আমার কোনো ছায়া নেই

মাসুদ রানা আশিক :
আমি ছোট থেকেই এমন। একটু দুরন্ত, একটু চঞ্চল, অতিরিক্ত চটপটে এবং উগ্র। যেখানেই ঝামেলা সেখানেই যেন আমি। ঝামেলা এবং আমি যে একাত্মতা ঘোষণা করেছি। বড় হওয়ার পর সেটার নাম পরিবর্তন করে হয়েছে বাউণ্ডুলে। আমার জ্ঞান হওয়ার পরে প্রায় সবটুকুই মনে আছে। সামান্যতেই রেগে যাওয়া এবং সেই রাগের বহিঃপ্রকাশ হতো মারামারির মধ্য দিয়ে। আমি খুব মারামারি করতাম। যদি কেউ আমার বিরোধিতা করত, তখনই মারামারি। খুব ছোটবেলায়, তখন আমি ২য় শ্রেণির ছাত্র। ক্রিকেট খেলছিলাম। আম্পায়ার আমার একটি বল নো ডাকায় প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিলাম। আমি ভালো বল করি, তারপরও কেন আমার বল নো ডাকা হলো এটা নিয়েই আম্পায়ারের সঙ্গে আমার কথা কাটাকাটি। আম্পায়ার আমার সঙ্গে একটু জোরে কথা বলেছিল। ব্যস আমার মাথা হয়ে গেল গরম। ফলস্বরূপ আম্পায়ারকে স্টাম্প দিয়ে মাথায় আঘাত করে মাথা ফাটিয়ে ফেলেছিলাম। তারপর বিচার, সালিশ। আমার ছায়া হয়ে এগিয়ে এসে বাবা তার চিকিৎসার সব খরচ বহন করলেন। শুধু যে অন্যের মাথা ফাটিয়েছি তা কিন্তু নয়, আমার নিজের মাথাও ফেটেছে একাধিকবার। আমার মাথায় আজ পর্যন্ত সেলাইয়ের দাগ আছে একাধিক। প্রাইমারি স্কুলে কত যে মারামারি করেছি সেটা লিখতে গেলে আস্ত একটা ডায়েরি ভরে যাবে। আস্তে আস্তে একটু একটু করে বড় হলাম। কিন্তু আমার চরিত্রে কোনো পরিবর্তন হলো না। মারামারি করতাম সবার সঙ্গেই। বড় ছোট কোনো প্রকার বাছবিচার ছিল না আমার মাঝে। একটু রেগে গেলেই সব শেষ। ধরো আর মারো। আমি ছাত্র হিসেবে একেবারে খারাপ ছিলাম না। তারপরও কেন এমন ছিলাম সেটা আমি নিজেও বুঝতে পারি না। প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে হাইস্কুলে উঠেও আমার কোনো পরিবর্তন হয়নি। হাইস্কুলে পড়ার সময় এক শিক্ষকের হাতে মার খাওয়ায় তাকেও মারতে গিয়েছিলাম। যখন মারতে গেলাম তখন তিনি আমার শিক্ষক, আমার বাবার মতো এই চিন্তা মাথায় আসতেই মারার চিন্তাটা বাদ দিয়েছিলাম। মারামারি তো করতামই, উল্টো হাইস্কুলে উঠেই আমি নেশার জগতে প্রবেশ করলাম। খুব বেশি নেশা না হলেও তখনকার সময় সিগারেট অনেকের কাছেই বড় নেশা। সেই সময় নেশার জগতে ঢোকা আমার বন্ধু মানিকের মাধ্যমে। মানিক বড়লোক ঘরের সন্তান ছিল। তার বাবা টানত সেনর গোল্ড সিগারেট। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো তিনি সিগারেটের পুরোটা না টেনে আধাআধি টানতেন। আমি আর মানিক কিছুটা খেলার ছলেই ওই সিগারেট ধরাতাম। আমাদের সিগারেট টানার অভিজ্ঞতা না থাকায় প্রচণ্ড কাশতাম। কাশলে কী হবে, আমরা প্রতিদিনই মানিকের বাবার ফেলে দেয়া আধা সেনর গোল্ড সিগারেট টানতাম। একসময় এভাবেই হয়ে গেল নেশা। তখনকার সময় সিগারেট টানাটা খুব একটা সহজ ছিল না। সিগারেট টানাকে মানুষ খুব খারাপ চোখে দেখত আর কেউ যদি পূর্ণবয়স্ক না হয়েই সিগারেট টানত তাহলে তো ছিঃ ছিঃ রব উঠে যেত। তাই সিগারেট টানতাম