আমদানি বাড়লেও বিনিয়োগ বাড়ছে না

আমদানি বাড়লেও বিনিয়োগ বাড়ছে না

অস্বাভাবিকহারে বাড়ছেই আমদানি ব্যয়। কিন্তু সেই অনুযায়ী দেশে বিনিয়োগ বাড়ছে না। বাড়ছে না রফতানি আয়ও। সদ্য বিদায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আমদানিতে ৫ হাজার ১৫৩ কোটি ডলার সমপরিমাণ ব্যয় হয়েছে। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে কেবলমাত্র মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানির জন্য ৫১৫ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। ফলে নির্বাচনী বছরে আমদানির নামে অর্থ পাচার হচ্ছে কিনা এ বিষয়ে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকও বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।

মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি ব্যাপকহারে বাড়লেও পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাময়িক হিসেবে দেখা গেছে, গত অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ সামান্য বেড়ে ২৩ দশমিক ২৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছর শেষে যা ছিল ২৩ দশমিক ১০ শতাংশ। দেশে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত কয়েক বছর ধরেই বিনিয়োগ জিডিপির ২১ থেকে ২৩ শতাংশের বৃত্তে আটকে রয়েছে। কেবল মাঝে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তাতে কিছুটা উন্নতি দেখা গেছে। আলোচ্য সময়ে বেসরকারি বিনিয়োগ দাঁড়ায় জিডিপির ২৩ শতাংশে। পরবর্তী ২০১৬-১৭ অর্থ বছরেও একই অবস্থা। আর এর আগের ৩ অর্থ বছরে এটি ছিল ২১ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২২ দশমিক ১ শতাংশের মধ্যে। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বিনিয়োগ জিডিপির ২৮ শতাংশের আশপাশে। অথচ সরকারের কাক্সিক্ষত ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগ ৩৪ শতাংশে উন্নীত করা দরকার।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ বাড়লেই দেশের আমদানি বাড়ে। কিন্তু বর্তমানে তার উল্টো চিত্র দেখা গেছে। এর কারণ হিসেবে তারা আমদানির আড়ালে দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে পাচার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিকে তারা প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

এদিকে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ আগের মতো রেখে নির্বাচনী বছরে সতর্কতামূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যদিও সম্প্রতি ব্যবসায়ীদের চাপে বাংলাদেশ ব্যাংক হঠাৎ করেই টাকার প্রবাহ বাড়িয়ে দিতে নীতিমালা পরিবর্তন করেছে। এর একটি অংশ পাচার হওয়ার শঙ্কা করছেন তারা। এ ছাড়া, নির্বাচনের বছরে রাজনীতিতে উত্তাপ বাড়ে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশ থেকে বাড়ে অর্থ পাচার। গত দু’বার জাতীয় নির্বাচনের আগেই এ চিত্র ছিল বলে উঠে এসেছে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) প্রতিবেদনে।

