আজ পাবনায় যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

আজ পাবনায় যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

স্বাধীনতার পরপরই পাবনার মানুষ যে দাবি জানিয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে, এতদিনে এসে পূরণ হতে চলছে তা। মানুষের ভালোবাসার মর্যাদা দিতে ১৯৭৪ সালে ঈশ্বরদী-পাবনা রুটে রেলপথ নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু ’৭৫ পরবর্তী সময়ে সে প্রকল্প আর এগোয়নি। ২০১৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি নতুন করে কাজ উদ্বোধন করেছিলেন তার মেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ ১৪ জুলাই সেই রেলপথ উদ্বোধন করতে যাচ্ছেন তিনি। সেইসঙ্গে তিনি উদ্বোধন করবেন পাবনা-ঈশ্বরদী-রাজশাহী রেলপথে ‘পাবনা এক্সপ্রেস’ নামে নতুন ট্রেন। এ ছাড়া ৩১টি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ১৮ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে জেলা আওয়ামী লীগের আয়োজনে জনসভায় প্রধানমন্ত্রীর অংশ নেয়ার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে পাবনা এখন পরিণত হয়েছে উৎসবের নগরীতে। সব জায়গায় সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। প্রধামন্ত্রীকে বরণ করতে পুরো শহরে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। চোখে পড়ার মতো স্থাপনাগুলো রং করা হয়েছে। নতুন রূপে সাজানো হয়েছে সার্কিট হাউস, সংস্কার হচ্ছে ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট। জেলা প্রশাসন ও দলীয় নেতাকর্মীরা এ নিয়ে দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন। জেলাজুড়ে বিরাজ করছে সাজ সাজ রব।

রেলপথ সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন জানান, ১৪ জুলাই পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ মাঠে জনসমাবেশ থেকে নতুন এ রেলপথ ও ট্রেনের শুভ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। এরই মধ্যে আমরা সমাপ্ত হওয়া প্রকল্পটি পরিদর্শন করেছি। তিনি বলেন, ঈশ্বরদী-পাবনা-রাজশাহী রেলপথে ভ্রমণের পাশাপাশি দ্রুতই রেলপথে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করতে পারবেন এলাকাবাসী। এ পথ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে সরঞ্জাম আনা নেয়াতেও ভূমিকা রাখবে।

রেলওয়ে মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন জানান, জনসমাবেশ শেষে রেলপথমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক পাবনা রেলস্টেশনে অবস্থান করে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী হুইসেল বাজিয়ে নতুন ট্রেনটি চালু করবেন। তিনি বলেন, এ লাইন নির্মাণে অনেক আবেগ ভালোবাসা মোড়া রয়েছে, রেলওয়ে কর্মকর্তা কর্মচারীরাও তা অনুভব করেন। রেলপথমন্ত্রীর নির্দেশনায় পাবনা-ঢাকা সরাসরি ট্রেন সার্ভিসও যত দ্রুত সম্ভব চালু করা হবে।

ঈশ্বরদী-পাবনা রেলপথ প্রকল্পের পরিচালক মো. আসাদুল হক জানান, আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। এরই মধ্যে এ লাইন দিয়ে নির্ধারিত গতিতে সফলভাবে ট্রেন চালানো হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক জানান, এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১০ সালের অক্টোবর মাসে। এক হাজার ৬২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ঈশ্বরদী থেকে পাবনা হয়ে ঢালারচর পর্যন্ত ৭৮ কিলোমিটার রেললাইন ও স্টেশন নির্মাণের কাজ শেষ হয় কয়েক মাস আগে। এ লাইনে ১১টি স্টেশন, ১১৩টি ছোট-বড় রেলসেতু, ৫২টি লেভেল ক্রসিং রয়েছে। এক হাজার ১৪ দশমিক ২১ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। পরিচালক জানান, উদ্বোধনের দিন থেকেই এ লাইনে ৪২৩টি আসন নিয়ে ‘পাবনা এক্সপ্রেস’ ঈশ্বরদী-পাবনা-রাজশাহী-পাবনা-ঈশ্বরদীতে চলাচল করবে।

