আবারো আন্দোলনে নামছেন ক্ষুব্ধ এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা

সরকারি শিক্ষকদের মতো বছর শেষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাঁচ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতা না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা। শিক্ষক নেতাদের দাবি, এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সরকার প্রদান করে। তাই পে-স্কেলে ঘোষিত সুবিধাও তারা প্রাপ্য হবেন। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নন। তারা এ সুবিধা পেতে পারেন না। এই দাবি আদায়ে আবারো আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়েছে কয়েকটি শিক্ষক সংগঠন।

লক্ষ্মীপুর দালাল বাজার ডিগ্রি কলেজের দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. আজিজুর রহমান আযম মানবকণ্ঠকে বলেন, বেসরকারি শিক্ষকরা বাড়িভাড়া পান ১ হাজার টাকা। এ দিয়ে বাড়িভাড়া তো দূরের কথা বাড়ির বারান্দাও ভাড়া পাওয়া সম্ভব নয়। তিনি জানান, চিকিৎসা ভাতা ৫শ’ টাকা এবং উৎসব ভাতা পান স্কেলের ২৫ ভাগ। পুরো চাকরি জীবনে মাত্র একটি ইনক্রিমেন্ট পেয়ে থাকেন। এটিও বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। তিনি বলেন, বেসরকারি কলেজের শিক্ষকদের পদোন্নতির কোনো সুবিধা ব্যবস্থা নেই। বেসরকারি কলেজে অনেক মেধাবী শিক্ষক এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রির অধিকারী হয়েও পদোন্নতিতে অনুপাত থাকার কারণে সহকারী অধ্যাপক হতে পারেন না। অষ্টম বেতন স্কেলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট ও বৈশাখী ভাতা বঞ্চিত করা হয়েছে।

অষ্টম পে-স্কেলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বৈশাখী ভাতা চালু করা হয়। দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বছর শেষে ৫ শতাংশ হারে বেতন বৃদ্ধির বিধান রয়েছে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতি অর্থবছরের শুরুতেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই সুবিধা পেয়ে যাবেন। সারাদেশে সরকারি স্বায়ত্তশাসিত এবং আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ২১ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী পাচ্ছেন। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীরা বেতনের সরকারি অংশ পেলেও বৈশাখী ভাতা এবং ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট পাচ্ছেন না। সরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষকরা এই সুবিধা পাচ্ছেন। এ নিয়ে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা চরম হতাশ। একাধিক শিক্ষক নেতা বলেন, অষ্টম বেতন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বার্ষিক পাঁচ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতা পেলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এই দ্বৈতনীতি ও বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত শিক্ষক সমাজ মেনে নিতে পারে না।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তিতে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে বিগত দিনের এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে। বিদ্যমান নীতিমালায় আরো সংশোধন আসবে। যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নতুন নির্দেশনা যুক্ত করা হবে। এর ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান বাদ যেতে পারে।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় শিক্ষক-কর্মচারী ফ্রন্টের মুখ্য সমন্বয়কারী অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, শিক্ষকদের অসন্তুষ্ট রেখে মানসম্পন্ন ও গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সমযোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার সরকারি শিক্ষকরা যে সুবিধা পাবেন, তা বেসরকারি শিক্ষকদের দিতে হবে।

স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের মহাসচিব অধ্যক্ষ মো. শাহজাহান আলম সাজু বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ৯৮ শতাংশ পরিচালন-বাস্তবায়ন ও নিয়ন্ত্রণ করছেন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা। শিক্ষা ব্যবস্থায় মাত্র ২ শতাংশ পরিচালনা করে সরকারের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন সরকারি শিক্ষকরা তা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। অধ্যক্ষ শাহজাহান সাজু জানান, শিক্ষকদের দাবি আদায়ে জেলা জেলায় পুরো ডিসেম্বর মাস স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ সমাবেশ করেছে। মার্চ মাসেই ঢাকায় বড় ধরনের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।

শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর খান বলেন, অষ্টম বেতন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বার্ষিক পাঁচ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতা পেলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এই দ্বৈতনীতি ও বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত শিক্ষক সমাজ মেনে নিতে পারে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ২০১৫ সালের ২০ ডিসেম্বর জারি করা এক আদেশে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য অনুদান সহায়তা শব্দটি জুড়ে দিয়ে তাদের অপমান করা হয়েছে দাবি করে ওই আদেশ বাতিলের দাবি জানান তিনি।

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি সৈয়দ জুলফিকার আলম চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মো. ইয়াদ আলী খান বলেন, বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকদের ৫ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি, পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতা ও বৈশাখী ভাতা প্রদানে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়েছে। একই সিলেবাসে পাঠদান ও একই যোগ্যতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও বেতন-ভাতার ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে বৈষম্য রয়েছে। এই বৈষম্য অব্যাহত থাকায় মানসম্পন্ন শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

মানবকণ্ঠ/এসএস