আপন মাহমুদ : শীত হতে বসন্ত এত দূরে!

আপন  মাহমুদ : শীত হতে বসন্ত এত দূরে!

আরেকটি নিষ্ঠুরতম দিনের সংখ্যা বেড়ে যায় আমাদের। ১২ সেপ্টেম্বর চিরতরে না-ফেরার দেশে চলে যান তরুণ কবি আপন মাহমুদ। আপন মাহমুদ যার ডাক নাম ছিল রহিম। কবিতার টানে চলে আসেন ঢাকায়। যার শুধু একটিই ঠিকানা জানা ছিল। আজিজ মার্কেট। কবিতার অমোঘ টানে তিনি সব অনিশ্চয়তাকে সঙ্গী করে চলে আসেন। তারপর কঠিন সংগ্রামে মুখর হতে হয় তাকে। অবশ্য এ সংগ্রাম তার শৈশব-সাথী ছিল। তো কবিতার প্রতি যার এত টান কেমনতর কবি ছিলেন তিনি! তার একটিমাত্র কাব্যগ্রন্থই এর প্রকৃষ্ট জবাব। এখানেই তিনি সুস্পষ্ট জানান দিয়েছিলেন একজন প্রতিভাবান কবির সব পরিচয়। হয়ে উঠেছিলেন তার সমসাময়িক এবং অগ্রজ অনেক কবিদের প্রিয় কবি। প্রতিভাবান এ জন্য যে তার সময়ের অন্যরা যা লেখেন, যেভাবে লেখেন তিনি সে-রকম নন। সময়ের স্রোতে থেকে, সময়ের ঝাঁকের মধ্যে থেকে তিনি অন্যরকম বাঁকের কবিতায় রত ছিলেন। ফলে তার বোধ ও অভিব্যক্তিকে তিনি বিপুলভাবে সঞ্চারিত করতে পেরেছিলেন অন্যদের মাঝে।

কবিতা- এমন এক প্রপঞ্চ যা সারাজীবনের সাধনার সঙ্গে তুলনা করা চলে। তো সারাজীবনের সাধনার শুরুটাই ছিল তার চমৎকারিত্বে ভরা। অন্যরকম কাব্য কুশলতায় তিনি অতি অল্প সময়েই অনন্য হয়ে ওঠেন। আর ব্যক্তি? ব্যক্তি হিসেবে তিনি ছিলেন সবার প্রিয়। কারণ তার অমায়িকতা, তার সহজতা, তার সরলতা, তার নিষ্পাপতা আর ছিল ভিড় থেকে সরে দাঁড়ানোর মানসিকতা, জটিল দলাদলি ও দালালি থেকে যোজন যোজন দূরে নিজেকে সংযত রাখা। কবিতা তার চরম আরাধ্য আর নিজ পেশায় ছিলেন আত্মনিবেদিত। ফলে কী কবিতায়, কী ব্যক্তিত্বে তিনি এমন স্বতন্ত্র হয়ে ওঠেন যে, সবার প্রিয় হয়ে যান। কিন্তু তিনি যে এত তাড়াতাড়ি বাস্তবের অতীত হয়ে যাবেন, এত তাড়াতাড়ি স্মৃতি হয়ে যাবেন আমরা কেউ ভাবিনি। আমরা কেউই ভাবিনি এভাবে তাকে মূল্যায়ন করতে হবে। লিখতে হবে অকাল প্রয়াত। তার প্রথম ও একমাত্র কাব্যগ্রন্থ সকালের দাঁড়ি, কমা পড়ার পর সেলফোনে একটা খুদেবার্তা পাঠিয়েছিলাম। লিখেছিলাম, কবি, এগুলো কী লিখেছেন আপনি! এভাবে কেউ লেখে! আপনাকে জড়িয়ে ধরে যদি কাঁদতে পারতাম!’ কোনো ফিরতি বার্তা আসেনি। মন খারাপ করেছিলাম একটু। পরে ভেবেছিলাম এ আর নতুন কী? ব্যস্ততা তো আমাদের অনেক কিছুই কেড়ে নিচ্ছে। এটাও হয়তোবা তাই। কিন্তু না, আমার ধারণা মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়ে দুইদিন পর কবি নিজেই ফোন করলেন আমাকে। বললেন, আপনার এসএমএসটা আমি অনেককে দেখিয়েছি। আমি বললাম, আমার বিবেচনায় আমাদের দশকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থের জনক আপনি। বোধকরি শ্রেষ্ঠতম। তিনি হেসেছিলেন অনেকক্ষণ। বলেছিলেন, ‘কই, কেউ তো এভাবে বলে না। হয়তোবা পড়েই না।’ কবির কণ্ঠে অভিমান।

