আগামী নির্বাচনে লড়বেন ৫০ সাবেক আমলা

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনেক সাবেক আমলা প্রার্থী হচ্ছেন। তারা ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মনোনয়নে নির্বাচনী মাঠে লড়বেন। নির্বাচনী প্রস্তুতির মহড়া নিজের আসন ও বিভিন্ন দলের কেন্দ্রে চালাচ্ছেন মনোনয়ন প্রত্যাশী আমলারা। তবে বছর দুয়েক আগে অবসর নেয়া ও অবসর ঘনিয়ে আসা কিছু কর্মকর্তা আরপিও সংশোধনের আশায় বুক বেঁধে আছেন। তারা এ ব্যাপারে নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখছেন।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন জাতীয় সংসদের ১১তম সাধারণ নির্বাচনে বিভিন্ন দল থেকে কমপক্ষে ৫০ সাবেক আমলা প্রার্থী হচ্ছেন। এজন্য তারা নিজ সংসদীয় আসন থেকে বিভিন্ন দলের হয়ে নির্বাচনী প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে এই সংখ্যা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে বেশি। তবে আরপিও সংশোধনের ব্যাপারে কিছু আমলা নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছেন। একদিকে প্রার্থী জট ও জোট সমীকরণে নতুন করে আরপিও সংশোধনের ওপর গুরুত্ব নেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের।

নির্বাচন কমিশনের বিদ্যমান ‘দ্য রিপ্রেজেনটেশন অব পিপলস অর্ডার’ বা গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর ৩ বছর অতিবাহিত না হলে কেউ কোনো নির্বাচনে অংশ নেয়ার যোগ্য হবেন না। কাজেই আরপিও অনুযায়ী, সরকারি চাকরি থেকে কমপক্ষে ৩ বছর আগে অবসর নিয়েছেন, এমন আমলারাই এ বছরের নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। সদ্য অবসরে যাওয়া কিছু প্রভাবশালী সচিব এ ধারার সংশোধন চান। তারা সময়ের (৩ বছরের) বাধ্যবাধকতার ধারাটি বিলুপ্তি চান। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের যেসব আসনে এমপির ব্যাপক নেতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে ওইসব আসনে সাবেক আমলারা প্রার্থী হতে চান। যাতে নির্বাচনে প্রচারণার কৌশলে আওয়ামী লীগ এগিয়ে থাকে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সাবেক আমলাদের মধ্যে যারা এবার সংসদ নির্বাচন করবেন তারা হলেন- বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিন আহমেদ, আমলা না হলেও জাতিসংঘের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি এএমএ মোমেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন, সাবেক সচিব ও বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মনজুর হোসেন, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নূর মোহাম্মদ, সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান, সাবেক সচিব ও নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত, সাবেক কেবিনেট সচিব আবদুল হালিম, সাবেক সচিব হুমায়ুন কবীর, দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক কমিশনার শাহাবুদ্দিন চুপ্পু, সাবেক সচিব সুজা উদ দৌলা এবং সাবেক সচিব এনএম নিয়াজ উদ্দিন মিয়ার নাম উল্লেখযোগ্য। নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে এই তালিকা আরো লম্বা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন সংশিষ্টরা।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাস উদ্দিন আহমেদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। সৎ, দক্ষ ও নিষ্ঠাবান হিসেবে পরিচিত ড. ফরাস উদ্দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও আস্থাভাজন। তার ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী চান তিনি তার নির্বাচনী এলাকা হবিগঞ্জের একটি আসন থেকে নির্বাচন করুন। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ড. ফরাস উদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, সময় হলে জানতে পারবেন।

বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের ছোট ভাই এএমএ মোমেন। সরাসরি আমলা নন তিনি, জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সৌদি আরবের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাও করেছেন একসময়। আসন্ন সংসদ নির্বাচনে বর্তমান এমপি অর্থমন্ত্রীর আসন (সিলেট-১) থেকে নির্বাচন করতে আগ্রহী তিনি। ইতিমধ্যে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, তিনি এবার নির্বাচনে অংশ নেবেন না। তার আসন থেকেই যেন এএমএ মোমেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পান, সেজন্য চেষ্টা করবেন তিনি। এজন্য ইতিমধ্যেই এলাকায় জনসংযোগ শুরু করেছেন মোমেন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন একসময় ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব। তিনি তার জন্মস্থান চাঁদপুরের কচুয়া আসন থেকে নির্বাচন করতে চান। ইতিমধ্যেই তিনি নিজ এলাকায় স্কুল-কলেজসহ নানা ধরনের উন্নয়ন ও সমাজসেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচনে আগ্রহী।