জিএফআইয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ৭৫১ কোটি ৫০ লাখ ডলার অবৈধ পথে বাংলাদেশের বাইরে চলে গেছে। এ ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয় ২০১৩ সালে নির্বাচনের বছরটিতে। সে বছর ১ হাজার ৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার পাচার হয়। এর আগে সবচেয়ে বেশি পাচার হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনকালীন বছর ২০০৮ সালে। সে বছর পাচারের পরিমাণ ছিল ৯৭২ কোটি ১০ লাখ ডলার। চলতি বছরের শেষদিকে আবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে আমদানিতে সম্প্রতি উল্লম্ফন হয়েছে অস্বাভাবিকভাবে। অথচ আমদানির বিপরীতে রফতানি সেভাবে বাড়েনি। অনেক ক্ষেত্রে আমদানির বিপরীতে নির্দিষ্ট পণ্য দেশেই আসেনি। এতে আবারো প্রশ্ন উঠেছে নির্বাচনের বছরে দেশ থেকে অর্থ পাচার বাড়ছে কিনা? এ প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর মানবকণ্ঠকে বলেন, বিনিয়োগ এবং আমদানি একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ বিনিয়োগ বাড়লে আমদানি বাড়ে, অন্যদিকে বিনিয়োগ কমলে আমদানি কমে। কিন্তু এখন তার ব্যতিক্রম হচ্ছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আলোচ্য সময়ে আমদানির নামে মূলত দেশের টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল এমনকি খাদ্য পণ্য আমদানির নামেও অর্থ পাচার হতে পারে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরো কঠোর ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানান তিনি। একই প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জিডিপি অনুপাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগও বাড়ার কথা। কিন্তু আলোচ্য সময়ে নামমাত্র বিনিয়োগ বেড়েছে। এটা সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বেশি মূল্য দেখিয়ে অর্থ পাচার হচ্ছে কিনা বিষয়টি খতিয়ে দেখতে আমরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছি। দেরিতে হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক এ রকম উদ্যোগ নিয়ে থাকলে তা ভালো। তবে কেবল উদ্যোগ নিলেই হবে না, পাচারের সঙ্গে জড়িতদের আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে পারলে পাচারকারীরা নিরুৎসাহিত হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে, দেশে হঠাৎ করে ব্যাংকগুলো বড় ধরনের তারল্য সংকটে পড়েছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে সংকট ঘনীভূত হওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ অবস্থায় মূলধনী যন্ত্রপাতি, ভোগ্যপণ্য ও তুলা আমদানির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি বড় ধরনের খেলাপিরা বিদেশে অর্থ পাচার করছে কিনা সে বিষয়টিও নজরদারি করা হচ্ছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্ট ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান এবং ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহাম্মদ রাজি হাসান বলেন, অর্থ পাচারের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যথাযথ তদারকির মাধ্যমে এটি দেখা হচ্ছে ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের অনুসন্ধানে ৪ হাজার কোটি টাকার ওপরে অর্থ পাচার সংক্রান্ত অনিয়ম পাওয়া গেছে। এটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে নথি পাঠানো হয়েছে। তারা পুনরায় অনুসন্ধান করছে। এরপর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রচুর ডলার বিক্রির পরও সংকটে রয়েছে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার। ডলার সংকটের কথা বলে অনেক ব্যাংক শাখা এখন এলসি খুলতে চাইছে না। এ রকম পরিস্থিতিতে ডলার লেনদেনে কোনো অনিয়ম হচ্ছে কিনা খতিয়ে দেখতে সরেজমিন পরিদর্শন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যেসব ব্যাংক ডলার কিনছে, প্রথম ধাপে তাদের ডলার লেনদেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ডলার কিনে এসব ব্যাংক প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করছে, নাকি আমদানির আড়ালে অর্থ পাচার হচ্ছে, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, অর্থবছরের শুরু থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে ১১ কোটি ডলার বিক্রি করা হয়েছে। গত অর্থবছরে বিক্রি করা হয় আরো ২৩১ কোটি ডলার। এর পরও গত এক বছরে ডলারের দর ৪ শতাংশ বেড়ে ৮৩ টাকা ৭৫ পয়সায় উঠেছে। এর বেশিরভাগই কিনেছে রাষ্ট্রীয় মালিকানার সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী, বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও আল-আরাফাহ ইসলামী এবং বিদেশি মালিকানার এইচএসবিসি ব্যাংক। প্রথম পর্যায়ে এসব ব্যাংকের চট্টগ্রাম এবং ঢাকার বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী (এডি) বিভিন্ন শাখার ওপর পরিদর্শন করা হচ্ছে। এসব শাখা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর প্রধান কার্যালয়ের ট্রেজারি বিভাগের তথ্য মিলিয়ে দেখা হবে। সেখানে কোনো অসঙ্গতি পাওয়া গেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রচুর ডলার সরবরাহের পরও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে সংকট থেকেই যাচ্ছে। এ সংকটের মূলে আসলে চাহিদা নাকি আমদানির আড়ালে অর্থ পাচারের ফলে এমন হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ব্যাংকগুলো যেসব পণ্য আমদানির কথা বলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ডলার কিনছে আসলে সেই এলসি খুলছে কিনা, কিংবা ঘোষিত দামে ডলার বিক্রি করছে কিনা এসব খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মানবকণ্ঠ/এসএস