প্রথম কাব্যগ্রন্থ বের হবার পর মেলায় দেখা হলো। সেই চিরাচরিত লাজুক আর বিনয়ী মানুষটা। অটোগ্রাফে লিখে দিলেন, এমরান কবির, আমাদের মেঘগুলো বৃষ্টি না হয়ে মেঘদূত হতে ভালোবাসে। আমি বললাম, ওই কবিতাটি না থাকলে এ বই আমি নেব না। কবি হেসেছিলেন তখন। কোন কবিতা? ‘মায়ের উদ্দেশে বাবা যে চুমুটা ছুড়ে দিয়েছিলেন বাতাসে/ শুনেছি সেই হাওয়াই চুমুটা থেকেই জš§ নিয়েছিলো/ পৃথিবীর প্রথম প্রজাপতি।’ মনে পড়ে এই কবিতাটি যখন প্রথম পাঠ করেন তখনকার কথা। অধুনালুপ্ত দৈনিক আজকের কাগজের অফিস। সন্ধ্যা। কবি শামীম রেজাকে মধ্যমণিতে রেখে আমরা কতিপয় তরুণ। স্বল্পবাক মজনু শাহ, স্মিতহাস্য মাসুদ হাসান, বাকপটু মাহমুদ শাওন, জুয়েল মোস্তাফিজ, সফেদ ফরাজি। আপন মাহমুদ এলেন। নতুন লেখা কবিতা পড়ার আসর চলছে। আপন মাহমুদকে বলা হলো। অত্যন্ত লাজুক ভঙ্গিতে সাইড ব্যাগ থেকে ছিন্ন একটি কাগজ বের করে তিনি পাঠ করলেন এই কবিতা। আমরা অভিভূত। আমরা তখনও জানি না। এই কবি কতটা আগ্নেয়গিরি বুকের ভেতরে লালন করে চলেছেন।

জানলাম টাঙ্গাইলে গিয়ে। ২০০৬ সালে কবিতা উৎসবে। আমাদের রাত্রি যাপনের ব্যবস্থা হয়েছিল সেভ আওয়ার চিলড্রেন নামের এক এনজিওর রেস্ট হাউসে। গভীর রাত পর্যন্ত সার্কিট হাউসে আড্ডা দিয়ে যখন আমাদের নির্ধারিত জায়গায় ফিরছিলাম তখন আপন মাহমুদ গান ধরলেন ‘তোমরা ভুলে গেছো মল্লিকাদির নাম।’ রাতে শুয়ে থেকে আড্ডা চলছিল। অন্ধকারে। বললাম, কবি আপন, মুজিব ইরমের একটি কবিতায় অন্ধকারে হেড দেবার একটি প্রসঙ্গ আছে। আপনি পড়েছেন? বললেন, না তো। আমি তখন কবিতাটি বললাম। খুব যেন লীন হয়ে গেলেন কবিতার সঙ্গে। একটু পর বললেন, চলেন তাহলে আমরা এখন অন্ধকারে হেড দিতে দিতে শিশিরের কাছে যাই। যেই কথা সেই কাজ। আমরা বেরিয়ে পড়লাম ঘর থেকে। খালি পায়ে। কবিকে যেন কথায় পেয়ে বসেছিল। বলে যাচ্ছিলেন তার অনেক ব্যক্তিগত কথা। বেদনায় বেদনায় কাতর হয়ে যাচ্ছিলাম আমরা আর হাঁটছিলাম খালি পায়ে শিশির মেখে মেখে। চারিধারে শ্বেতশুভ্র চাঁদের আলো। আশপাশে রহস্যময় ঝোপঝাড়।

একবার আমরা গেলাম নারায়ণগঞ্জে। গঙ্গাফড়িং নামের এক সংগঠনের অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা সেরে আমরা চলে গেলাম নদীর কাছে। একটা নদী পার হয়ে যেন আমাদের পেয়ে বসল নদীর নেশা। পর পর কয়েকটা নদী পার হলাম। নৌকা এগিয়ে চলছে। আমরা তার সঙ্গে সঙ্গে। আমরা মানে কবি শামীম রেজা, গণসংগীতশিল্পী কফিল আহমেদ, মাসুদ হাসান, জুয়েল মোস্তাফিজ, আপন মাহমুদ, মৃদুল মাহবুব। হঠাৎ কবি শামীম রেজা নৌকা থেকে নদীর পানিতে পা ডুবিয়ে দেন। নদীহীন এলাকার মানুষ আমি। ভয়ে প্রায় চিৎকার দিয়ে উঠি। তখনই কবি আপন মাহমুদ গান গেয়ে ওঠেন, আমি শুনেছি সেদিন তুমি সাগরের ঢেউয়ে চেপে নীল জল দিগন্ত ছুঁয়ে এসেছো।’ মৌসুমী ভৌমিকের কণ্ঠ ছাপিয়ে কবি আপন মাহমুদের কণ্ঠ আরো আপন হয়ে ওঠে আমাদের কাছে।

এভাবেই কবি আপন সবার আপন হয়ে ওঠেন। আর আপন হওয়ার জন্য বেদনাটাও বেশি লাগে। কেন এত আপন হয়ে উঠলেন কবি আপন মাহমুদ? যদি হয়েই উঠলেন, কেন তবে চলে গেলেন এভাবে? যদি চলেই যাবেন তাহলে কেন একবার আপনাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করার সুযোগ দিলেন না? আমার এই ব্যক্তিগত প্রত্যাশাটা তো অন্তত মেটাতে পারতেন!

বেহালাবাদক নামীয় কবিতায় তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি আছি অজস্র পাতা ঝরার শব্দ নিয়ে।’ তাহলে কি আগেই কবি টের পেয়েছিলেন চিরতরে চলে যাওয়ার কথা? না হলে শীত তো এলোই না। কবি চলে গেলেন শরতেই। আহা কাশবনের মাঝে কবির ছবিগুলো আমাদের চোখের পানিকে প্লাবন বানিয়ে দেয়।

কবি হওয়ার জন্যই তিনি জন্মেছিলেন। যদিও ‘শীত হতে বসন্ত এত দূরে যে, সেই বেহালাবাদকের সঙ্গে আমার আর দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।’ কবি হয়েই তিনি চলে গেছেন। রেখে গেছেন অল্পসংখ্যক কবিতা। যেগুলো ছাড়া তার প্রজন্মের কবিতার ইতিহাস অসম্পূর্ণ।

মানবকণ্ঠ/এসএস