামত হবে/ মানুষের পাপ ছুঁয়ে যাবে হাশরের দিন/ তুমি যেন আমার পরে হয়ো না সদয়/ আদরে রেখ না ললাটে হাত/ বরং আকাক্সিক্ষত তিক্ততায় ছুড়ে দাও/ নাগালের ওপার।(তোমাকে জানলেই, পূর্বখণ্ড)
স্বতঃস্ফূর্ততায় বিশ্বাসী, আইডিয়ানির্ভর কবি মজিদ মাহমুদ। এই মানুষটির নাম শুনবার আগে জানা ‘মাহফুজামঙ্গল’। কবি, কবিতা, পাঠক। এখানে পাঠক, কবিতা, কবি। শুনতে কেমন লাগলেও সত্যিই। আমার মাহফুজার সঙ্গে আমার পরিচয় জšে§র এবং তিনি আমার মানবী নারী। নারী হয়েও আমার একজন মানসী নারী আছে আশ্চর্য হলেও সত্য। আর তাকে উপহার দেয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় হয়ে যায় ‘মাহফুজা মঙ্গল’। আমি মাহফুজামঙ্গল পড়ে অভিভূত হয়েছিলাম তখন কবিতার মাঠে আমার শৈশবমাত্র। মনে হয়েছিল মঙ্গলকাব্য বা এই টাইপের কিছু। পড়তে গিয়ে আধুনিকতা আর আমার সবটুকু যেন এখানে বিচরণ করছ। নারীর প্রতিরূপ, সৌন্দর্য আর এক নতুনত্বের ছোঁয়ায় আবিষ্ট যেন। মজিদ মাহমুদের মাহফুজা আসলে প্রকৃতি, ঈশ্বরের প্রতীক। কবি সমস্ত কিছুতে আশ্রয় চান মাহফুজার কাছে। মাহফুজা শব্দের অর্থ ‘নিরাপদ আশ্রয়’ আর মঙ্গল বলতে ‘বিজয়’ ধরে নেয়া যেতে পারে। অর্থাৎ নিরাপদ আশ্রয়ের বিজয়। এ আশ্রয় যেন তার ধ্যান, তার প্রার্থনা, তার একান্ত নারী কিংবা অভিভাবক। তাই তিনি তার কবিতার ভেতর অনায়াসে উচ্চারণ করেন, ‘মাফুজাং শরনং গচ্ছামি’। এই একজন নারীর সাধনা হয়ে থাকে। এমন করে পাওয়া দুর্লভ। আমার মাহফুজা তেমন আমার নিরাপদ আশ্রয়। তবে সম্পর্কের রকম ভিন্ন। ২০০৪ সালে বইটি হাতে থাকলেও যাযাবর আমি’র বইটি হারিয়ে যায়। পরে কবির শরণাপন্ন হলে আমি আমার মাহফুজাকে এই অমূল্য বইটি উপহার দিতে পেরেছিলাম। অদ্ভুত ব্যাপার হলো যে, বইয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৮৯ সালে তা আসলে সম্পূর্ণতা পায় ২০১২ সালে। অর্থাৎ বইটি প্রথমবার প্রকাশিত হওয়ার পরও দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে বিভিন্ন লেখার পাশাপাশি কবি এই বইটিকে একটু একটু করে তিনটি পর্বে সম্পূর্ণতার দিকে নিয়ে গেছেন। গত পঞ্চাশ বছরে কোনো কবিতার বই এত দীর্ঘ বছর ধরে রচিত হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। একটি কবিতার বই প্রকাশ যতটা না কঠিন, তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন বছরের পর বছর ধরে পাঠক মনে বইটির টিকে থাকা, পাঠকদের গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করা। আমার কাছে মনে হয়েছে মজিদ মাহমুদের মাহফুজা মঙ্গল মহাকাব্যের মহাকালিক সুরকে লালন করেই রচিত। কেননা এ বইয়ের কবিতাগুলো প্রবাহিত হতে থাকে মাহফুজা নামের এক মেটাফোরের হাত ধরে সৃষ্টির আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত। মানুষ ও তার অন্তস্তল, নারী, পুরুষ, জš§রহস্য, দর্শন থেকে তৃতীয় বিশ্বের বন্যাকবলিত এলাকা ও তাকে নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতি পর্যন্ত আর এসবের মধ্য মাহফুজামঙ্গল বইটি সময়ের বিচিত্র পথে হেঁটে জীবনবিষয়ক পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গি পাঠকের সামনে তুলে ধরে। মাহফুজামঙ্গল পড়লে স্পষ্টই টের পাওয়া যায়, পাঠককে কেবল ভালো লাগার অনুভূতিতে আচ্ছন্ন করার জন্য মজিদ মাহমুদ কবিতাগুলো লেখেননি। তিনি এ বইয়ের সমস্ত কবিতাতে মাহফুজা নামের মেটাফরের ভেতর দিয়ে কিছু একটা অনুসন্ধান করেছেন, খুঁজেছেন। খুঁজতে খুঁজতেই তিনি যেন নিজের মধ্যে ভ্রমণ করেন, নিজের মধ্যে উপলব্ধি করেন ব্রহ্মাণ্ডের লীলাকে। এ যেন সক্রেটিসের নিজেকে জানো বা আনাল হকের আমিই সত্য’র প্রতিধ্বনি। যে সত্যের সন্ধান করতে গিয়ে তিনি পাঠককে ভাসিয়ে নিয়ে যান জš§-মৃত্যু-প্রেম-যুদ্ধ-কাম-প্রচলিত মিথ সবকিছুকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ভাবনা বলয়ে। যে ভাবনা জীবনের সামগ্রিকতাকে ধারণ করে, পাশাপাশি মাহফুজা নাম্নী রক্তমাংসের নারী কিংবা ঐশ্বরিক দেবীর মূর্তি মনোজগতে তৈরি করে দেয়। ‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যগ্রন্থ এ মাহফুজা একই সঙ্গে দেবী বা ঈশ্বর এবং প্রিয়ার ভূমিকায় সুচারুরূপে এঁকেছেন মজিদ মাহামুদ। মজিদ মাহমুদ যখন বলেন: তোমার সান্নিধ্যে এলে জেগে ওঠে প্রবল ঈশ্বর, তখন প্রেমের শারীরিক কাঠামো ভেঙেচুরে যায়। শরীর ছাপিয়ে অশরীরী ঈশ্বরের প্রবল দাপট যেন আমরা টের পাই। ফলে প্রেম হয়ে ওঠে একই সঙ্গে শারীরিক এবং প্লেটোনিক। এই প্রেম প্লেটোনিক, কেননা ঈশ্বরের সঙ্গে একমাত্র আধ্যাত্মিক প্রেমই সম্ভব। আবার এই প্রেম শারীরিক, কেননা শরীর ছুঁয়ে যে স্পর্শসুখ অনুভূত হয়। মজিদ মাহমুদ তার শারীরিক তথা জাগতিক প্রেমকে একটি মহাজাগতিক পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছেন। ফলে তার কবিতা একরৈখিক গণ্ডিতে বাঁধা পড়েনি। বহুরৈখিক মাত্রায় উপনীত হয়েছে আর তাই মাহফুজা এবং ঈশ্বর একই সত্তায় লীন হয়ে গেছে। ঈশ্বর তথা মাহফুজা তো তারই মানস-দেবতা আর তাই হয়তো ঈশ্বরকে ডাক দিলে মাহফুজা সামনে এসে দাঁড়ায়। তার বর্ণনা তার কবিতায় অগণিত। দুইটি সাবলীল পঙ্ক্তির মধ্য দিয়ে এই ভালোবাসার দ্বৈতসত্তা তিনি এভাবে দেখিয়েছেন-

‘মাহফুজা তোমার শরীর আমার তছবির দানা
আমি নেড়েচেড়ে দেখি আর আমার এবাদত হয়ে যায়’।

আবার তিনি লেখেন-
এমন অযোগ্য কবিকে তুমি সাজা দাও মাহফুজা/ যে কেবল খুঁজেছে তোমার নরম মাংস/ তবু তোমার স্নেহ আমাকে ঘিরেছে এমন/ এই অপরাধে কখনো কর নি সান্নিধ্য ত্যাগ।
(খবর)
