আদ্যনাথ ঘোষের কবিতায় নান্দনিকতা

জহুরুল ইসলাম :
কাব্য সরস্বতীর শিল্পসাধনায় মগ্ন হয়ে প্রবহমান জলের ঘূর্ণির টানে যিনি আটকা পড়েছেন-জলের তোড়ে ভেসে যাননি, যার সমগ্র চিন্তা-চেতনা কাব্য লক্ষ্মীকেন্দ্রিক, কবিতা যার নিত্যসঙ্গী, কবিতা যার আটপৌঢ়ে সংসারের আত্মা, নিঃসঙ্গতার খেলার সঙ্গী, একলা পথের পথিক তিনি হচ্ছেন কবি আদ্যনাথ ঘোষ। কবিতা বড় আদরের মানিক, আঁতুড় ঘরের সন্তানের মতো এর সঙ্গে রাগারাগি করা চলে না, জোর খাটানো যায় না। আবেগের বশে আপনিতে এসে ধরা দেয়, তখন সাদা পাতা বিছানার ওপর আদর করে শুইয়ে দিতে হয়। বুদ্ধদেব বসু কোনো এক আলোচনায় বলেছেন, ‘কবি দুই জাতের হয়’। এক পক্ষ আবেগতাড়িত, অন্য পক্ষ চেতনাতাড়িত। শেষ দিকে না হলেও হয়তো শুরুতে সবাই আবেগের বেগ ঠেকাতে না পেরে লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। এতে জাত কুল যাওয়ার সম্ভাবনা নেই, আবার যে ঘাট হয়ে যায় তাও নয়। প্রয়োজন শুধু পরিপক্বতার। পরিপক্বতা আসে পাঠের মাধ্যমে, জ্ঞানার্জনের ভেতর দিয়ে। আবেগের একটা দুর্বলতা আছে, তা নেশার মতো। নেশা ক্ষণিকের জন্য দেহ-মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে। এক সময় এ ঘোর কেটে যায়। কিন্তু পরিণত লেখকদের আবেগ মণি-মুক্তার মতো মূল্যবান। তাতে সোনালি কাবিনের মতো সোনা ফলে। আবেগের ভেতর একই বৃত্তে ঘুরপাক খেতে থাকেন। চেতনাহীনতার সেটাই উপযুক্ত সময়। কবি আদ্যনাথ ঘোষও চেতনাহীন স্বপ্নে বিভোর-
বড় বেশি স্বচ্ছ স্বপ্ন
মনে-প্রাণে ঢেউ তুলে স্থির থাকে
যেথায় ভালোবাসা থাকে
ভালোবাসা সজীব থাকে
থাকে স্পর্শকাতর চাহনীর দ্যুতি।
(চেতনাহীন স্বপ্ন)
আবার খানিক পরেই মাতালের মতো ছুটে যান বহুদূর। তার মাতাল মন খুঁজে ফেরে রাত্রির অভিধানে বাগধারা, ব্যাকরণ, সমাস; তারপর গড়ে তোলেন কাব্যের চাতাল। কী আছে ঐ চাতালে? আছে অবিশ্বাসের দহন আর আগুনে পোড়া বোবা অনুতাপ। তার অগ্নিদগ্ধ মনটি ছুটে চলে এভাবে-
হারানো দিনটি যেনো আজ
বহুদূর মাতালের স্বপ্নে।
(নিখোঁজ সংবাদ)
কবিতা ধরা পড়ে কানে ও বোধের ভেতরে। আর চোখে ধরা পড়ে কালো অক্ষরে ছাপা পঙ্ক্তিমালা। এই পঙ্ক্তিমালার ভেতর লুকিয়ে থাকে অদৃশ্য গোপন শক্তি। যেমন লুকিয়ে থাকে পাহাড়ের পাথরের ভেতর অনলের ঢেউ। এটাই সুখের অনল যা পৃথিবীকে প্রাণ দিয়েছে। কবি আদ্যনাথ ঘোষও যেন প্রাণের আগুনে পোড়া প্রাণ। আগ্নেয়গিরির মতো তার বুকের গভীরে জেগে ওঠে অনলের ঢেউ। তার এ ঢেউ এককেন্দ্রিক নয়, দ্বিকেন্দ্রিক। তার কবিতা পাঠে প্রকাশ্যে অনলের ঢেউ অনুভূত হয়-
তোমার বুকে জোয়ার আনে
অনলের ঢেউ
রাতের আকাশে ভেসে ওঠে
চাঁদের মতো কেউ…
(জোয়ার)
এরপর কবি মৃত্যু উপত্যকায় নেমে পড়েন। কার জন্য, কী জন্য? আর কীই বা আছে এর ভেতর! অবাক হয়ে দেখি, জীবনের চূড়ান্ত পরিণতির ছাইভস্ম থেকে জয়ের অনুপ্রেরণার অনুসন্ধান করে চলেছেন। তার খোলা বাতায়নে হাওয়ার দাপটের মতো প্রবঞ্চনা, বেদনা এসে বার বার আঘাত হেনেছে। নিশীথের নিথর হাওয়ায় জানালার পাশ দিয়ে উড়ে গেছে সমস্ত উর্বশীরা। তবুও তার মনে জেগেছে দখিনা হাওয়ার পদধ্বনি। একবার নয়, দুইবার নয়, বহুবার। দীপহীন মৃত্তিকার ধুলায় হাঁটতে হাঁটতে এক ভয়ানক পথের ধারে এসে আচমকা থমকে গেছেন-
অথচ যেমন জ্বলেনি দীপ
তেমনি মৃত্তিকা ধুলার ধুলায়
একাকার এক ভয়ানক পথ
