আবদুর রউফ

আবদুর রউফ, নৌবাহিনীতে চাকরির সুবাদে পরিচিতি পেয়েছিলেন কমান্ডার আবদুর রউফ নামে। তিনি ছিলেন ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম অভিযুক্ত ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। ১৯৩৩ সালের ১১ নভেম্বর কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার ভৈরবপুর গ্রামে আবদুর রউফ জš§গ্রহণ করেন। বাবা আলহাজ আবদুল লতিফ। তিনি ছিলেন স্থানীয় পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান। পারিবারিক আবহে আবদুর রউফ ছাত্রজীবন থেকেই ছিলেন রাজনীতি সচেতন। জড়িয়ে পড়েছিলেন সরাসরি ছাত্ররাজনীতিতে। ১৯৫১-৫২ সালে নির্বাচিত ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক। ১৯৫৩-৫৪ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৫৫-৫৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এমএ ডিগ্রি সম্পন্নের পর যোগ দেন শিক্ষকতা পেশায়। ১৯৬১ সালে যোগ দেন ঢাকার শাহীন স্কুলে উপাধ্যক্ষ হিসেবে। পরবর্তীকালে ১৯৬২ সালে যোগ দেন পাকিস্তান নৌবাহিনীতে। নৌবাহিনীতে থাকার সময়েই ১৯৬৮ সালে তিনি গ্রেফতার হন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যদের সঙ্গে তাকেও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত করা হয়। প্রায় ১৪ মাস কারাগারে থাকার পর ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে মুক্তি পান। কারামুক্তির পর অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিয়ে যোগ দেন নরসিংদী কলেজে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়নের তরুণদের নিয়ে যে বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠিত হয়েছিল, সেই বাহিনীর তিন সদস্যের পরিচালকমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য ছিলেন আবদুর রউফ। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জিত হওয়ার পর ১৯৭২ সালে আবদুর রউফ বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৭৩ সালে তিনি কমান্ডার পদে উন্নীত হন। ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু নিহত হলে তৎকালীন সামরিক সরকার তাকে কারারুদ্ধ করে। ১৯৭৬ সালে তিনি কারামুক্ত হন। অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া কলেজে। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের (পিএসটিসি) প্রধান নির্বাহী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৯৩ সালে গণফোরাম গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছিলেন গণফোরাম সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য। মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০১৩ সালে বাংলা একাডেমি তাকে সম্মানসূচক ফেলোশিপ দেয়।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি এবং মুক্তিযুদ্ধের এই সংগঠককে স্মরণ করে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘একজন আবদুর রউফ’ গ্রন্থ। পিএসটিসির নির্বাহী পরিচালক ড. নূর মোহাম্মদ-এর লেখায় এই বইটিতে মুক্তিযোদ্ধা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম অভিযুক্ত এবং পিএসটিসির প্রতিষ্ঠাতা কমান্ডার (অব) আবদুর রউফকে নতুন করে খুঁজে দেখার চেষ্টা হয়েছে। যেখান থেকে এই কীর্তিমানের কীর্তিময় জীবন সম্পর্কে অবহিত হওয়া সম্ভব। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সালে ভৈরবের সন্তান আবদুর রউফ ৮২ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে যান। আমৃত্যু তার হƒদয়ের পুরোটা জুড়েই ছিল দেশের ভবিষ্যৎ-ভাবনা। স্বাধীনচেতা এ-মানুষটির স্মৃতির প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা।
মমতা হক