আপিলেও মুক্তি পেলেন না খালেদা জিয়া

বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেয়া জামিন স্থগিত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। আগামী ৮ মে পর্যন্ত জামিন স্থগিত রেখে গতকাল সোমবার সকালে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ এ আদেশ দেন।

জামিন বহাল রাখতে আদালতের কাছে করজোড়ে অনুরোধ জানালেও সফল হতে পারলেন না জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হয়ে কারাগারে থাকা বেগম জিয়ার আইনজীবীরা। শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়ার জামিন আদেশ স্থগিতই থাকল সর্বোচ্চ আদালতে। একইসঙ্গে এই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জামিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও রাষ্ট্রপক্ষকে আপিলের অনুমতি দিয়েছেন আপিল বিভাগ। পাশাপাশি জামিন প্রশ্নে আপিল শুনানির জন্য রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদককে দুই সপ্তাহের মধ্যে সার সংক্ষেপ জমা দিতে বলা হয়েছে। আসামিপক্ষকে সারসংক্ষেপ দিতে বলেছেন তার পরের দুই সপ্তাহের মধ্যে। এ মামলায় জামিন স্থগিত হওয়ায় এবং আরো কিছু মামলায় তার জামিন নেয়ার প্রয়োজন থাকায় কারাবন্দি বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার এখন আর মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তিনি বলেছেন, এখন খালেদা জিয়াকে কারাভোগ করতে হবে। তবে জামিন প্রশ্নে সর্বোচ্চ আদালতের এ আদেশকে ‘নজিরবিহীন’ ও ‘অপ্রত্যাশিত’ হিসেবে বর্ণনা করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। তারা বলেন, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দেশের নিম্ন আদালতগুলোকে ‘গ্রাস করে’ ফেলেছে। উচ্চ আদালতকেও মনে হচ্ছে আস্তে আস্তে গ্রাস করার চেষ্টা করছে। আদালতকে এই জন্য আমি বলেছি, দেশের মানুষ আপনাদের কাছে বিচার পাওয়ার আশা নিয়ে আসে। কিন্তু তারা আশাহত হলে এই বিচারপ্রার্থী মানুষের আস্থা থাকবে না।

দুদকের পক্ষে আইনজীবী খুরশীদ আলম খান এবং রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদেশের সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন। আর খালেদা জিয়ার পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, এ জে মোহাম্মদ আলী, মাহবুবউদ্দিন খোকন ও জয়নুল আবেদীন।

গতকাল সকাল আদেশের শুরুতে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেন, এটা কিন্তু আমাদের সবার ডিসিশন। সর্বসম্মতিক্রমে এ আদেশ দিচ্ছি। এরপর আদালত খালেদা জিয়াকে দেয়া হাইকোর্টের জামিন আদেশ স্থগিত করে। পাশাপাশি রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদককে আপিলের অনুমতি দিয়ে সারসংক্ষেপ জমা দিতে বলে। মামলাটি আগামী ২২ মে আপিল শুনানির জন্য রাখা হয়। আদেশের পর আপিল বিভাগ নিয়মিত কার্যক্রমে যায়। কিছু সময় পর খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন আদালতকে বলেন, আমি দুঃখিত। আপনি কী আদেশ দিয়েছেন সেটা বুঝতে পারিনি। তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, আমরা সর্বসম্মত হয়ে এ আদেশ দিয়েছি। জয়নুল আবেদীন বলেন, আমি এটা জানতে চাইনি। কোন যুক্তিতে লিভ (লিভ টু আপিল) গ্রহণ করেছেন সেটা জানতে চাই। প্রধান বিচারপতি বলেন, আমরা নথি পর্যালোচনা করেছি। তখন জয়নুল আবেদীন বলেন, আমরাতো মেরিটে (মামলার মূল বিষয়বস্তুতে শুনানি করিনি) বলিনি। প্রধান বিচারপতি বলেন, আপিলে বলতে পারবেন।

এরপর খালেদা জিয়ার এ আইনজীবী বলেন, আপনারা সর্বোচ্চ আদালত। আপনারা যে আদেশ দেবেন শিরোধার্য। তবে ২২ মে অনেক দূর। আজকে যেভাবে লিভ (লিভ টু আপিল) গ্রহণ করলেন, এটা নজিরবিহীন। অতীতে এই ধরনের ক্ষেত্রে কোনো দিন লিভ (লিভ টু আপিল) গ্রহণ করা হয়নি। তাহলে তো সব (অতীতের সব মামলায়) লিভই (লিভ টু আপিল) গ্রহণ করা উচিৎ ছিল। তখন প্রধান বিচারপতি বেঞ্চ অফিসারকে ডেকে চার সপ্তাহের জায়গায় দুই সপ্তাহ করে দিতে নির্দেশ দেন। এ পর্যায়ে জয়নুল আবেদীন আদালতকে বলেন, ঠিক আছে। আপনি দুই সপ্তাহ করলেন। ২২ মে তারিখের ওই সময়টা এগিয়ে আনার অনুরোধ করছি।

এ সময় ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন আদালতকে বলেন, সরকার যে উদ্দেশ্যে এটা করেছে। দুদক আর সরকার তো একাকার হয়ে গেছে। খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে চায় এরপর জয়নুল আবেদীন বলেন, সময়টা কমিয়ে দেন। এপ্রিলে দেন।