একটু বুঝেশুনে। অপরিচিত কোনো দোকান থেকে একটা সিগারেট কিনে দূরে কোথাও যেয়ে সিগারেটে শুকটান দিতাম। আমি স্কুলে যেতাম কম। যদিওবা যেতাম, হাফ টাইমে স্কুল ফাঁকি দিয়ে চলে যেতাম পাশের একটা স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে। ঠিক বিকেলে যখন স্কুল টাইম শেষ তখন বাড়ি ফিরতাম। বাবা খুব ব্যস্ত থাকায় আমি স্কুলে যাচ্ছি কিনা, সে খোঁজ নিতে পারতেন না। আমি যখন নবম শ্রেণির ছাত্র তখন সোনালী নামের এক মেয়েকে ভালো লেগে গেল। ব্যস পড়াশোনার অবস্থা হয়ে গেল দফারফা। সারাদিন মেয়েটার পেছনে ঘুরতাম। কথাও বলতাম। একদিন সরাসরি প্রস্তাব দেয়াতে নালিশ গেল আমার বাড়িতে। আজ থেকে প্রায় ১৬ বছর আগে প্রেম নামক শব্দটা এত বেশি ব্যবহার হতো না। যারা প্রেম করত তারাও খুব গোপনে করত। এতটা প্রকাশ্যে ছিল না। বাড়িতে নালিশ যাওয়াতে প্রচুর মার দিল আমার বাবা। আমি রেগে গেলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম যেভাবেই হোক সোনালী নামের মেয়েটাকে অপমান করতে হবে। যে কথা সেই কাজ। স্কুল ড্রেস পরিহিত অবস্থায় একজন মেয়ের শালীনতা নষ্ট করা গুরুতর অপরাধ। তবুও আমি রাগের মাথায় তাই করেছিলাম। সোনালী যখন স্কুলে যাচ্ছিল তখন তার হাত ধরে টান দিয়ে প্রকাশ্যে ওকে চুমো দিয়েছিলাম। আমার নামে কেস হলো। কিশোর বিধায় সে যাত্রায় বেঁচে গিয়েছিলাম। অবশ্য বাবার ছায়ায় বেঁচে গিয়েছিলাম। তিনি কেস উঠিয়ে নিতে মেয়ে পক্ষকে চাপ প্রয়োগ করেছিলেন। বাবা আমার ছায়া হয়ে এগিয়ে এসেছিলেন ঠিকই, তবে তিনি আমাকে যে মার মেরেছিলেন সেই মারের স্মৃতি আমি কোনোদিন ভুলব না। লাঠির আঘাতে শরীরের অনেক অংশ কেটে যাওয়ার দাগ আজও আমি বহন করছি। এসএসসিতে আমার রেজাল্টও খুব বেশি ভালো হলো না। তারপর ভর্তি হলাম কলেজে। এখানেও আমার চরিত্রের কোনো প্রকার পরিবর্তন হলো না বরং কিশোর থেকে যুবক হওয়ায় রাগের পরিমাণ আরো বেড়ে গেল। কলেজে নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য সামান্য অজুহাতেই মারামারি করতাম। একসময় কলেজ থেকে আমাকে বের করে দেয়া হলো। এবারো ছায়া হয়ে এগিয়ে এলেন বাবা। তিনি একজন সরকারি উচ্চপদস্থ চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও কলেজ প্রিন্সিপালের কাছে ক্ষমা চেয়ে আমাকে পুনরায় ভর্তি করিয়ে দিলেন। আমি তখন যুবক বিধায় আমার গায়ে হাত তোলেননি বাবা। তবে উপদেশের ফুলঝুরি ফুটিয়েছিলেন। এমন উপদেশ আমার ভালো লাগত না। বাবাদের কাজই তো উপদেশ দেয়া। তারপরও বাবার সম্মান ক্ষুণœ হবে বিধায় এবার আমি একটু শান্ত হলাম। ইন্টার ফার্স্ট ইয়ার চলে যাওয়ার পর আবারো এক নারীর প্রেমে পড়লাম আমি। আমার বান্ধবীর মামাতো বোন ছিল মেয়েটা। নাম ছিল নূপুর। তাকেও প্রস্তাব দিলাম। কিন্তু আমি পরাজিত। আমাকে প্রত্যাখ্যান করল সে। এবার আর তার কোনো প্রকার শালীনতা নষ্ট করলাম না মেয়েটার। আমার এক বন্ধুকে যেয়ে সব খুলে বললাম। মুহূর্তেই সমাধান দিয়ে দিল সে। সমাধনটা ছিল গাঁজা সেবন। সিগারেটের নেশা তো ছিলই। এবার যুক্ত হলো গাঁজা। সবসময় গাঁজা খাওয়া শুরু করলাম। যখনই নেশা কেটে যেত আবারো সেবন। গাঁজা সেবন খুব ভালো লাগত। নিজেকে অন্য জগতের মানুষ মনে হতো। মনে হতো গাঁজা খেলে রাজা হয় এই তত্বটা মিথ্যা নয়। গাঁজা খাওয়ার পর নিজেকে হালকা মনে হতো। মনে হতো সব দুঃখ গায়েব। এভাবেই চলল অনেকদিন। নূপুর নামের মেয়েটাকে অনেকবার কথাটা বললাম। কিন্তু প্রতিবারই আমাকে সরাসরি না করে দিল সে। রাগে, ক্ষোভে-দুঃখে আমি গাঁজার পরিমাণটা বাড়িয়ে দিলাম। গভীর রাত পর্যন্ত বাড়ির বাইরে থাকতাম। আমার নেশার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতাম। একসময় জানাজানি হয়ে গেল সব। সবাই আমাকে দেখে নাক সিটকালো। আমাকে এড়িয়ে চলত। অনেক অভিভাবক তার সন্তানদের আমার সঙ্গে চলা বারণ করে দিল। বাবা আমার হাত খরচের টাকা বন্ধ করে দিল। আমি হয়ে গেলাম অসহায়। নেশা আমার চাই, নইলে আমি হয়ে যেতাম পাগল। বাড়ির জিনিস ভাংচুর করতাম। বাবা-মাকে গালাগালি দিতাম। এতকিছু করার পরও বাবা আমাকে হাত খরচ দিলেন না। বাধ্য হয়েই বাড়ির কাঁসার হাঁড়ি-পাতিল বিক্রি করলাম। তারপর নেশা করে পড়ে থাকতাম রাস্তায়। যখন দেখলাম বাড়ির কাঁসার সব জিনিস শেষ তখন হাত দিলাম সিলভারের হাঁড়ি-পাতিলের দিকে। তারপর মায়ের গহনা। এভাবে মায়ের গহনাও শেষ করলাম একদিন। মেয়েদের কাছে তার অলঙ্কার অনেক বেশি মূল্যবান। গহনা হারিয়ে মা প্রায় পাগল হয়ে গেলেন। কান্নাকাটি করতেন। আমি এসব পাত্তা দিতাম না। সব দুঃখ ভুলে থাকতে আমার প্রয়োজন নেশা। সেই নেশার জন্য আমি সব করতে রাজি। প্রায় সব বেচা শেষ করে আমি হাত দিলাম বাবার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। বাবার সই নকল করে টাকা তুলতাম। তারপর নেশা করতাম, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারতাম। একদিন এটাও জেনে ফেলল বাবা। আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হলো। ব্যাংক থেকে তোলা কিছু টাকা আমার কাছে থাকায় সেই টাকা দিয়ে ৫ দিন বাইরে থাকতে খুব বেশি বেগ পেতে হলো না। কিন্তু যখন টাকা শেষ হয়ে গেল তখন পড়লাম বিপদে। তারপর বুদ্ধি করে আমাদের মহল্লার এক বড় ভাইয়ের সহায়তায় বাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে গেলাম বাড়িতে। আমাকে বাড়িতে তোলা হলো ঠিকই, তবে রাখা হতো বন্দি করে। দিনের বেলা বাইরে যেতাম, তবে রাতে আমার রুমে তালা দিয়ে রাখা হতো। এমনকি প্রস্রাব-পায়খানা করতেও চিৎকার করে সবাইকে ডাকতে হতো। কেউ শুনতে না পেলে বাধ্য হয়ে ঘরের ভেতরেই প্রস্রাব-পায়খানা করতাম। বাইরে যেয়ে কোনো প্রকার অপকর্ম যাতে করতে না পারি এজন্যই এমন ব্যবস্থা করেছিলেন বাবা। কিন্তু যার মনে অপকর্ম সবসময় ঘুরে বেড়ায় সে কি বন্ধ ঘরে থাকবে? আমিও থাকিনি। একদিন রাতে আমার ঘরের জানালার শিক ভেঙে বের হয়ে গেলাম। নেশায় মাথাটা ফেটে যাচ্ছিল। আমার এক নেশা বন্ধুর সহায়তায় এক বাড়িতে গেলাম