আজ পহেলা ফাল্গুন

আজ পহেলা ফাল্গ–ন। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বহু চর্চিত ওই কবিতার ভাষায়, ‘ফুল ফুটুক আর না ফুটুক আজ বসন্ত’। ষড় ঋতুর পরিক্রমায় প্রকৃতিতে এসেছে ঋতুরাজ বসন্ত। সেই ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিন আজ। পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বসন্তের দূত কোকিলের মধুর কুহুকুহু ডাক, প্রকৃতির সবুজ অঙ্গন ছেয়ে যাবে রঙিন ফুলে ফুলে। মাঘের শেষ দিক থেকেই গাছে গাছে ফুটছে আমের মুকুল। বসন্তের অলৌকিক স্পর্শে জেগে উঠেছে কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, নাগলিঙ্গম। বাতাসে ভেসে আসা ফুলের গন্ধে বসন্ত জানিয়ে দিচ্ছে, সত্যি সত্যি সে ঋতুর রাজা। মন তাই গেয়ে ওঠবে ‘ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে/ ডালে ডালে ফুলে ফুলে পাতায় পাতায় রে…’।
বাঙালির জীবনে বসন্তের উপস্থিতি অনাদিকাল থেকেই। কবিতা, গান, নৃত্য আর চিত্রকলায় আছে বসন্তের বন্দনা। সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শনেও বসন্ত ঠাঁই করে নিয়েছে তার আপন মহিমায়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে আধুনিককালের বাউল কবির মনকেও বারবার দুলিয়েছে ঋতুরাজ বসন্ত। বসন্ত শুধু অশোক-পলাশ-শিমুলেই উচ্ছ্বাসের রঙ ছড়ায় না, আমাদের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শহীদদের রক্তরঙিন পুষ্পিত রক্তের স্মৃতির ওপরও রঙ ছড়ায়। বায়ান্ন সালের আট ফাল্গ–ন বা একুশের পলাশরাঙা দিনের সঙ্গে তারুণ্যের সাহসী উচ্ছ্বাস আর বাঁধভাঙা আবেগের জোয়ার যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। তপন চৌধুরীর কণ্ঠের ওই গানটা, ‘পলাশ ফুটেছে, শিমুল ফুটেছে, এসেছে দারুন মাস’। আসলেই ফাল্গ–ন এক দারুন মাসই বটে!
বাংলা পঞ্জিকা বর্ষের শেষ ঋতু বসন্তের প্রথম দিনকে আমরা পালন করি ‘পহেলা ফাল্গ–ন-বসন্ত উৎসব’ হিসেবে। এ উৎসব এখন পরিণত হয়েছে বাঙালির সার্বজনীন প্রাণের উৎসবে। বসন্তের প্রথম মুহূর্তকে ধরে রাখতে তাই তো সবাই মেতে ওঠে নানা উৎসব ও সাজে। বাসন্তি রঙের শাড়িতে বাঙালি নারীকে অপরূপ দেখায়। এতে পিছিয়ে নেই পুরুষরাও। বসন্ত অনেক ফুলের বাহারে সজ্জিত হলেও গাঁদা ফুলের রঙকেই এদিনে তাদের পোশাকে ধারণ করে তরুণ-তরুণীরা। খোঁপায় শোভা পায় গাঁদা ফুলের মালা। বসন্তের আনন্দযজ্ঞ থেকে বাদ যায় না গ্রাম্যজীবনও। আমের মুকুলের সৌরভে আর পিঠাপুলির মৌতাতে গ্রামে বসন্তের আমেজ একটু বেশিই ধরা পড়ে। বসন্তকে তারা বরণ করে আরো নিবিড়ভাবে।
বাংলায় বসন্ত উৎসব এখন প্রাণের উৎসবে পরিণত হলেও এর শুরুর একটা ঐতিহ্যময় ইতিহাস আছে, যা অনেকের অজানা। মুঘল সম্রাট আকবর প্রথম বাংলা নববর্ষ গণনা শুরু করেন ১৫৮৫ সালে। নতুন বছরকে কেন্দ্র করে ১৪টি উৎসবের প্রবর্তন করেন তিনি। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বসন্ত উৎসব। তখন অবশ্য ঋতুর নাম এবং উৎসবের ধরনটা এখনকার মতো ছিল না। কিন্তু অন্য ঋতুর চেয়ে এই ঋতুকে পালন করা হতো আলাদাভাবে। তাই পহেলা ফাল্গ–ন বা বসন্ত উৎসব কেবল উৎসবে মেতে ওঠার সময় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার গৌরবময় ঐতিহ্য, বাঙালিসত্তা। সে ঐতিহ্যের ইতিহাসকে ধরে রাখতে পারলেই বসন্ত উৎসবের সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রজš§ ছড়িয়ে দিতে পারবে বাঙালি চেতনাকে। বঙ্গাব্দ ১৪০১ সাল থেকে প্রথম ‘বসন্ত উৎসব’ উদযাপন করার রীতি চালু হয়। সেই থেকে জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদ বসন্ত উৎসব আয়োজন করে আসছে।
জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদ ২৩ বছরের ধারাবাহিকতায় এবারো বসন্তের প্রথম দিনে বসন্ত উৎসবের উদ্যোগ নিয়েছে। এ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত এবং ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চ, লক্ষ্মীবাজারের বাহাদুর শাহ পার্ক এবং উত্তরার ৩নং সেক্টরের রবীন্দ্রসরণীর উš§ুক্ত মঞ্চে বিকেল থেকে রাত সাড়ে ৮টা অবধি বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে গানের দল সমগীত বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইট স্বাক্ষরিত পরিষদের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, চারুকলার বকুল তলায় সকাল ৭টায় দীপনের গীটারের যন্ত্রসংগীতের মূর্ছনায় বসন্ত উৎসবের উদ্বোধনী পর্বের সূচনা হবে। এ ছাড়াও থাকবে শিশু-কিশোরদের পরিবেশনা আদিবাসী পরিবেশনা, বসন্তকথন পর্ব, বসন্ত শোভাযাত্রা, আবীর ও প্রীতিবন্ধনী বিনিময়, রংতুলীতে বসন্ত ও দলীয় সংগীত, দলীয় আবৃত্তি, একক সংগীত, একক আবৃত্তি।

মানবকণ্ঠ/বিএএফ

Leave a Reply

Your email address will not be published.