তখন বিচারপতি ইমান আলী বলেন, তখন সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন ছুটি থাকবে। এ পর্যায়ে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ভ্যাকেশনের আগে দেন। বিচারপতি ইমান আলী তখন বলেন, ‘আফটার ভ্যাকেশন’।

জয়নুল আবেদীন বলেন, আফটার ভ্যাকেশন হলে দিন নির্ধারণ না করলে তো একই থাকল?
তখন প্রধান বিচারপতি ৮ মে পর্যন্ত খালেদা জিয়ার জামিন স্থগিত রেখে ওইদিন আপিল শুনানির দিন নির্ধারণ করে দেন।

খালেদার আইনজীবীদের শেষ চেষ্টা: খালেদা জিয়ার বিষয়ে আদেশের পর নিয়মিত কার্যক্রমের ফাঁকে গতকাল বেলা ১১টায় আদালত বিরতিতে যায়। সাড়ে ১১টায় আদালত আবার বসলে আপিল শুনানি এগিয়ে আনতে আরজি জানান খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। তখন আপিল বিভাগ বলেন, আমরা সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে ৮ মে দিন ধার্য করেছি। আমরা প্রথমে যে আদেশ দিয়েছিলাম, আপনাদের অনুরোধে পুনর্বিবেচনা করেছি। আদেশ হয়ে গেছে, এখন আর পরিবর্তন সম্ভব নয়। আইনজীবী দলে সবার সামনে ছিলেন ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার। আদালত কক্ষে ডায়াসের সামনে দাঁড়িয়ে ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, আদালতের কাছে আমাদের বিনীত আবেদন, সবার পক্ষ থেকে করজোড়ে আবেদন করছি, খালেদা জিয়ার মামলা ভ্যাকেশনের আগেই শুনানির দিন ধার্য করা হোক। আগামী ১৩ এপ্রিল থেকে ৫ মে পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট অবকাশকালীন বন্ধ থাকবে। ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার বারবার শুনানির দিন এগিয়ে আনার জন্য অনুরোধ জানাতে থাকলে আদালত বলেন, ‘আমরা নিশ্চয়তা দিচ্ছি, ৮ মে এই মামলা শুনানির জন্য তালিকায় শীর্ষে থাকবে। বিরতিহীনভাবে শুনানি হবে। ৮ মে না হলেও ৯ মের মধ্যে এই মামলা নিষ্পত্তি করব।’

এদিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন আদালত থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, এই আদেশকে আমরা ‘নজিরবিহীন’ বলতে বাধ্য হচ্ছি এই কারণে যে অতীতে এ ধরনের আদেশ দেশের সর্বোচ্চ আদালত দেয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দেশের নিন্ম আদালতগুলোকে ‘গ্রাস করে’ ফেলেছে। উচ্চ আদালতকেও মনে হচ্ছে আস্তে আস্তে গ্রাস করার চেষ্টা করছে। আদালতকে এ জন্য আমি বলেছি, দেশের মানুষ আপনাদের কাছে বিচার পাওয়ার আশা নিয়ে আসে। কিন্তু তারা আশাহত হলে এই বিচারপ্রার্থী মানুষের আস্থা থাকবে না। দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আমরা মর্মহত। আমরা ব্যথিত।

আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেলের প্রেসব্রিফিং: কারাবন্দি বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার এখন আর মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তিনি বলেছেন, এখন খালেদা জিয়াকে কারাভোগ করতে হবে। গতকাল সোমবার সকালে খালেদা জিয়ার জামিন স্থগিত করে আপিল বিভাগের আদেশের পর নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন অ্যাটর্নি জেনারেল। মাহবুবে আলম বলেন, আদালত লিভ টু আপিলের (আপিলের জন্য অনুমতি চেয়ে আবেদন) শুনানির জন্য ২২ মে ধার্য করেছিলেন। পরে খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এগিয়ে এনে ৮ মে নির্ধারণ করেছেন।

আদেশকে নজিরবিহীন উল্লেখ করেছেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা এই বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এ ধরনের বক্তব্য নিশ্চয়ই খুব একটি ভালো উচ্চারণ নয়। জিনিসটাকে রাজনীতিকীকরণের জন্য তারা চেষ্টা করছেন। এখানে খালেদা জিয়াকে সব রকম সুবিধা দিয়ে আদালত এ দণ্ড প্রদান করেছেন। দণ্ড প্রদানের ক্ষেত্রে আদালত যে কতখানি মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন, ন্যায়নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন, তার সামাজিক মর্যাদা ও বয়স বিবেচনায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। যদিও অন্যদের ১০ বছর দিয়েছেন। কাজেই এটাকে নিয়ে যারা রাজনীতি করতে চাইছেন, তারা নিশ্চয়ই সফল হবেন না। কারণ এখানে কোনো রাজনীতির বিষয় না। এটা সাধারণ অপরাধের বিষয়।

প্রসঙ্গত, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় গত ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার জজ আদালত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়ার পর থেকে তিনি পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন সড়কের পুরনো কারাগারে বন্দি। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হওয়ার পর মামলার নথি নিম্ন আদালত থেকে এনে তা দেখে গত ১২ মার্চ খালেদা জিয়াকে চার মাসের জামিন দেয় হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষ ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে গেলে সর্বোচ্চ আদালত ১৪ মার্চ জামিন স্থগিত করে নিয়মিত লিভ টু আপিল করতে বলে। গতকাল সোমবার সেই আবেদন মঞ্জুর করে তাদের আপিলের অনুমতি দেয়া হলো।

মানবকণ্ঠ/এসএস