চুরি করতে। জানালার শিক ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে আলমারি খুলে গহনা চুরি করতে যেয়ে হাতেনাতে ধরা পড়লাম। বাবা-মা না হয় এতকিছু সহ্য করে আমাকে বাড়িতে রেখেছিল। পাড়া-পড়শি তো আর এত সহ্য করবে না। তাই আমাদের দুজনাকে থানায় দেয়া হলো। রায়ে আমাদের জেল হলো একবছর। এবার আর বাবা ছায়া হয়ে এগিয়ে এলেন না। এমন কুলাঙ্গার ছেলে যদি জেলেই থাকে তাহলেই মনে হয় তাদের ভালো লাগবে। আমাকে ছাড়াতে কেউ এলো না। আমি পড়ে রইলাম জেলে। জেলের একবছর এবং মাঝের প্রায় তিন বছর এই চার বছর আমার পড়াশোনা হয়নি। আমি হয়েছিলাম এসএসসি পাস। জেল থেকে বের হলাম এক বছর পর। ফিরলাম বাড়ি। কিন্তু আমার বাড়ি ফেরাকে মানতে পারেননি বাবা। তিনি আমার উপর নাখোশ ছিলেন। আমার সঙ্গে খুব একটা কথা বলতেন না তিনি। কিন্তু মা কথা বলতেন। মমতাময়ী তিনি। তার এত ক্ষতি করেছি তারপরও তিনি আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। এবার আমি কিছুটা ভালো হলাম। জেলের একবছরে আমি নেশা থেকে অনেক দূরে সরে এসেছিলাম। আমার নেশার সব বন্ধুকে দূরে ঠেলে দিলাম। বাইরে ঘুরতাম একা, সঙ্গে কেউ থাকত না। বাবা আমার সঙ্গে খুব একটা কথা না বললেও আমি বাবার কাছে থেকে প্রতিদিন ১০ টাকা করে নিতাম। সেই টাকা দিয়ে এক কাপ চা আর সামান্য কিছু খেতাম। মাঝে মধ্যে আমার স্কুল লাইফের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হতো। আমার খুব হিংসা হতো। তারা এখন পড়ালেখার পাঠ প্রায় চুকিয়ে ফেলেছে। কেউ কেউ ডাক্তারি পড়ছে আবার কেউবা ইঞ্জিনিয়ার। কেউ বা ভালো কোনো সাবজেক্টে অনার্স করছে। অনেকে পার্টটাইম জব করছে আর আমি ভবঘুরে ডট কম। একা একা রাস্তায় ঘুরি। কোনো পড়াশোনা নেই। আমার কোনো ভবিষ্যৎও নেই। মনে মনে আমি চাইছিলাম যে আবারো পড়াশোনা শুরু করি। কিন্তু বাবা তো তা চাইবেন না। কারণ আমার উপর তার বিশ্বাস নেই বললেই চলে। পড়াশোনা করালে শুধুই টাকাটাই নষ্ট হবে। লাভের লাভ কিছুই হবে না। আমি কিছুই বলতাম না বাবাকে। কিন্তু বিধাতা আমার উপকারে নিয়ে এলেন আমার বড় ভাইকে। তিনি ব্যাংকের একজন সিনিয়র অফিসার। তিনি হয়তো একই রক্তে জš§ নেয়া তার ভাইয়ের এমন অন্ধকার ভবিষ্যৎ মানতে পারেননি। একদিন তিনি তার কর্মস্থল বগুড়া থেকে আমাকে এসে বললেন, ‘রাকিব শোনো, তুমি কি ভালো হতে চাও? বড় ভাইয়ের কথা শুনে আমি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়েছিলাম। তারপর বড় ভাই বলেছিল, ‘তাহলে তুমি আমার সঙ্গে বগুড়া চলো। আমি তোমাকে কলেজে ভর্তি করিয়ে দেব। তুমি পড়বে। যা কিছু প্রয়োজন পড়বে সব আমাকে বলবে। আমি তোমার সব প্রয়োজন মেটাব।’
