আগস্ট আমাকে শঙ্কিত করে

আগস্ট আমাকে শঙ্কিত করে

আগস্ট শোকের মাস। আগস্ট কাঁন্নার মাস। আগস্ট শঙ্কার মাস। আগস্ট আমাকে শঙ্কিত করে তোলে। ১৫ আগস্ট যত এগিয়ে আসে, আমার শঙ্কা, ভয় আরো বাড়ে। মধ্য আগস্টে ইতিহাসের সেই ঘৃণিত লোক নিন্দিত ও চক্রান্তকারী শিবিরের কুৎসিত হিংস্র হত্যাকাণ্ডের কথা, যেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের (দুই কন্যা বাদে) নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল-সেই দিনটি পেরিয়ে গেলেও শোক কাটে না। শঙ্কা কাটে না। কারণ এই আগস্টেই লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন মাতৃভূমি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের বুকে কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছিল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নিষ্পৃষ্ট করে বঙ্গবন্ধুর দেয়া আদর্শিক সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নকে নস্যাৎ করার চক্রান্তের সূচনা হয়েছিল। এরপর থেকে নানা ঘাত-প্রতিঘাত, উত্থান-পতনের মধ্যদিয়ে আমরা স্বাধীনতার চার দশক পার করেছি।

স্বাধীনতার কাণ্ডারি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতায় বসতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশে নানা রূপে সামরিক শাসন-আমাদেরকে ক্রমাগত পেছনের দিকে ঠেলেছে। দেশের সাধারণ মানুষ, যেসব দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু তাদের মুখে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে ছিল সামরিক বিশ্বাসঘাতক কর্মকর্তাদের সহায়তায় খন্দকার মোশতাক আহমেদের প্রতিহিংসা পরায়ণতার চিহ্ন, গভীর ঘা। যার সুযোগ গ্রহণ করে জেনারেল জিয়া এবং এরশাদ। ধীরে ধীরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে মৌলবাদী সাম্প্র্রদায়িক অপশক্তির হাতে ক্রমশ সপে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ ক্ষমতাসীনরা যুদ্ধাপরাধী জামায়াত ও তাদের দোসরদের কাছে আত্মবিসর্জন দিয়ে রাজনীতিকে কলঙ্কিত করছে তো বটেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সাধকে পর্যন্ত নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার নানা অপকৌশলও এঁকেছে।

ঘাতকরা বারবার তাদের নিষ্ঠুরতার টার্গেট হিসেবে আগস্টকেই বেছে নিয়েছে। ১৯৭৫ সালের আগস্টে আমরা হারিয়েছি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, তেমনি ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড ছুড়ে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। ভাগ্যক্রমে সেদিন তিনি বেঁচে গেলেও এই ঘটনায় সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের সহধর্মিনী, আওয়ামী লীগের তৎকালীন মহিলাবিষয়ক সম্পাদিকা আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত এবং পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছিলেন। যারা এখনো সেদিনের ভয়াবহ নৃশংসতার ক্ষত শরীরে বয়ে নিয়ে চলেছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে আসলে মুছে ফেলার অপচেষ্টা করা হয়েছিল আমাদের স্বাধীনতার চেতনা। যার ধারাবাহিকতা ছিল ২০০৪ সালের আগস্টেও। কিন্তু তাদের সেই অপচেষ্টা সফল হয়নি। ১৯৭৫-এ আমরা বঙ্গবন্ধুকে হারিয়েছি, ঘাতকরা তাকে হত্যা করেছে- কিন্তু তার আদর্শকে হত্যা করতে পারেনি। ঘাতকের দল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরদিন ১৯৭৫ সালের টাইমস অব লন্ডন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ‘সবকিছু সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে সবসময় স্মরণ করা হবে। কারণ তাকে ছাড়া বাংলাদেশের বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নেই।’ আর লন্ডন থেকে প্রকাশিত সেদিনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় বলা হয়েছিল, ‘বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ শেখ মুজিবের জঘন্য হত্যাকাণ্ডকে অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করবে।’

ইতিহাসের দাবি মিটিয়েছে বাংলার মানুষ। তারা বঙ্গবন্ধুকে ভুলে যায়নি, তার আদর্শ থেকে সরে আসেনি। কিন্তু সেই আদর্শকে ধরে রাখার জন্য প্রয়োজন বঙ্গবন্ধুর সোনার মানুষ। সেই মানুষ গড়ে তোলার দায়িত্ব নিতে হবে আমাদেরই। সাম্প্রদায়িকতা এবং জঙ্গিবাদের নামে যে বিষবাষ্প আমাদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা বিভিন্ন সময়ে চলেছে, তা প্রতিহত করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলন। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যে প্রবল গণবিক্ষোভ তাকে স্মরণে রেখে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেøাগান ধর্ম নিরপেক্ষতার বাংলাদেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। আর এই উদ্যোগ গ্রহণের পথে যদি আমরা পিছিয়ে পড়ি, ব্যর্থতার ভার যদি আমাদের কাঁধে চেপে বসে, তাহলে আমাদের সামনে দুঃসময় অপেক্ষা করছে বলেই মনে করি। আজ শুধু বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করে নয় বরং তার স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আমাদেরকে তার আদর্শ, তার দেখানো পথেও হাঁটতে হবে। অন্যথায় দেশও কল্যাণের পথে এগুতে পারবে না। আর এক্ষেত্রে দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে অসাম্প্রদায়িকতাকেই সামনে তুলে ধরতে হবে।

আগস্ট মাস মানেই শোকের মাস। স্মৃতিকাতরতার মাস। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা আলোচনা করতে গেলে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। তাই সেটা পরিহার করে একবারেই যদি বলি তাহলে বলতে হবে বঙ্গবন্ধু একটি রাজনৈতিক আদর্শের প্রণেতা হলেও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হলেও নেতাদের সঙ্গে তার যে স্নেহ ও শ্রদ্ধাবোধ দেখেছি তা অবিস্মরণীয়। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ পাকিস্তানি প্রশাসনও যাকে ভয় পেত এবং দেখেছি প্রতিটা মানুষ তাকে শ্রদ্ধা করত একজন মহৎ ব্যক্তিত্ব হিসেবে।

সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে থাকাকালে ’৭০-এর দশকে দেখেছি তার মহানুভবতা এবং বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত। সে কারণেই এমন একটি মহান পুরুষের সামনে আমরা সাংবাদিকরা যে কোনো দাবি নিয়ে তার কাছে যে কোনো সময় উপস্থিত হতে পারতাম।

আজ আগস্ট মাসের শেষে এসে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করতে গিয়ে এবং শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে একটি প্রশ্ন মনের ভেতরে জেগে ওঠে, আজ আমরা কি পারি কারো সামনে উপস্থিত হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের দাবি ও অধিকারের কথা বলতে? যেটা বঙ্গবন্ধুর কাছে সব সময় সম্ভব ছিল। আজ কি এমন কোনো নেতা আছেন, যিনি একইসঙ্গে ভালোবেসে বুকে টেনে নিতে পারেন, আবার ভুলের জন্য শাসনও করতে পারেন? এই মহান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধর্মনিরপেক্ষতা সমাজতন্ত্রের প্রতি আমরা যদি নিরবচ্ছিন্নভাবে যুক্ত থাকি তাহলেই বঙ্গবন্ধুর প্রতি সম্মান দেখানো হবে।
– লেখক: সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সাংবাদিক

মানবকণ্ঠ/এসএস