আগামী নির্বাচনে জয়লাভে ‘আত্মবিশ্বাসী’ বিএনপিও

জনগণের ভোট দেয়ার পরিবেশ থাকলে আগামী একাদশ নির্বাচনে জয়লাভের ব্যাপারে ‘আত্মবিশাসী’ বিএনপি। একাদশ নির্বাচনে জয়লাভ করে টানা তৃতীয় মেয়াদের সরকার গঠন করে রেকর্ড গড়ার যে আশা ক্ষমতাসীনরা করছেন তা একেবারেই নাকচ করে দিয়েছেন দলটির নেতারা। ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের আশাবাদের পাল্টা হিসেবেই তারা বলছেন, জনগণ ভোট দেয়ার পরিবেশ পেলে আওয়ামী লীগের আর জয়লাভের কোনো সম্ভাবনা নেই। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হলে তাদের জয়লাভের আশা মিইয়ে যাবে। তাদের ক্ষমতায় থাকার ‘আশাবাদ’ আশা হিসেবেই থাকবে। এ রকম আশা তারা করতেই পারেন। তবে সেই আশা আর বাস্তবায়ন হবে না।

বিএনপি নেতারা মানবকণ্ঠকে বলেন, একটি নিরপেক্ষধর্মী সরকারের অধীনে একাদশ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে কোনোভাবেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটকে আর ক্ষমতায় থাকার সুযোগ দেবে না জনগণ। দলটির কাছে যে জরিপ আছে, তাতে দেখা যায় আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০টির বেশি আসন পায় না। তারা মনে করেন, আগামী নির্বাচনে জয়লাভের হাওয়া এখন ধানের শীষের অনুকূলে বইছে। ‘অন্যথা’ না হলে কোনোভাবেই এই জোয়ারকে ভিন্নপথে নেয়া যাবে না।

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার রাতে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল প্যারিস লা গ্রান্ডে আওয়ামী লীগের ফ্রান্স শাখা আয়োজিত প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচনে দলের জয়লাভের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, আমরা আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করব, কারণ জনগণ আমাদের পক্ষে। জনগণ আমাদের ভোট দিতে প্রস্তুত। তাই আমাদের সাবধান থাকতে হবে, যাতে কেউ নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র করতে না পারে।

এর একদিন আগে সোমবার আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর পুত্র ও তার তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ও একাদশ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের চেয়েও আরো বড় বিজয় পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন। দলের নেতাদের তিনি বলেছেন, একটা সুখবর দিতে আজকে আমি আপনাদের সঙ্গে বসেছি। সুখবর হলো- আমার জরিপে আগামী নির্বাচনে ভালো রেজাল্ট আমরা পাব। ২০০৮ সালের চেয়ে বিপুল ও বেশি ভোট পাব। দেশের মানুষের বিশ্বাস ও সমর্থন আমাদের প্রতি চলে এসেছে। তিনি বলেন, আমি একটি জরিপ করেছি। তাতে এই ফল পাওয়া গেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ‘বিজ্ঞানসম্মত’ জরিপে এ বিষয়টি উঠে এসেছে। ভোটের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে হারানোর মতো কোনো দল বাংলাদেশে নেই।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও সম্প্রতি বলেছেন, বিএনপি নেতাদের বক্তব্য শুধু সংবাদ সম্মেলনে সীমাবদ্ধ। দলীয় কর্মসূচি নেতাকর্মীদের কোন্দলে পণ্ড হয়। জনগণ বিএনপির কাছে কিছুই প্রত্যাশা করে না। তাই আগামীতেও তাদের প্রত্যাখ্যান করবে।

এ ব্যাপারে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মানবকণ্ঠকে বলেন, যদি একটা সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচন হয়, যদি তারা সরকার থেকে সরে দাঁড়ায়, যদি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দেয় তাহলে জনগণই প্রমাণ করবে তারা কাকে চায়। জনগণ যে রায় দেবে তা আমরা মাথা পেতে নেব।

তিনি মনে করেন, আগামীতে আবারো এক টার্ম থাকার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের আশাবাদকে আশা হিসেবেই দেখতে চায় বিএনপি। তবে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতোই একটি ‘নামকাওয়াস্তে নির্বাচনের মাধ্যমে জোর করে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার’ জন্য কোনো কারসাজিকে মেনে নেবে না জনগণ।

এ ব্যাপারে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান মানবকণ্ঠকে বলেন, শেখ হাসিনা তার বক্তৃতার মাধ্যমে দলীয় নেতাকর্মীদের একটি ‘স্বপ্ন’ দেখিয়েছেন। দলের নেত্রী হিসেবে এটা করতেই পারেন তিনি।

