আদালতে আর আসবেন না খালেদা জিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা মামলা কারাগার চত্বরে স্থাপনের পর দ্বিতীয় দিনের কার্যক্রমে উপস্থিত হননি বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। কারাগারে বসানো আদালতে তিনি আর আসবেন না বলে বিচারককে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। খালেদার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া আদালতকে বলেন, খালেদা জিয়া আদালতের প্রতি সব সময় শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু তিনি অসুস্থ। তিনি আসার মতো অবস্থায় নেই। তবে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল আদালতে বলেছেন, খালেদা জিয়া কারাগারে আছেন। তিনি আদালতে না এলে আইন অনুযায়ী এ মামলার বিচারকাজ চলবে। পরে উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করেছেন আদালত। গতকাল বুধবার রাজধানীর নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে অবস্থিত ঢাকার অস্থায়ী ৫ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. আখতারুজ্জামান শুনানির দিন ধার্য করেন। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এর এই বিচারক বলেছেন, খালেদা জিয়া আদালতে না এলে কীভাবে তিনি জামিনে থাকবেন। এ ব্যাপারে খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) আইনি ব্যাখ্যা দিতে বলেছেন।
গতকাল বুধবার দুপুরে পুরনো ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগার চত্বরে বসানো আদালতে মামলার কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম দিনের কার্যক্রমে বিএনপি চেয়ারপার্সনের পক্ষের আইনজীবী আদালতে অনুপস্থিত থাকলেও গতকাল ২ জন আইনজীবী মামলার কার্যক্রমে অংশ নেন এবং খালেদা জিয়ার জামিন বৃদ্ধির জন্য আবেদন করেন।
সকাল সাড়ে ১০টায় কারাফটকে ৩ দফা তল্লাশি করে মোবাইল ফোন জমা রাখা হয়। এরপর সাংবাদিক ও আইনজীবীরা আদালতে উপস্থিত হন। বিচারক আদালতের খাস কামরায় আসেন বেলা ১১টার দিকে। এরপর খালেদা জিয়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু না আসায় এর মধ্যে দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে বিচারক এজলাসে উঠে শুনানি শুরু করেন। আদালত দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে শুরু হয়ে সোয়া ১টা পর্যন্ত চলে। মুলতবি ঘোষণার আগে বিচারক ড. মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, আমার কাছে একটি চিঠি এসেছে। এতে খালেদা জিয়া বলেছেন, তিনি আর আদালতে আসবেন না। এ অবস্থায় প্রধান আসামির অনুপস্থিতিতে মামলার কার্যক্রম চলতে পারে কিনা, সে ব্যাপারে আইনগত ব্যাখ্যা হাজির করার জন্য আসামি পক্ষের আইনজীবীদের নির্দেশ দেন আদালত।
এর আগে দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে শুনানির শুরুতে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল আদালতকে বলেন, বিজ্ঞ আদালত, মামলাটি যুক্তিতর্কের জন্য রয়েছে। প্রধান আসামি আদালতে উপস্থিত হননি। তিনি আসবেন না বলে আদালতকে জানিয়েছেন। উনি যদি না আসেন তাহলে আইনানুযায়ী মামলার অসমাপ্ত কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য আবেদন করছি।
এ সময় খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া আদালতকে বলেন, ‘বিজ্ঞ আদালত, আমরা ২টি আবেদন দিয়েছি। একটিতে খালেদা জিয়ার জামিন বৃদ্ধির আবেদন করছি। অপরটিতে আমরা আপনার কাছে আবেদন করতে চাই, ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলার আলোকে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অনুমতি ছাড়া ঢাকা কেদ্রীয় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনের ৭ নম্বর কক্ষকে অস্থায়ী আদালত হিসেবে ঘোষণা করে সরকারের গেজেট প্রকাশ সংবিধানের পরিপন্থী এবং আইনবিরোধী। এ বিষয়টি এরই মধ্যে প্রধান বিচারপতিকে অবহিত করা হয়েছে।
