আগুনের ঝুঁকিতে পুরান ঢাকাবাসী

চকবাজার, নবাব কাটারা ও লালবাগসহ পুরান ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ কারখানার ওপরে বসবাস করছেন সাধারণ মানুষ। অলি-গলিতে রয়েছে নকল প্রসাধনী তৈরিসহ নানা ধরনের হাজারো কারখানা। এগুলোর প্রত্যেকটিতে মজুদ রয়েছে বৈধ-অবৈধভাবে আনা বিপুল পরিমাণ কেমিক্যাল (রাসায়নিক শক্তিশালী দাহ্য পদার্থ)। যে কারণে প্রত্যেকটি ভবন যেন এক একটি মৃত্যুকূপ। এমন আগুনের ঝুঁকিতে পুরান ঢাকার অন্তত ২৫ লাখ বাসিন্দা বসবাস করছেন বলে জান গেছে। সূত্র জানায়, নয় বছর আগে ২০১০ সালে পুরান ঢাকার নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছিলেন ১২৪ জন। সেই নিমতলী থেকে দেড় কিলোমিটারের দূরত্বে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় আগুনে ২১ ফেব্রুয়ারির রাতে একইভাবে পুড়ে শতাধিক ব্যক্তি হতাহত হন। সরকারি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতা ও স্থানীয় কিছু বাড়ির মালিকের লোভের আগুনে বারবার পুড়ে অঙ্গার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। কিন্তু কেউ যেন দেখার নেই।

চকবাজারের স্থায়ী বাসিন্দা তানভীর খোন্দকার একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। তিনি জানান, চকবাজারের প্রায় প্রতিটি গলিতে নকল প্রসাধনী তৈরির শতাধিক কারখানায় কেমিক্যালে ভরপুর। প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই এসব কেমিক্যাল আনা হয়। বেশি টাকা ভাড়া পাওয়ার আশায় অধিকাংশ বাড়ির মালিকও কারখানা ভাড়া দিচ্ছেন। অথচ নিজেরাই চরম ঝুঁকিতে বসবাস করছেন।

তানভীর বলেন, ‘আমার জানা মতে, চকবাজার, বকশিবাজার, লালবাগ, নবাব কাটারার নিমতলী, পোস্তা, বংশাল, নবাবপুর ও ইসলামবাগসহ পুরান ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় অবৈধ কেমিক্যালের প্রচুর মজুদ রয়েছে। এসব কেমিক্যাল বিস্ফোরণে যে কোন সময় হাজারো মানুষের প্রাণহানি হতে পারে। নিমতলী ও চুরিহাট্টার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড আমাদের সে বার্তায় দিল।’

বংশালের বাসিন্দা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের শিক্ষাথী মারুফ হাসান বলেন, ‘আমরা পুরান ঢাকাবাসী তো সব সময় এ ধরনের আগুনের ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছি। কারণ গোটা পুরান ঢাকায় হাজার হাজার কারখানায় টনে টনে শক্তিশালী রাসায়নিক দাহ্য পদার্থ রয়েছে। এগুলো বিস্ফোরিত হলে কী যে হবে তা কেবল ওপর আল্লাহই জানেন। তা ছাড়া এলাকাগুলোর অধিকাংশ ভবনে নেই অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা। রাস্তাঘাট অত্যন্ত সরু হওয়ায় ঝুঁকি আরো বেশি।’

এই শিক্ষার্থী জানান, ২০১০ সালের ৩ জুন রাতে নবাব কাটারার নিমতলীতে ভয়াবহ আগুনে ১২৪ জনের মৃত্যুর পর যথাযথ ব্যবস্থা নিলে চকবাজার ট্র্যাজেডি হয়তো হতো না। ওই সময় তদন্ত কমিটিগুলো নানা সুপারিশ করলেও নয় বছরে তার একটি বাস্তবায়িত হয়নি। পুরান ঢাকা কেমিক্যালমুক্ত হয়নি। মহল বিশেষের চাপের কাছে সরকার যেন নতি স্বীকার করছে।

বকশীবাজার এলাকার বাসিন্দা মারুফা আক্তার বলেন, ‘নয় বছর আগে নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর সরকারের পক্ষ থেকে যেসব উদ্যোগ নেয়ার কথা ছিল, তার কিছুই শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। আগের মতোই পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে চলছে কেমিক্যাল কারখানা ও গুদামজাতকরণ। এই এলাকার বাসিন্দারা যেন মৃত্যুর সঙ্গেই বসবাস করছেন প্রতিটি মুহূর্ত। যার সবশেষ বহিঃপ্রকাশ ঘটল চকবাজারে চুরিহাট্টার ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে।’ গত বুধবার রাতে চকবাজারের চুড়িহাট্টার সর্বনাশা আগুনের পর আবারো আলোচনায় এসেছে সেই কেমিক্যাল কারখানা ও গুদাম। সেদিন রাত সাড়ে দশটার দিকে একটি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের মাধ্যমে আগুনের সূত্রপাত বলে দাবি করা হচ্ছে। পাশেই দাহ্য পদার্থের মজুদ থাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তে। আগুনের লেলিহান শিখায় সড়কের যানজটে আটকে থাকা লোকজনসহ আশেপাশের দোকানপাট ও বসতবাড়ির বাসিন্দারা দিগবিদিক নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে থাকেন।

নারী ও শিশুসহ ৬৭ জন ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে। যদিও হাসপাতাল ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রমতে নিহতের সংখ্যা ৭৮ জন। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর চকবাজারের চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের মোড় পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। সাড়ে চারতলা হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এই ভবনের নিচতলায় ছিল মার্কেট। দোতলায় ছিল পারফিউম, অ্যারোসোল ও আফটার শেভ লোশন ক্যানের গুদাম। তিনতলার অর্ধেক ছিল বসতবাড়ি আর বাকি অর্ধেক ব্যবহৃত হতো গুদাম হিসেবে। চারতলায় থাকতেন বাড়ির মালিক। ওয়াহেদ ম্যানশনের পাশের ভবনের নিচতলার রাজমহল রেস্টুরেন্ট, দোতালায় রেস্টুরেন্ট কর্মচারীদের মেস, তিনতলায় বসতবাড়ি সব পুড়ে গেছে। ওয়াহেদ ম্যানশনের বিপরীতে দুটি ভবন ও পশ্চিম দিকের সামনের ভবনের দোকানপাট ও বসতবাড়িও ছাই হয়ে গেছে আগুনে।

জানা গেছে, নয় বছর আগে নিমতলী ট্র্যাজেডির পর পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল সরাতে একাধিক উদ্যোগ ও সুপারিশের কথা জানানো হয়েছিল সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু নয় বছরেও পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল কারখানা ও গুদাম সরেনি। উল্টো ২০১৭ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন একবার এসব অবৈধ কারখানা ও গুদামের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলেও অজানা কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়।

চকবাজার ট্র্যাজেডির পরের দিন ঢাকা দক্ষিণ সিটির (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন দাবি করেছেন, সম্প্রতি তারা আবার সেই অভিযান শুরু করেছিলেন। কিন্তু এর মধ্যেই মর্মান্তিক এই ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এই অভিযান এখন আরো জোরদারভাবে পরিচালনা করা হবে।

মানবকণ্ঠ/এআর