মানুষের না বলা গল্পটা আজ
আপাতত এইখানে থাক।
(অপ্রকাশিত গল্প)
আদ্যনাথ ঘোষ একজন কালসচেতন কবি। বর্তমান শিল্প বিপ্লবের সময়ে ধরণীর রূপ দ্রুত রূপান্তরিত হতে থাকে। পুঁজিবাদী গোষ্ঠী সবকিছু ভয়ঙ্কররূপে গিলে খাচ্ছে। গ্রামের পর গ্রাম, খাল-বিল, সবুজ প্রান্তর, মাঠ-ঘাট- সব শহরের পেটের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। আর শহরের পেট ফুলে আকাশে উঠছে। এটা যেন গ্রাম খেকো অজগর-
তাতার ঘোড়ার পিঠে ছুটেছে
নাগরিক স্থাপত্যবিদ্যের যোদ্ধাকুল
পতন হচ্ছে গাঁয়ের পর গাঁ
তার হাতে
গ্রাম খেকো অজগর…
(শঙ্কা)
অনলের পোড়ামন মায়ের শীতল কোলে এসে পায় শান্তির ছোঁয়া। গভীর ঘুমে শান্তির ঘুম। ‘জন্মভূমি তুমি মাগো’ কবি আদ্যনাথ ঘোষের তেমনি একটি কাব্যগ্রন্থ। মায়ের কোলে অভিমানী ঘুমন্ত শিশু মাঝে মধ্যে যেমন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে, আদ্যনাথ ঘোষও কখনো কখনো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছেন। জানি নির্জন রাত পোহাবেই, এখনো বাংলা কাঁদে, জেগে ওঠো মানবতা, তোমরা জেগে ওঠো, জনম দুখিনী মা, এদেশে আলো আসবেই প্রভৃতি কবিতায়। আমরা অনেক সময় মাকে ব্যথা দেই- বুঝে, না বুঝে, ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়, গোচরে-অগোচরে। কিন্তু মা কখনো প্রতিবাদ করেন না, প্রতিশোধ নেন না। সন্তানের মঙ্গল কামনায় মা সবসময় প্রার্থনা করেন। আশীর্বাদ দেন।
তনি কখনো কখনো হয়ে ওঠেন সুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদী কবি। হৃদয় বিষাদাক্রান্তে ভরে ওঠে বাঁধন গড়া আবার বাঁধন ছেঁড়ার ভয়ে। কবির হৃদয়ে মহাকালের প্রতিধ্বনি বেজে ওঠে। তার কামনা পৃথিবীর অতল গহ্বরে মহাকালের যাত্রায় দুঃখ, জ্বরা, ক্লেদ, মৃত্যু, ব্যর্থতা এবং অবিশ্বাসের দাগ যেন না আসে, শুধু বয়ে যাবে আনন্দের ঝর্ণাধারা, এই পৃথিবীর আলো-বাতাস, ফুল-পাখি, সবুজ শ্যামল প্রান্তর ছেড়ে চলে যেতে কিছুতেই মন সায় দেয় না। তবু চলে যেতে হবে এই শাশ্বত সত্যকে স্বীকার করে। তখন তার বিষাদাক্রান্ত মন গেয়ে ওঠে-
একদিন চলে যাব-
এই মায়ের মতো গ্রাম, শহর-বন্দর
বন-বনানীর মায়ার বাঁধন ছেড়ে
পৃথিবীর অতল গহ্বরে…
ইতোমধ্যে কবি আদ্যনাথ ঘোষের সাতটি কাব্য প্রকাশিত। আলোর রেখা, লাল নীল শাড়ির আঁচল, হৃদয়ে উতল হাওয়া, আমি তোমাদেরই একজন, জš§ভূমি তুমি মাগো, ভোরের পাখি ও উত্তরের জানালা। কাব্যগুলোর কবিতায় উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, শ্লেষ, অনুপ্রাস ও অলঙ্কারের উপস্থিতি-কবি সঠিকভাবে ব্যবহার করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। কবি আদ্যনাথ ঘোষের কবিতা পাঠের সময় কান পেতে শুনলে বোঝা যাবে অলঙ্কারের ঝনঝনানি। অলঙ্কারে কবিতা নববধূর অঙ্গের মতোই ঝলমল করে ওঠে। কবিতার ছন্দ কানে এসে ধরা দেয়। আর অলঙ্কার কানের ভেতর দিয়ে চলে যায় বোধের ভেতরে। কবিতা অনুভব ও বোধের বিষয়। কিন্তু ছন্দ শেষ হয় কানে এসে। কবি আদ্যনাথ ঘোষের প্রাণের আকুল আকুতি-
ফিরাইয়ো হৃদয় অন্যপাশে
কেনই বা হৃদয় দিবে তাকে?
আমি তো চেয়ে আছি তোমার দিকে
অনন্তকাল; শেষঅবধি…
(ভালোবাসার অভিপ্রায়)
কবি আদ্যনাথ ঘোষের কাব্যচর্চা বাংলা ভাষাকে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ করবে বলে আমি আশা করি।