‘আফা, একটা মালা নিবেন?’

জ্ঞান-বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই দেখে আসছে তার বাবা বেলি ফুলের মালা বিক্রি করেন। প্রায় ২২-২৩ বছর ধরে বেলি ফুলের মালা বিক্রি করে বেড়াচ্ছেন। বাবার দেখাদেখি সেও একসময় বেলি ফুলের মালা বেচা শুরু করে। এখন সে বাবার চেয়ে বেশিই রোজগার করে। বাবা যদি ৫০টা মালা বিক্রি করে, সে করে ১৫০টা।

রবীন্দ্রনাথ যে যৌবনে চাদরের প্রান্তে বেলি ফুল বেঁধে ঘুরে বেড়াতেন কিংবা চীনের লোকজন যে এই ফুল চায়ের সঙ্গে মিশিয়ে খায়-এ কথাটাও সে জানে না। কিন্তু সে এটা ঠিকই জানে, রিকশায় ভাইয়াদের সঙ্গে যে আপারা ঘোরে, তাদের চোখের সামনে বেলি ফুলের মালা দুলিয়ে ‘আফা, একটা মালা নিবেন?’ বললে আপাদের জন্য ভাইয়ারা একটা হলেও মালা কিনবেই। তারপর আপারা যতœ করে সে মালাটা খোঁপায় বেঁধে নেবে। সে জানে, এ ফুলের গন্ধে অন্য রকম একটা কিছু আছে। একবার কারো নাকে গেলে না কিনে আর থাকা যায় না। এতো দিনে এ কথাটা ঠিক ঠিকই বুঝেছে।
জ্ঞান-বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই পেয়ারজান দেখে আসছে, তার বাবা বেলি ফুলের মালা বিক্রি করে বেড়ান। প্রায় ২২-২৩ বছর ধরে বেলি ফুলের মালা বিক্রি করে বেড়াচ্ছেন তিনি। বাবার দেখাদেখি সেও এক সময় তার বেলি ফুলের মালা বেচা শুরু করে। বলতে কি, এখন সে বরং বাবার চেয়ে বেশিই রোজগার করে। বাবা যদি ৫০টা মালা বিক্রি করেন, তো সে করে ১৫০টা।
পেয়ারজানের বাবা জাবেদ। দিনের বেলা তিনি রিকশা চালান আর সন্ধ্যার পর পথে পথে ঘুরে বেলি ফুলের মালা বিক্রি করে বেড়ান। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনের পর ঢাকায় পরথম আইয়া ফুলের মালা বিক্রি করতাম পাঁচ পয়সা কইরা। তহন বেলি ফুল কিনন লাগত না। এমনেই মাইনসের বাগান থেইকা টোকাইয়া আনতাম। অহন ফুল কিনা আনন লাগে, মালা বিক্রি করতে হয় পাঁচ ট্যাকা কইরা।’
জাবেদ জানান, এককালে পাউডার, বডি সেপ্র কিংবা উিওডোরেন্ট যখন ছিল না, তখন বিশেষ করে গরমের দিনে গায়ের দুর্গন্ধ তাড়াতে এ শহরের শৌখিন লোকেরা বেলি ফুলের একটা কি দুটো মালা সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়াত। এখন সময় পাল্টে গেছে, হাত বাড়ালেই হাজার রকম কৃত্রিম সুগন্ধি মেলে। তাই পুরুষেরা নিজেদের জন্য এখন আর আগের মতো বেলি ফুল কেনে না। অবশ্য কেউ কেউ গাড়ির ভেতরটাকে সুরভিত করতে রাস্তার সিগন্যাল থেকে দুটো বেলি ফুলের মালা কিনে রিয়ার ভিউ মিররে ঝুলিয়ে রাখে। তবে মেয়েরা খোঁপা সাজাতে বরাবরই বেলি ফুলের মালা জড়ায়। এ শহর থেকে বহু কিছু হারিয়ে গেছে, হারিয়ে যেতে বসেছে কিন্তু দুধসাদা বেলি ফুলের মালা মাথায় পরে খোঁপা সাজানো এখনো রয়ে গেছে।
খুদে ফুলবিক্রেতার কল্যাণে বেলি ফুলের মালা শহরের বড় বড় সব রাস্তার মোড়ে, সিগন্যালে আর পার্কে পাওয়া যায়। পাঁচ টাকা করে প্রতি পিস, জোড়া অবশ্য ১০ টাকা না দিয়ে আট টাকা দিলেও চলে। এই ফুলের মালা বিক্রি করেই ওরা দিনের খাইখরচটা তুলে আনে। শাহবাগ মোড়ে কথা হলো নিলুফার আর তার ভাই জনির সঙ্গে। তার ভাইটা এমনিতে লেবু বিক্রি করে। আর সে বিক্রি করে বেলি ফুলের মালা। মাঝে মধ্যে লেবু না থাকলে জনিও এসে হাত লাগায় ওর সঙ্গে। সিগন্যাল পড়লেই গাড়ির বন্ধ জানালার কাচে দুখী দুখী মুখ করে দাঁড়ায় আর কাঠিতে ঝোলানো ফুলের মালা নাড়ে।
জানালার কাচ নামিয়ে অনেকেই মালা কেনে। কখনো কখনো দামের চেয়ে বেশি টাকাও দিয়ে যায়। বাকিরা জানালা খোলে না, খুললে জানালা ময়লা করার জন্য কষে ধমকায়। তবু এই করেই দুই ভাইবোন মিলে ১০০ মালা বেচে ফেলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। তারা এ ফুলের মালা কেনেও শ হিসাবে। শাহবাগের ফুলের পাইকারদের কাছ থেকে মালা কিনে নিয়ে পথে পথে বিক্রি করে তারা। – নগরে নাগরিক ডেস্ক