এ ব্যপারে গোলাম হোসেন বলেন, ‘আমি নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করতে চাচ্ছি। সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর থেকেই এলাকায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দিলে এলাকার সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করে বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারব।
পুলিশের সাবেক আইজি নূর মোহাম্মদ আওয়ামী লীগের টিকিটে নিজ এলাকা কিশোরঞ্জ থেকে প্রার্থী হতে চান। সে লক্ষ্যে এলাকায় প্রচারণা চালাচ্ছেন।

সম্প্রতি শোডাউনও করছেন। বর্তমান জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম চিকিৎসার জন্য বর্তমানে ব্যাংককে অবস্থান করছেন। সুস্থ হয়ে দেশে ফেরার পর তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কতটা যুক্ত হতে পারবেন, তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। তিনি না করলে এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চান সাবেক আইজিপি।

সাবেক স্থানীয় সরকার সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মনজুর হোসেন। তিনি নিজ জেলা ফরিদপুরের একটি আসন থেকে নির্বাচন করতে আগ্রহী। তিনিও আওয়ামী লীগ থেকে নৌকা মার্কার প্রার্থী হতে চান। মনজুর হোসেন জানান, আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিলে জয়ী হব। সরকারি চাকরির সময় থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়ে আছি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত কুমিল্লার চান্দিনা আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চান। ইতিমধ্যেই নিজ এলাকায় জনসংযোগ শুরু করেছেন তিনি। দীর্ঘ চাকরি জীবনে একজন চিকিৎসক হিসেবে এলাকার বহু মানুষের চিকিৎসাসেবা দেয়া ছাড়াও বিভিন্ন জনহিতকর কাজের সঙ্গে যুক্ত তিনি। এমনকি বিরোধী রাজনৈতিক দলের অনেক নেতাকর্মীও তার রোগী, যারা তাকে সমর্থন দেবে বলে আশাবাদী স্বনামখ্যাত এই চিকিৎক।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক কমিশনার শাহাবুদ্দিন চুপ্পু টাঙ্গাইলের একটি আসন থেকে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে আগ্রহী বলে জানা গেছে। তিনি কিছু সময়ের জন্য দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

একইভাবে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন সিলেটের একটি আসন থেকে, সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান রংপুর থেকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে আগ্রহী বলে জানা গেছে। ছহুল হোসাইন নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালনের আগে সরকারের সচিব ছিলেন।

বরগুনা-আমতলী আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে আগ্রহী সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহমুদুর রহমান। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক ছিলেন। তার বাবা মরহুম মজিবর রহমান তালুকদার আমতলী আসনের এমপি ছিলেন। অসম্ভব জনপ্রিয় এ নেতা (মজিবর রহমান) এলাকায় সৎ রাজনীতির দৃষ্টান্ত রেখেছেন।

বিএনপি থেকে মনোনয়ন চান সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সাবেক কেবিনেট সচিব আবদুল হালিম। তার নির্বাচনী এলাকা জামালপুর। তিনি সেখানে ধানের শীষের প্রার্থী হতে চান। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আবদুল হালিম বলেন, ‘এলাকার মানুষের সঙ্গে আছি। দলের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজেকে জড়িত রেখেছি। বিএনপির মনোনয়ন পেলে বিজয়ী হব ইনশাআল্লাহ।’

সাবেক সচিব সুজা উদ দৌলা, হুমায়ুন কবীর, এনএম নিয়াজউদ্দিন মিয়াও আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে ইচ্ছুক। এর মধ্যে সাবেক সচিব এমএম নিয়াজ উদ্দিন গাজীপুরের যে কোনো একটি আসন থেকে নির্বাচন করতে আগ্রহী। এজন্য তিনি আনুষ্ঠানিক জাতীয় পার্টিতে যোগদান করেছেন।

সাবেক আমলারা মনোনয়ন পেতে নিজ নিজ আসনে কাজ করছেন। তারা এলাকায় বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের প্রার্থিতা ঘোষণা করছেন কৌশলে। কেউ কেউ আওয়াজ দিয়েই জনসংযোগ করছেন। কেউ কেউ মসজিদ-মাদরাসায় দান-খয়রাত করছেন। নিয়মিত এলাকায় যাচ্ছেন। কেউ কেউ নিজে থেকে নিজের প্রার্থিতা ঘোষণা করছেন। আবার কেউবা দলের হাইকমান্ডের নির্দেশেই এলাকায় যোগাযোগ করছেন। ক্ষমতাসীন দলের যেসব আসনে প্রার্থীদের ভাবমূর্তি সংকটে সেসব ক্ষেত্রে সাবেক আমলারা মনোনয়ন পেতে পারেন এমন আভাস দলীয় সূত্রে পাওয়া গেছে।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