সানাউল্লাহ মিয়া আরো বলেন, এ ছাড়া দরখাস্তকারী খালেদা জিয়া ৫ সেপ্টেম্বর আদালতে উপস্থিত হয়ে বলেছেন, তিনি অসুস্থ। তার শরীরের অবস্থা খুবই খারাপ। এ আদালতে ন্যায়বিচার হবে না, তার বাম হাত ও পা প্যারালাইসড হয়ে যাচ্ছে। এতে পুরো জাতি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছে। বিএনপির আইনজীবীরা এরই মধ্যে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে এবং মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেত্বত্বে জ্যেষ্ঠ নেতারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেখা করেছেন। তিনি তার চিকিৎসার জন্য একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করে দিয়েছেন। এ অবস্থায় এ আদালতে মামলা পরিচালনা ঠিক হবে না। কেননা, এ আদালত এতই ছোট যে এখানে মামলা পরিচালনার পরিবেশ নেই। এরপর খালেদা জিয়ার অপর আইনজীবী আমিনুল ইসলাম বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই বকশীবাজার আলিয়া মাদরাসা মাঠে মামলা পরিচালনা হয়ে আসছে। একটি মামলার রায়ও সেখানে হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করে কী হলো যে, এখানে মামলা পরিচালনা করতে হবে। গেজেট প্রকাশে নিরাপত্তার অজুহাত দেখানো হয়েছে। অথচ এখানে ছোট একটি কক্ষে আদালত পরিচালনা হচ্ছে। এখানে আইনজীবী, পুলিশ, সাংবাদিক কারো বসার জায়গা নেই। এটি একটি খেলনা কোর্ট বসানো হয়েছে। ১২ ফুট বাই ২৪ ফুটের একটি কক্ষে আদালত বসনো ইতিহাসে নজির হয়ে থাকবে। গুহার মতো এ কক্ষটির চেহারা স্যাঁতসেঁতে। এখানে কোনো পরিবেশ নেই। আপনাকেও অনেকটা বিব্রত অবস্থার মধ্যে প্রবেশ করতে হয়। যেহেতু এ আদালত নিয়ে এরই মধ্যে প্রধান বিচারপতিকে অবহিত করা হয়েছে, তাই মামলার কার্যক্রম মুলতবি করা হোক। তবে আমরা আসামির জামিন বৃদ্ধির আবেদন করছি। এ পর্যায়ে দুদকের আইনজীবী মোশররফ হোসেন কাজল বলেন, তারা একদিকে বলছেন আদালত সংবিধান পরিপন্থী। অপরদিকে জামিন আবেদন করছেন। এতে করে দুই রকম আচরণ হয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞ আদালত, এটা হতে পারে না। আমি বলব, আদালত মামলার যুক্তিতর্ক যেন শুরু করেন।
আদালত তখন খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, আপনারাই ঠিক করেন আদালতে মামলা পরিচালনা করবেন কিনা? আর আসামি যদি আদালতে না আসেন তাহলে জামিন বৃদ্ধি করা ঠিক হবে কিনা? এ সময় আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, খালেদা জিয়া আদালতের প্রতি সব সময় শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু তিনি অসুস্থ। তিনি আসার মতো অবস্থায় নেই। এরপর আদালত জামিন প্রশ্নে শুনানির জন্য আজ বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেন।
গতকাল সকাল থেকেই মামলার কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে আদালতের বাইরে মোতায়েন করা হয় বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। এই কারাগারেই জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে বন্দি আছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন।
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় মোট আসামি ৪ জন। খালেদা জিয়া ছাড়া অপর ৩ আসামি হলেন- খালেদা জিয়ার তৎকালীন রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, হারিছ চৌধুরীর তৎকালীন একান্ত সচিব জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান। এ মামলায় রাষ্ট্র পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন মোট ৩২ জন। ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা করা হয়।
৪ সেপ্টেম্বর আইন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে মামলার কার্যক্রম খালেদা জিয়া যেখানে বন্দি আছেন, সেই কারাগার চত্বরে আদালত বসানোর তথ্য জানানো হয়। পরের দিন ৫ সেপ্টেম্বর মামলার কার্যক্রমে আইনজীবীরা না গেলেও খালেদা জিয়া হুইলচেয়ারে করে আদালতে আসেন।