আগাম নির্বাচনেও প্রস্তুত বড় দুই দল

ALBD & BNPএকাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্ধারিত সময়ের আগে হলে তাতে অংশ নিতে প্রস্তুত দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নুরুল হুদা সম্প্রতি জানিয়েছিলেন, সরকার চাইলে আগাম নির্বাচনে ইসি প্রস্তুত। তার এ কথা বলার পরই দেশের দুই বৃহৎ রাজনৈতিক দলেরও প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন দলগুলোর নীতিনির্ধারকরা। তবে আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি থাকলেও এতে অংশগ্রহণে শর্ত রয়েছে বিএনপির।

দলটির এক নীতিনির্ধারক মানবকণ্ঠকে বলেছেন, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হলে যে কোনো সময় বিএনপিরও নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি রয়েছে।

উল্লেখ্য, গত বুধবার সিইসির সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত রেনসিয়ে টিয়েরিংক বৈঠক করেন। ওই বৈঠক শেষে সিইসি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, সরকার চাইলে আগাম নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রস্তুত রয়েছে। নির্বাচন কমিশন আগাম নির্বাচনের জন্য কতটুকু প্রস্তুত সে সম্পর্কে জানতে চাইলে সিইসি বলেন, সেটা করা যাবে। নির্বাচনের জন্য তো ৯০ দিন সময় থাকে। এটা তো সরকারের ওপর নির্ভর করে আগাম নির্বাচনের বিষয়টা। তারা যদি আগাম নির্বাচনের জন্য বলে, তখন আমরা পারব। সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে আমাদের কোনো আপস নেই।

২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে টানা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। এরপর থেকেই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে ক্ষমতার ধারাবাহিকতার গুরুত্ব দিয়েছে দলটি। শুরু করেছে নির্বাচনী প্রস্তুতিও। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নীতিনির্ধারণী মহল থেকে তৃণমূলসহ সহযোগী সংগঠনগুলোকে দেয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা। সে অনুযায়ী কাজও শুরু হয়েছে অনেক আগেই। দলীয় প্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি জেলা সফর করেছেন। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মী সম্মেলন করে অভ্যান্তরীণ বিভেদ মিটিয়ে ঐক্যবদ্ধ করছেন নেতাকর্মীদের।

আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, আগাম নির্বাচন নিয়ে দলীয় ফোরামে এখনো কোনো ধরনের আলোচনা হয়নি। কিন্তু যে কোনো সময় নির্বাচন হলে দল যেন শক্তিশালী অবস্থানে থেকে অংশ নিতে পারে সে জন্য সব প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। এ জন্যই চলতি বছরের শুরু থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী কাজ শুরু করা হয়েছে। এখনো সেই প্রস্তুতি রয়েছে দলটির।

গত শুক্রবার আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক যৌথসভা শেষে সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ প্রসঙ্গে বলেছেন, নির্বাচন প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার, তিনি তো বলেন নাই কবে নির্বাচন হবে। আমরা ধরে রাখছি সংবিধান অনুযায়ী আগামী বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন হবে। কিন্তু এখন যদি প্রধানমন্ত্রী মনে করেন তিনি আগাম নির্বাচন দেবেন, সেটা তার এখতিয়ার। এটা নিয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো কথা হয় নাই। নির্বাচনের জন্য আমরা সবসময়ই প্রস্তুত আছি, নির্বাচন যদি আগামী মাসেও হয় আওয়ামী লীগ প্রস্তুত। তিনি বলেন, আমরা তো প্রস্তুতি নেব আগামী মাসে নির্বাচন হলে কীভাবে জিততে পারি। যদি নির্বাচন আগামী দুই তিন মাসের মধ্যে হয়, তাহলে আমাদের সাংগঠনিক প্রস্তুতি থাকবে না?

জানা গেছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দুই ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে ক্ষমতাসীনরা। তা হলো- এক আগাম নির্বাচন আর দুই নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন। আওয়ামী লীগ নেতাদের মতে, আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচন চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। এ জন্য দফায় দফায় অভ্যন্তরীণ জরিপ চালানো হচ্ছে। এ ছাড়া সরকারের জনপ্রিয়তা আর নিজ নিজ এলাকায় এমপিদের ভাবমূর্তি কী, এসবও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তা ছাড়া বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে অনেকটা ভঙ্গুর ভাবলে তাদের জনপ্রিয়তা নিয়ে দ্বিমত নেই আওয়ামী লীগ নেতাদেরও। তাই নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন হলে বিএনপি সুসংগঠিত হওয়ারও যথেষ্ট সময় পেয়ে যাবে বলেও মনে করছেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহল। এ বিষয়টি মাথাই রেখেই নির্বাচনের প্রস্তুতি সেরে রাখছে ক্ষমতাসীনরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের এক সাংগঠনিক সম্পাদক মানবকণ্ঠকে বলেন, আওয়ামী লীগ সব সময়ই নির্বাচনমুখি দল। আমরা নির্বাচনের মাধ্যমেই ক্ষমতার পালাবদলে বিশ্বাস করি। তাই আমাদের সব সময়ই নির্বাচনী প্রস্তুতি থাকে। আগাম নির্বাচন হলেও আমাদের কোনো সমস্যা হবে না। তা ছাড়া বর্তমানে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা বিএনপির চেয়ে বেশি। এ বিষয়গুলো আমাদের মাথায় আছে।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য পীযুষ কান্তি ভট্টাচার্য্য মানবকণ্ঠকে বলেন, আমাদের দলীয় ফোরামে এখনো আগাম নির্বাচনের বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। আমাদের নেত্রীও (আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) এ বিষয়ে কোনো কথা বলেননি। তবে আগাম নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের কোনো অসুবিধা নেই। আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে নির্বাচনের জন্য সব সময়াই প্রস্তুত।