উপর্যুক্ত পঙ্ক্তিতে ভক্তের দীনতাকে স্পষ্ট করে তুলেছেন কবি মজিদ মাহমুদ। ‘মোর কথা লয়ে তুমি কথা কহ’-সরাসরি এ রকম উক্তি হয়তো মাহফুজামঙ্গল থেকে উদ্ধৃত করা সম্ভব নয়। কিন্তু মজিদ মাহমুদের কবিতার অন্তর্জগতে একটা ‘অধরা’ সত্তা হিসেবে মাহফুজার অস্তিত্ব আমরা টের পাই। ঈশ্বরপ্রেম বা আধ্যাত্মবাদ থেকে কবি নেমে আসেন যেন এই বাস্তব পৃথিবীতে তখনো তাহার মাহফুজাই তাহার সাথে থাকে। আকুতি ভরে যেন তার অবস্থান ও নিজের অবস্থান বুঝিয়ে দেন- ‘তোমাকে পারে না ছুঁতে/ আমাদের মধ্যবিত্ত ক্লেদাক্ত জীবন’।
এই উচ্চারণের মাধ্যমে তিনি চিরকালকে সমকালে আনেন, আবার তাকে নিয়ে যান সিমেটিক কথামালার স্রোতে যেখানে ‘ কোরবানি’ বা ‘নব্য-ইসমাইল’-এর মতো প্রসঙ্গগুলো আসে। ‘দেবী’ কবিতায় তিনি ইংল্যান্ডের রানীর শাসনের কথাটা মনে করিয়ে আমাদের ঔপনিবেশিক অতীতের দিকে চকিতে নিয়ে গিয়ে ফিরিয়ে আনেন, সেখানে মাহফুজা প্রেমের প্রতিমা হয়ে ওঠে, কবি সৃষ্টি আদি থেকে তার বিভাকে বর্তমানের জীবনজগতে তীব্র করে হাজির করতে চান। মাহফুজাই যেন তার সমকালীন প্রেক্ষাপট। মাটিতে পা রেখেই আকাশে উড্ডীয়মান কবি মজিদ মাহমুদ নিজের কবিসত্তাকে তুমুলভাবে উদ্যাপন করেছেন এই কাব্যগ্রন্থে। এতে তিনি নিজস্ব জীবনের বোধ ও অস্তিত্বের আবডালেপুষে রাখা বোধির ভেতরে যা কিছু পড়ে তার সব কিছুকে ধারণ করতে চেয়েছেন। ফলে ‘মাহফুজামঙ্গল’ পূর্বখণ্ড এবং উত্তরখণ্ড পার হয়ে তিনি যখন যুদ্ধমঙ্গলকাব্যতে আমাদের টেনে আনেন সেখানে নির্মিত হয় অন্য পৃথিবী…
‘মাহফুজা, আমাদের আত্মা থেমে আছে একটি যুদ্ধের ভেতর, হতে পারে দুই কুড়ি/ কিংবা দুই হাজার বছরের পুরনো সে যুদ্ধ, লোক ক্ষয় এবং হত্যা, কত কম লোক কত/ বেশি লোককে মেরেছিল- যুদ্ধ তো এ সব বোকা বানানোর গল্প।’
যুদ্ধমঙ্গলকাব্য’র যেখানে শেষ হয় সেখানেও মাহফুজা বিচিত্র রূপে হাজির। সে আগ্রাসী ভিনদেশী, কখনো ব্রিটিশ কখনো পাঞ্জাবী-
‘…তুমি শাদা চামড়ার চতুর ব্রিটিশ! তুমি ভয়াল পাঞ্জাবী! তোমাকে পরাস্ত করা ছাড়া আমার রক্তের উদ্দামতা থামে না। আমাদের এই শত্রুতা আজš§ মাহফুজা। এই যুদ্ধ থেকে পাবে না রেহাই আমাদের সন্ততি। তাই আমরা জেগে উঠি প্রবল আক্রোশে বংশ পরম্পরায় এই গেরিলা যুদ্ধে।’
এভাবেই মজিদ মাহামুদ তাহার মাহফুজাকে নানা বিচিত্র রঙে রঙিন করে তুলেছেন। আশ্রয় খুঁজেছেন। নিজ সত্তাকে আলগোছে সংরক্ষণ করেছেন মাহফুজা নামের আড়ালে। নিজেই যেন সঙ্গোপনে গড়ে তুলেছেন নিজের আশ্রয়দাতা, নিজেই সৃষ্টি করে ফেলেছেন নিজস্ব সৃষ্টিকর্তাকে। শব্দ আর কাব্যময়তার এক অপরূপ যূথতার মেলবন্ধন গড়েছেন আর পাঠককে সেই যূথতার আশ্রয়ে এক অন্য জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন যা চিরন্তনতার দাবি রাখে। আজ এই গ্রন্থের ৩০ বছর পূর্তি হতে যাচ্ছে। গ্রন্থটি অমর হয়ে আছে, অমর হয়ে থাকবে এই শুভকামনা রইল।