ভাইয়ার এমন সিদ্ধান্তকে বাবা ভালোভাবে নিতে পারেননি। তিনি ভাইয়াকে বলেছিলেন, ‘তুমি তো ওকে নিয়ে যেতে চাইছো। তোমার মনে রাখা উচিত কুকুরের লেজ কখনো সোজা হয় না। দেখা যাবে তোমারও অসম্মান করে ছাড়বে। আমাদের যেমন করেছে। আমরা আজও কারো কাছে মুখ দেখাতে পারি না শয়তানটার জন্য।’ ভাইয়া শুধু একটা কথাই বলেছিল বাবাকে, ‘যে কাউকে ভালো হওয়ার একটা সুযোগ দেয়া উচিত। সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার যদি সে না করে তাহলে পস্তাবে সে নিজেই। আমি ওর ভবিষ্যৎ গড়ানোর চেষ্টা করব মাত্র। তারপরও ও যদি ভবিষ্যৎ গড়ে নিতে না পারে তাহলে আমার কিছুই করার নেই। আমি চাই না মানুষ দুই ভাইকে দুই পজিশনে দেখুক।’
বাবার কথা অগ্রাহ্য করেই ভাইয়া আমাকে বগুড়া নিয়ে গিয়েছিল। আমিও একটা জেদ নিয়ে বগুড়া গিয়েছিলাম। আমার জেদ তৈরি করেছিল বাবার দুটো কথা, কুকুরের লেজ কখনো সোজা হয় না এবং শয়তান কথাটা। আমার জেদ ছিল আমি পরীক্ষা দেব এবং ভালোভাবে পাস করে উচ্চশিক্ষিত হব। বগুড়ায় শুরু হলো আমার জীবনের এক নতুন অধ্যায়। নতুনভাবে ইন্টার মিডিয়েটে ভর্তি হলাম বগুড়া আযিযুল হক কলেজে। কিন্তু বহুদিন পড়ার মধ্যে না থাকায় আমার মাথায় মরীচিকা পড়ে গিয়েছিল। আমি ঠিক ভালোভাবে পড়তে পারছিলাম না। শরণাপন্ন হলাম ভাইয়ার। ভাইয়া আমার আত্মবিশ্বাস জোগাল। পড়তে বলল। আমি পড়লাম। তারপর পরীক্ষার সময় সামনে আসতেই আমার টেনশন বেড়ে গেল। কেমন পরীক্ষা হবে এই চিন্তায় ছিল মাথায়। পরীক্ষা দিলাম এবং রেজাল্টও হলো আমার মনমতো। ভাইয়া বাবা-মা খুশি হলো। এবার আসল পরীক্ষা। আমার ইচ্ছা অনার্স করব। অনার্স ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। বিধাতার অপার করুণায় আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞান সাবজেক্ট পেলাম। এবার খুব ভালোভাবেই পড়লাম। রেজাল্টও হলো ঈর্ষণীয়। আমার জীবনের সব অতীত আমি নিজেই ভুলে গেলাম। আমি এখন আর কোনো সিগারেট টানি না। প্রেম নামক তত্বটাকে ভুলে গেছি অনেক আগেই। নেশা নামক শব্দটা আমার কাছে অতীত। আমার পড়ালেখা, আচার, ব্যবহার দিয়ে অতীত ভোলাতে বাধ্য করলাম আমার পরিবারকে। আগে আমি কাউকে সম্মান করতাম না। বড়দের সামনেই সিগারেট টানতাম। আমি যখন কলেজে পড়ছিলাম তখন সবাইকে সম্মান দিয়ে চলতাম। আমাদের মহল্লার সবাই আমার অতীত ভুলে গেল। এখনকার এই আমি একসময় খুব খারাপ ছিলাম এখন অনেকেই এটা বিশ্বাস করতে চায় না। একটা খারাপ অতীত সবারই ভুলতে অনেক সময় লাগে। আমি খুব তাড়াতাড়ি তা করতে পেরেছিলাম। এখন আমার পরিবার আমাকে নিয়ে গর্ব করে। ভাইয়া আমাকে নিয়ে গর্ব করে বলে, ‘আমরা ভাইয়েরা কেউ খারাপ অবস্থানে নেই। আমরা সবাই উচ্চশিক্ষিত। আমরা শিক্ষিত পরিবারের ছেলে।’
দুই.
বাবা মারা গেছে অনেক আগে। যে বড় ভাই আমাকে বগুড়া নিয়ে যেয়ে পড়াশোনা করিয়ে আমাকে ভালোর পথে এনেছে সেই ভাই বিয়ে করে এখন অনেক দূরে থাকে। বাবা মারা যাওয়ার আগে আমাকে ছায়া দিয়ে গেছে। যে কোনো বিপদে এগিয়ে এসেছেন তিনি। একটা সময় বড় ভাই ছায়া হয়ে এগিয়ে এসেছে। যার ছায়ায় আমি নতুন জীবন ফিরে পেয়েছি। এখন আর আমাকে কেউ ছায়া দেয় না। আজ আমার কোনো ছায়া নেই। নেই কোনো চাকরি। আবারো নিজের ভবিষ্যৎ আমি দেখি অন্ধকার। জমাট কালো অন্ধকার।