সিইসির বক্তব্যের প্রেক্ষিতে জানতে চাইলে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ মানবকণ্ঠকে জানান, আগাম কেন যে কোনো সময় নির্বাচন অনুষ্ঠানে তার দলের প্রস্তুতি রয়েছে তাতে অংশ নেয়ার। তবে তিনি জানান, বরাবরের মতোই নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বিএনপির রয়েছে শর্ত। নির্বাচন অবশ্যই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে হবে। যে কোনো সময় নির্বাচন দিলে, আমরা সেই নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করব একটা সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ পরিবেশে। এ জন্য তিনি দল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, মেয়াদ শেষে অথবা আগাম যখনই হোক সংসদ ভেঙে দল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে দিলে বিএনপি তাতে অংশ নেবে। তবে তিনি মনে করেন, সরকার আগাম নির্বাচন দেবে না। তারা (সরকার) একেবারে শেষ সময় পর্যন্ত যাবে।

বিএনপির শীর্ষ মহলের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, নির্বাচনের অংশ নেয়ার প্রস্তুতি হিসেবে সম্ভাব্য একটি প্রার্থী তালিকা প্রস্তুত করছে বিএনপি। দলনিরপেক্ষ সরকার ছাড়া কোনো নির্বাচন নয়- আপাতত দলীয় অবস্থান এমন হলেও ইতোমধ্যে প্রত্যেক আসনের বিপরীতে ৩ জন করে প্রাথী বাছাই কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়েও নিচ্ছে দলটি। সারাদেশের ৩০০ আসনের পৃথক তিনটি জরিপ কাজ ইতোমধ্যে শেষ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তিনটি জরিপের পৃথক তালিকায় ওঠে আসা প্রথম ৩ ব্যক্তির নাম নিয়ে ৩শ’ আসনের বিপরীতে মোট ৯শ’ জনের সম্ভাব্য একটি প্রার্থী তালিকা প্রণয়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে চলছে তালিকায় ওঠে আসা একেবারে নতুন ব্যক্তিদের ‘জীবনবৃত্তান্ত’ সংগ্রহের কাজ। খালেদা জিয়ার তরফে জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহের কাজটি করছেন সেনাবাহিনীর এক সাবেক কর্মকর্তা- যিনি আবার দলের পোর্টফোলিওতে নেই বা দলের কোনো কাজের সঙ্গে সরাসরি জড়িতও নন বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার বাসায় মানবকণ্ঠের প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছিলেন, নির্বাচনে পরিবেশ থাকলে বিএনপি নির্বাচনের সদা প্রস্তুত। ৩শ’ আসনের জন্য আমাদের ৯শ’ প্রার্থী বাছাই করা রয়েছে।

আসনভিত্তিক জরিপের বিষয়ে জানতে চাইলে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান মানবকণ্ঠকে বলেন, বিএনপি একটি নির্বাচনমুখি দল। সেদিক থেকে যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণের পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তাহলে যে কোনো মুহূর্তে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিতে প্রস্তুত। সেই প্রস্তুতি বিএনপি নিয়েই রেখেছে।

সম্প্রতি ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা এক বৈঠকে শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন নয়- এমন একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ ছাড়া বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে ১২ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশেও শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন নয়- এমন বক্তব্য দিয়েছেন খালেদা জিয়া। আবার একই সমাবেশে আগামী নির্বাচনে জয়ী হলে কী কী করবেন তাও তিনি উল্লেখ করেছেন। এমনকি সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের ব্যাপারেও তিনি তার বক্তৃতায় ইতিবাচক কথা বলেছেন। এ থেকে অনেকেই মনে করছেন, বিএনপি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে। যে কোনো সময় নির্বাচন হলে যেন বিএনপি তাতে অংশ নিতে পারে এবং দলটির প্রতি ভোটারদের ও সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের একটি ‘সুনজর’ থাকে সে কারণেই খালেদা জিয়া তার বক্তৃতায় তাদের ‘অভয়’ দিয়েছেন।

খালেদা জিয়া তার বক্তৃতায় বিএনপি ক্ষমতায় গেলে জনগণ কী পাবে সে প্রসঙ্গে বলেন, আমরা ক্ষমতায় গেলে সারাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। ঘরে ঘরে চাকরি দেয়া হবে। এক বছর বেকার থাকলে বেকার ভাতা দেয়া হবে। শিক্ষিত যুবকদের চাকরির নিশ্চয়তা দেয়া হবে। নারী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। সব শিক্ষা অবৈতনিক করা হবে। স্বাস্থ্যবিমা চালু করা হবে। কৃষকদের জন্য সার-ওষুধ সুলভ করা হবে। ন্যায্য দরে কৃষিপণ্য কিনে নেয়া হবে। দরিদ্র ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কৃষি ঋণ মওকুফ করা হবে। গ্রামে কর্মসংস্থান করা হবে, যাতে গ্রামের মানুষকে শহরে আসতে না হয়। গ্রামের মানুষ গ্রামে থেকেই গ্রামের উন্নয়ন করবে। কৃষি উৎপাদন বাড়ানো হবে। যদিও এ বছরের প্রথমার্ধেই এমন একটি ‘ভিশন ২০৩০’ ঘোষণা করেছিলেন খালেদা জিয়া।

মানবকণ্ঠ/আরএ