আততায়ী আগস্ট: এখনো উদ্যত ঘাতক বুলেট

শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির প্রথম স্বপ্ন জাগানিয়া সন্তান। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে অন্যকে সুখী করার অভ্যাস ছোট বেলায়ই রপ্ত করেছিলেন তিনি। শৈশবেই তার চরিত্রে সমাবেশ ঘটেছিল স্বাধীনচিন্তা, দেশপ্রেম, অন্যায় ও পীড়নের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদের সাহস।

চির ন্যুব্জ বাঙালির ঘরে শেখ মুজিবই একমাত্র বাঙালি সন্তান- যিনি ব্যক্তিগত অনমনীয় মনোবল, সীমাহীন ত্যাগ, দেশপ্রেমের আবেগ, সমষ্টির মধ্যে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন। তার অপূর্ব আবেগ ও আচরণ বাঙালি জাতিকে লড়াকু করেছিল। শেখ মুুজিব শুধু স্বাধীন বাংলাদেশেরই স্থপতি নন, তিনিই নতমুখী বাঙালিকে ঊর্ধ্বমুখী করার প্রথম প্রেরণা।

বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থেকে প্রথমে লন্ডন, পরে দিল্লি এবং অবশেষে স্বাধীন বাংলার মাটিতে এসে ভাষণ দেন ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘বাঙালি জাতি প্রমাণ করে দিয়েছে যে, তারা মানুষ, তারা প্রাণ দিতে জানে।’ ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি যে বাঙালিকে বঙ্গবন্ধু ‘মানুষ’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন সেই বাঙালি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট প্রমাণ করে দিয়েছে তারা ‘মানুষ’ নয়, তারা ‘বিশ্বাসঘাতক-হন্তারক’।

বিশ্বাসঘাতকতা যাদের রক্তের প্রতিটি কণিকায় বহমান, প্রতারণা আর স্বার্থপরতা যাদের মজ্জাগত ব্যাধি, সেই ব্যাধিগ্রস্ত বাঙালিকে বঙ্গবন্ধু পরিপূর্ণভাবে সুস্থতা দান করতে পারেননি। বঙ্গবন্ধুর ক্ষমাপরায়ণ দৃষ্টি বাঙালির মসৃণ চামড়া দেখতে পেলেও চামড়ার নিচের বিশ্বাসঘাতকতার ক্ষতকে দেখতে পায়নি। বাঙালির মুখের কথাকে মনের কথা ভেবে তিনি শুধু ভুলই করলেন না- সপরিবারে শহিদ হয়ে বাঙালিকে স্বাধীনতা উপহার দেয়ার মর্মান্তিক মাসুল দিয়ে গেলেন। নিজের বুকের রক্ত দিয়ে লিখে গেলেন এমন এক অবিশ্বাস্য কিন্তু সত্য গল্প পৃথিবীর ইতিহাসে যার সমতুল্য আর কিছু নেই।

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরে স্বাধীন বাংলা আবার চলে যায় ঘাতকদের দখলে। চারদিকে আজ ঘাতকরা সক্রিয়। আজ বাংলার উপাসনালয় ঘাতকের দখলে, শিক্ষাঙ্গন ঘাতকের দখলে, রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দেখছি ঘাতকের হর্ষধ্বনি। ঘাতকরাই আজ শক্তিশালী বাংলার জমিনে। চতুর্দিকে ষড়যন্ত্রের জটিল জাল বিস্তার করে বাংলা ও বাঙালিকে শ্বাসরুদ্ধ করে রেখেছে ঘাতকরা। এত ঘাতক, এত প্রতারক, এত ষড়যন্ত্রকারী কীভাবে জন্ম নিল বাংলার পবিত্র মাটিতে? যে মাটিতে সোনা ফলে- সেই মাটিতে কী করে এত শয়তান উৎপাদন হলো? যে দেশের বাতাসে বাতাসে ওড়ে মন্ত্রপূত মধুরেণু, সে দেশের বাতাসে শাঁই শাঁই শব্দে কীভাবে আজ উড়ে চলে ঘাতক-বুলেট? আমরা একটি শান্তির স্বর্গ চেয়েছিলাম।

নির্বিঘ্ন জীবন প্রত্যাশা করে উৎসর্গ করেছিলাম স্বজনের উষ্ণ রুধির অথচ আমরা স্বর্গ সুখের বদলে আজ কেবল শাস্তিই পাচ্ছি, পবিত্র রক্তের বদলে পাচ্ছি ষড়যন্ত্রের ফাঁস। তাহলে কি কোনোই ভবিষ্যৎ নেই আমাদের? আমাদের যাত্রা পথের শেষ বিন্দুতে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে শুধুই অন্ধকার, গ্লানি আর বধ্যভূমির নৃশংসতা?

বাঙালি আজ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে- একদলে আছে লাঠিয়াল বাঙালি, আরেক দলে লড়াকু বাঙালি। লাঠিয়ালরা দেশি-বিদেশি প্রভুদের পদলেহী ও প্রভুদের হুকুম পালনে সদাব্যস্ত। নির্ভীক, সত্যসন্ধানী লড়াকু বাঙালিরাই আজ স্বাধীন বাংলার একমাত্র ভরসা।

ঘাতকের উদ্যত বুলেট যতই প্রাণঘাতী হোক, ঘরের ছাদ, সিঁড়িঘর, পবিত্র মাটি, যতই স্নাত হোক না কেন পিতার বুকের রক্তিম শিশিরে- আলোকাভিসারী লড়াকু বাঙালি সূর্যকিরণ পান করে হবে সূর্যসন্তান। পিতলের বুলেট বড়জোর পিতাকে হত্যা করতে পারে, কিন্তু পিতার আদর্শকে হত্যা করতে পারে না। – লেখক: সহকারী অধ্যাপক, বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার

মানবকণ্ঠ/এএএম