আবদুল হামিদ খান ভাসানী

দেশের মানুষের কাছে ‘মজলুম জননেতা’ হিসেবে সমধিক পরিচিত মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন একজন দূরদর্শী নেতা। তিনি ১২ ডিসেম্বর, ১৮৮০ সালে সিরাজগঞ্জের ধানগড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেছেন মক্তব হতে, পরবর্তীকালে কিছুদিন মক্তবেই শিক্ষকতা করেছেন। ১৮৯৭ সালে তিনি পীর সৈয়দ নাসিরুদ্দীনের সঙ্গে আসাম গমন করেন। ১৯০৩ সালে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯০৭ সালে দেওবন্দ যান ইসলামিক শিক্ষার উদ্দেশ্যে। দুই বছর সেখানে অধ্যয়ন শেষে আবার ফিরে আসেন আসামে। ১৯১৭ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ময়মনসিংহ সফরে গেলে তার ভাষণ শুনে অনুপ্রাণিত হন। ১৯১৯ সালে কংগ্রেসে যোগদান করে খেলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে দশ মাস কারাদণ্ড ভোগ করেন। ১৯২৩ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন স্বরাজ্য পার্টি গঠন করলে আবদুল হামিদ খান সেই দল সংগঠিত করার ব্যাপারে ভূমিকা পালন করেন। ১৯২৬ সালে আসামে প্রথম কৃষক-প্রজা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটান। ১৯২৯ সালে আসামের ধুবরী জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের ভাসান চরে প্রথম কৃষক সম্মেলন আয়োজন করেন। এখান থেকে তার নাম হয় ‘ভাসানীর মওলানা’। এরপর তার নামের শেষে ভাসানী শব্দ যুক্ত হয়। ১৯৩৭ সালে মওলানা ভাসানী কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগদান করেন। এ সময়ে আসামে ‘লাইন প্রথা’ চালু হলে এই নিপীড়নমূলক প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দান করেন। এ সময় তিনি ‘আসাম চাষী মজুর সমিতি’ গঠন করেন এবং ধুবরী, গোয়ালপাড়াসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ১৯৪০ সালে শেরেবাংলা একে ফজলুল হকের সঙ্গে মুসলিম লীগের লাহোর সম্মেলনে যোগদান করেন। ১৯৪৪ সালে মওলানা ভাসানী আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৪৫-৪৬ সালে আসামজুড়ে বাঙালিদের বিরুদ্ধে ‘বাঙ্গাল খেদাও’ আন্দোলন শুরু হলে ব্যাপক দাঙ্গা দেখা দেয়। এ সময় বাঙালিদের রক্ষার জন্য ভাসানী বারপেটা, গৌহাটিসহ আসামের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে বেড়ান। পাকিস্তান আন্দোলনে অংশ নিয়ে ১৯৪৭ সালে আসামে গ্রেফতার হন। ১৯৪৮ সালে মুক্তি পান। এরপর তিনি টাঙ্গাইলের সন্তোষে ফিরে আসেন।
১৯৫০ সালে সরকার কর্তৃক রাজশাহী কারাগারের খাপরা ওয়ার্ডের বন্দিদের ওপর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অনশন ধর্মঘট পালন করেন এবং ১৯৫০ সালের ১০ ডিসেম্বর তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫২ সালে ৩০ জানুয়ারি ঢাকা জেলার বার লাইব্রেরি হলে তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ গঠিত হয়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সহযোগিতার কারণে গ্রেফতার হয়ে ১৬ মাস কারা নির্যাতনের শিকার হন। জনমতের চাপে ১৯৫৩ সালের ২১ এপ্রিল জেল থেকে মুক্তি পান। ১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলনে তিনি পাকিস্তানের পশ্চিমা শাসকদের ‘ওয়ালাকুমুসসালাম’ বলে পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতার ঐতিহাসিক ঘণ্টা বাজিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ভারত যান এবং মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হন। রাজনৈতিক জীবনের বেশিরভাগ সময় মাওপন্থি কমিউনিস্ট তথা বামধারা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ নভেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই দেশবরেণ্য নেতা মৃত্যুবরণ করেন।
মমতা হক