আনসারদের শ্রমের টাকায় ভাগ বসালেন কর্মকর্তারা!

আনসারদের শ্রমের টাকায় ভাগ বসালেন কর্মকর্তারা!

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বরত আনসার সদস্যদের পারিশ্রমিকের টাকা দিতে কর্মকর্তারা ঘুষ বাণিজ্য করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় দায়িত্বরত ৩২ হাজার ১২৪ জন আনসারের কাছ থেকে ৪শ’ টাকা করে কমপক্ষে ১ কোটি ২৮ লাখ ৪৯ হাজার ৬শ’ টাকা ঘুষ আদায় করেছেন উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তারা। এ ঘটনায় আনসার এবং গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর বরিশালের উপপরিচালক বরাবরে লিখিত অভিযোগ দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কর্মকর্তারা।

বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় ২১টি আসনে এবার ভোটকেন্দ্র ছিল দুই হাজার ৬৭৭টি। প্রত্যেক কেন্দ্রে ১২ জন আনসার সদস্য এবং দু’জন গ্রুপ কমান্ডার দায়িত্ব পালন করেন। সেই হিসেবে বিভাগের ছয় জেলায় মোট ৩২ হাজার ১২৪ জন আনসার সদস্য নিয়োজিত (কমান্ডার বাদে) ছিলেন। নির্বাচনকালীন ছয় দিন ডিউটি হিসেব করে প্রত্যেক আনসারের জন্য ৪ হাজার ৫৭৫ টাকা এবং গ্রুপ কমান্ডারদের প্রত্যেকের ৫ হাজার ৫৭৫ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। নির্বাচন শেষে ৬ দিন পর গত ৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে আনসারদের মাঝে বরাদ্দকৃত টাকা বিতরণ করা হয়।

বরিশাল জেলার ছয়টি আসনে ৮০৫টি ভোটকেন্দ্রে আনসার সদস্য ছিলেন নয় হাজার ৬৬০ জন। এর মধ্যে বরিশাল সদর আসনে ১৭৪ কেন্দ্রের দুই হাজার ৮৮ জন আনসার সদস্যের কাছ থেকে চারশ’ টাকা হারে ৮ লাখ ৩৫ হাজার ২০০ টাকা ঘুষ নিয়েছেন উপজেলা কমান্ড্যান্ট আফজাল হোসেন। এর থেকে একশ’ টাকা নিয়েছেন গ্রুপ কমান্ডাররা। আর বাকি টাকা আফজাল হোসেন এবং অন্যান্য কর্মকর্তারা ভাগ করে নিয়েছেন। বিভাগের বাকি ৫টি জেলায় একইভাবে ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়েছে আনসারদের কাছ থেকে আদায়কৃত টাকা। আনসার সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সর্বনিম্ন ৪শ’ এবং সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করা হয়।

মুলাদী উপজেলার আনসার গ্রুপ কমান্ডার আব্দুল মজিদ বলেন, নির্বাচনের ১৫/২০ দিন পূর্বে আমাদের কাছ থেকে ৪শ’ টাকা নিয়েছেন আনসার অফিসের কর্মকর্তারা। ওই টাকা থেকে একশ’ টাকা দেয়া হয়েছে গ্রুপ কমান্ডারদের। ৬ ডিসেম্বর আমাদের ছয় দিনের পারিশ্রমিক হিসেবে চার হাজার ৫৫৭ টাকা পরিশোধ করা হয়। তবে গ্রুপ কমান্ডাররা পেয়েছেন পাঁচ হাজার ৭ টাকা।

বরিশাল সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদের বাসিন্দা আনসার সদস্য জাহিদুল ইসলাম বলেন, তার কাছ থেকে ১ হাজার টাকা নেয়া হয়েছে। এভাবে বিভাগের ভোলা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, পটুয়াখালী ও বরগুনায় দায়িত্বরত আনসারদের কাছ থেকে ৪শ’ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করা হয়। অভিযোগের ব্যাপারে সদর উপজেলা কমান্ড্যান্ট আফজাল হোসেন পুরো বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে বেশ কয়েকজন আনসার সদস্যদের কথোপকথনের রেকর্ড শুনালে তিনি চুপ হয়ে যান। পরে তিনি বলেন, অভিযোগের আংশিক সত্য। তবে আমি টাকা উঠিয়েছি এ কথা ঠিক না। অফিসের অন্য কেউ হয়তো কাজটি করেছেন। তাদের দায় আমার উপর এসে পড়েছে। আমি হার্টের রোগী। দয়া করে এ নিয়ে লেখালেখি করবেন না।

বরিশাল আনসার ও ভিডিপি কার্যালয়ের উপপরিচালক শেখ ফিরোজ আহমেদ বলেন, নির্বাচনে যারা দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের বেশিরভাগ সদস্যই গ্রামের দরিদ্র মানুষ। তাদেরকে খণ্ডকালীন নিয়োগ দেয়া হয়। ১০ দিন মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষে বিভিন্ন কেন্দ্রে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের জন্য তাদের প্রত্যেককে সাড়ে চার হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে। আগে থেকেই আমরা উপজেলা কর্মকর্তাদের সতর্ক করে দিয়েছি যাতে এই গরিব মানুষদের কাছ থেকে কোনো ধরনের ঘুষ গ্রহণ না করা হয়। কিন্তু তারপরেও বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে টাকা আদায়ের অভিযোগ আমার কানে এসেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আশ্বাস দেন তিনি।

বরিশাল রেঞ্জের পরিচালক আশরাফুল আলম বলেন, আমাদের কাছে এ ধরনের কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। কেউ অভিযোগ দিলে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.