তবে তিনি এও বলেন, আওয়ামী লীগ যদি মনে করে ‘উন্নয়নের ধারা’ বজায় রাখতে জোরজবরদস্তি করে আরো এক টার্ম ক্ষমতায় থাকবে, তাহলে তিনি এটা এভাবে বলতে পারেন না। এটা গণতন্ত্র নয়।

সাবেক এই সেনাপ্রধান বলেন, আমরা আশা করছি, আগামী নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করবে। সেই লক্ষ্যে আমরা কাজও করে যাচ্ছি।

বিএনপি মনে করে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্ষমতায় মানুষ পরিবর্তন চায়। এই সরকার মানুষের জীবনকে দুঃসহ ও অসহনীয় করে তুলেছে। তাদের সরিয়ে দেশের মানুষ অতীতে যারা আস্থা অর্জন করেছিল সেই বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে দেখতে চায়। দেখতে চায় খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। এ অবস্থায় বিএনপি নেতাকর্মীরা মানুষের কাছে গেলেই সাড়া মিলবে উল্লেখ করে দলের নেতারা মানবকণ্ঠকে বলেন, এ জন্য দলের নেতাকর্মীদের আন্তরিকতার সঙ্গে পাড়ায়-মহল্লায় দলের আদর্শ নিয়ে প্রচারণায় ছড়িয়ে পড়তে হবে।

বিএনপি মনে করে, আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন তাদের অবস্থান ভালো। দলটি বেশ কিছুদিন আগে দলীয় নেতাকর্মীদের মাধ্যমে একটি মাঠ জরিপ চালিয়েছিল। সেই জরিপে দেখা গেছে যে, বিএনপির অবস্থান আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো। আওয়ামী লীগের অবস্থান একেবারেই নিম্নগামী।

এ প্রেক্ষিতেই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল সম্প্রতি ঢাকেশ্বরী মন্দিরে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের এক আলোচনা সভায় বলেছিলেন, ‘নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ৩০টির বেশি আসন পাবে না।’

তিনি এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, ব্যাপারটা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের পায়ের তলায় মাটি নেই। তারা পুরোপুরিভাবে গণবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তারা খুব ভালো করে জানে, যদি সহায়ক সরকার বা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে ক্ষমতাসীনরা নির্বাচন দেয়, তাহলে তারা (আওয়ামী লীগ) ৩০টির বেশি আসন পাবে না।

ওই জরিপের প্রেক্ষিতে আগামী নির্বাচনে জয়লাভের লক্ষ্যে পুরোদমে নির্বাচনমুখী বিএনপি। তারা ইতোমধ্যে তিনটি জরিপ সম্পন্ন করে রেখেছে। জরিপগুলোর ভিত্তিতে প্রত্যেকটি আসনের বিপরীতে ৩ জন সম্ভাব্য প্রার্থী ধরে ৯শ’ প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শুরু করেছে। জনগণের বিপদের সময় তাদের পাশে থেকে কাজ করার জন্য কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে এক চিঠির মাধ্যমে দলীয় নেতাকর্মীদের জানিয়ে দিতে জেলা কমিটিগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে দলের নেতারা জানিয়েছেন, নির্বাচনকে সুষ্ঠু করতে যা যা করার তাই করবে দলটি। তারা বলেন, নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠনে বিএনপি ১৩ দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিল। ভিশন-২০৩০ দেয়া হয়েছে। ইসির সংলাপেরও অংশ নিয়েছে। সেখানে তারা দলনিরপেক্ষ সরকারের দাবি উত্থাপন করেছে। এ ছাড়া দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাবে না বিএনপি- তা খালেদা জিয়া ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছেন। নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেয়া, নির্বাচনে বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার না করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া আগামী নির্বাচন নিয়ে সব দলের সঙ্গে সরকারের সংলাপ অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ইসিকে উদ্যোগ নেয়ার প্রস্তুাবও দিয়েছে বিএনপি, যদিও নির্বাচন পরিচালনাকারী এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি এ নিয়ে কোনো উদ্যোগ নেবে না বলেও জানিয়ে দিয়েছেন এর প্রধান কে এম নুরুল হুদা।

এ ব্যাপারে দলটির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু মানবকণ্ঠকে বলেন, বিএনপি ও ২০ দলীয় জোট নির্বাচন করতে চায়, তবে শেখ হাসিনার অধীনে নয়। তার অধীনে কী রকম নির্বাচন হতে পারে তা ৫ জানুয়ারি জাতি দেখেছে। তার অধীনে যে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে তিনি নিজেই বিশ্বাস করেন না।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় খুব বেশি দিন নেই। অনতিবিলম্বে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য, সব দল যাতে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে তার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করুন। অন্যথায় বিএনপি আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

মানবকণ্ঠ/বিএএফ