রেলওয়ে বাণিজ্যিক বিভাগ থেকে জানা যায়, ১৪ জুলাই থেকে প্রতিদিন ভোর পৌনে ৬টায় ঈশ্বরদী থেকে ব্রডগেজের ‘পাবনা এক্সপ্রেস’ পাবনার উদ্দেশে ছেড়ে যাবে। আবার সকাল সোয়া ৭টায় দ্বিতীয় ট্রেনটি পাবনা থেকে ঈশ্বরদীর উদ্দেশে ছেড়ে সকাল ৮টা ১০ মিনিটে বাইপাস রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছবে। এ স্টেশন থেকে ট্রেনটি রাজশাহীর উদ্দেশে ছেড়ে সকাল সাড়ে ৯টায় রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছবে।

তৃতীয় ট্রেনটি বিকেল সোয়া ৫টায় রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন থেকে ছেড়ে সন্ধ্যা ৬টা ২৫ মিনিটে ঈশ্বরদী বাইপাস স্টেশনে পৌঁছবে। ২ মিনিট বিরতি শেষে এ স্টেশন থেকে ট্রেনটি ছেড়ে সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে পাবনা রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছবে। এসি ও শোভন চেয়ার আসন থাকছে এতে। টেবুনিয়া, দাশুরিয়া, মাঝগ্রাম, ঈশ্বরদী, ঈশ্বরদী বাইপাস, আজিমনগর, আবদুল্লাহপুর, লোকমানপুর, আড়ানি, নন্দনগাছী, সরদহ রোড, বেলপুকুর, হরিয়ান, রাজশাহী স্টেশন ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রেলওয়ে স্টেশনে বিরতি দেবে ট্রেনটি।

৩১টি প্রকল্পের উদ্বোধন: সূত্র জানায়, আজ পাবনা জেলার পুলিশ লাইন্স মাঠে জনসভার প্যান্ডেল থেকে প্রধানমন্ত্রী ৩১টি প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন। তা হলো- ঈশ্বরদী থেকে মাঝগ্রাম হয়ে পাবনা পর্যন্ত রেলওয়ে সেকশনে ট্রেন চলাচল; পাবনা মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাস ও ছাত্রীনিবাস; ঈশ্বরদী থানা ভবন; জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স; সুজানগর উপজেলার নাজিরগঞ্জ, আটঘরিয়া উপজেলার মাঝপাড়া, ঈশ্বরদী উপজেলার পাক্শী, সলিমপুর, লক্ষ্মীকুণ্ডা, সাঁড়া, পাবনা সদর উপজেলার চরতারাপুর এবং চাটমোহর উপজেলার ছাইকোলা ইউনিয়ন ভূমি অফিস; ফরিদপুর উপজেলায় বড়াল নদীর ওপর নারায়ণপুর সেতু; ভাঙ্গুরা উপজেলায় গোমানী নদীর ওপর নৌবাড়িয়া সেতু; ঈশ্বরদী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স; চাটমোহর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স; পাবনা সিটি কলেজের একাডেমিক ভবন; আটঘরিয়ার দেবোত্তর ডিগ্রি কলেজের একাডেমিক ভবন; খিদিরপুর ডিগ্রি কলেজ, একাডেমিক ভবন; চাটমোহর মহিলা কলেজের একাডেমিক ভবন; সুজানগরের বোনকোলা স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাডেমিক ভবন; সুজানগর মহিলা কলেজের একাডেমিক ভবন; সাঁথিয়ার শহীদ নুরুল হোসেন ডিগ্রি কলেজের একাডেমিক ভবন; ঈশ্বরদী মহিলা কলেজের একাডেমিক ভবন; সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের প্রশাসনিক ভবন; আটঘরিয়ার ডেঙ্গারগ্রাম ডিগ্রি কলেজের একাডেমিক ভবন; আটঘরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স; চাটমোহর উপজেলায় গোমানী নদীর ওপর নিমাইচড়া সেতু; চাটমোহর উপজেলায় কাটাখাল সেতু; চাটমোহর উপজেলায় আত্রাই নদীর ওপর আত্রাই সেতু; সুজানগর উপজেলায় ধোলাইখাল সেতু এবং জেলার চাটমোহর, ফরিদপুর, ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া, সাঁথিয়া ও সুজানগর উপজেলাকে শতভাগ বিদ্যুতায়িত উপজেলা ঘোষণা।

ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন: ১৮টি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী। তা হলো- রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সিগন্যালিংসহ রেললাইন নির্মাণ; জেলা সদরে ১ হাজার আসন বিশিষ্ট অডিটরিয়াম কাম মাল্টিপারপাস হল; সুজানগর উপজেলায় কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র; আটঘরিয়া উপজেলায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন; চাটমোহর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিস ভবন; বেড়া উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিস ভবন; সুজানগর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিস ভবন; জেলা রেজিস্ট্রার অফিস ভবন; পুলিশ লাইন্স মহিলা পুলিশ ব্যারাক ভবন; সুজানগর উপজেলায় সাগরকান্দি ইউনিয়ন ও আটঘরিয়া উপজেলায় হাদল ইউনিয়ন ভূমি অফিস; পাবনা মেডিকেল কলেজে ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল; জেলা শিল্পকলা একাডেমি; সাঁথিয়া টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ; পাবনা আদর্শ মহিলা কলেজের একাডেমিক ভবন; সাঁথিয়া উপজেলায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন; বেড়া পৌরসভায় উচ্চ জলাধার ও পানি শোধনাগার নির্মাণ; সাঁথিয়া পৌরসভায় উচ্চ জলাধার নির্মাণ; ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট পাবনা জেনারেল হাসপাতালের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ।

প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে পাবনায় উৎসবের আমেজ: প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে পাবনা এখন পরিণত হয়েছে উৎসবের নগরীতে। সব জায়গায় সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করতে পুরো শহরে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। চোখে পড়ার মতো স্থাপনাগুলো রং করা হয়েছে। নতুন রূপে সাজানো হয়েছে সার্কিট হাউস, সংস্কার হচ্ছে ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট। জেলা প্রশাসন ও দলীয় নেতাকর্মীরা এ নিয়ে দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন। জেলাজুড়ে বিরাজ করছে সাজ সাজ রব।

প্রধানমন্ত্রীর পাবনা সফর সফল করতে ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসন, জেলা-উপজেলা আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠন একাধিক প্রস্তুতি সভা, সংবাদ সম্মেলন ও আনন্দ মিছিল করেছে।

প্রধানমন্ত্রীর জনসভাস্থল পুলিশ লাইন্স মাঠের সামনে নির্মাণ করা হয়েছে সুদৃশ্য গেট। সার্কিট হাউসের সামনে বেশ ক’টি তোরণসহ এর বাইরে পাবনা-ঢাকা ও পাবনা-ঈশ্বরদী মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক তোরণ নির্মাণসহ শহরকে নানাভাবে সাজানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে জেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের শুভেচ্ছা বিলবোর্ড, প্যানাফ্লাক্স পৌর শহরে বিভিন্ন স্থানে টাঙানো হয়েছে। এসব বিলবোর্ড ও প্যানাফ্লাক্সে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবিসহ স্থানীয় নেতাকর্মীদের ছবি শোভা পাচ্ছে। দিন রাত ধরে চলছে ব্যাপক মাইকিং।

পাবনা জেলা প্রশাসক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। এ লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন সমন্বয় করে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

শুক্রবার পাবনা জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, নেতাকর্মীদের পদভারে মুখরিত দলীয় কার্যালয়। পুলিশ লাইন্স মাঠে তৈরি হয়েছে বিশাল মঞ্চ। প্রধানমন্ত্রীকে স্মরণকালের বৃহৎ সংবর্ধনা দিতে প্রস্তুতি নিয়েছে পাবনা জেলা আওয়ামী লীগ। আর সবকিছু তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক প্রিন্স।

আয়োজনের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বলার অপেক্ষা রাখে না ১৪ জুলাই পাবনা পুলিশ লাইন্স ময়দান জনতার মহাসমুদ্রে পরিণত হবে। রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প, রেললাইনসহ একাধিক অধরা স্বপ্নের বাস্তবায়নে পাবনাবাসী কতটা খুশি তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব বলে তিনি জানান।

প্রধানমন্ত্রীর পাবনা ও ঈশ্বরদী আগমন উপলক্ষে সর্বত্র নিñিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পাবনা জেলাকে নিরাপত্তার আবরণে ঢেকে ফেলা হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরাপত্তা ব্যবস্থার বলয় মজবুত করতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.