আওয়ামী লীগ-বিএনপি কেউ হারতে চায় না

বরিশাল-৪ (মেহেন্দীগঞ্জ-হিজলা) আসনটি বেশিরভাগ সময় বিএনপির দখলে ছিল। এ কারণে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে আসনটি দাবি করে আসছে স্থানীয় নেতাকর্মীরা। তবে আওয়ামী লীগের দাবি ঘাঁটি বলতে কিছুই নেই। এ আসনে সর্বশেষ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেয়ায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী পংকজ দেবনাথ ডামি প্রার্থী বিএনএফের আঞ্জুমানআরাকে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন। এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীর ছড়াছড়ি। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান এমপি কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথ, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ড. শাম্মি আহমেদ, বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আইনজীবী আফজালুল করিম, বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহাব আহমেদ, মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মেজর (অব.) মহসিন সিকদার। বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক এমপি মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাজিব আহসান।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মরহুম মহিউদ্দিন আহমেদ বিএনপি প্রার্থী খন্দকার মাজাহারুল ইসলাম ফারুককে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে মহিউদ্দিনকে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন শাহ মো. আবুল হোসেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী আবুল হোসেন পুনরায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী মেজর (অব.) মহসিন সিকদারকে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন। ওই বছর বিএনপি সরকার গঠন করে। আবুল হোসেনকে অর্থ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সংস্কারপন্থিদের সঙ্গে হাত মেলান আবুল হোসেন। এ কারণে দল থেকে ছিটকে পড়েন। এরপর আবুল হোসেনকে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে দেখা যায়নি।

২০০৭ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন দেয়া হয় মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদকে। মেজবাহ আওয়ামী লীগ প্রার্থী সাবেক এমপি ও বর্তমান বরিশাল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মইদুল ইসলামকে পরাজিত করেন। ওই নির্বাচনে ৩শ’ আসনের মধ্যে মাত্র ২৮টি আসনে জয়লাভ করে বিএনপি। এর মধ্যে বরিশালের ছয় জেলায় ২১ আসনের মধ্যে বরিশাল সদর আসনে মজিবর রহমান সরোয়ার ও বরিশাল-৪ আসনে মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ জয়লাভ করেছিলেন। মেজবাহ জয়লাভ করে চেয়ারপার্সনের সঙ্গে দেখা করতে গেলে খালেদা জিয়া খুশি মনে প্রশ্ন করেছিলেন মেজবাহ তুমি এমপি হয়েছ। কারণ মেজবাহকে মনোনয়ন দেয়ার সময় খালেদা জিয়ার চিন্তা ছিল সে হতে পারবে কিনা। মেজবাহ প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হয়ে মেহেন্দীগঞ্জ ও হিজলার উন্নয়নে কাজ করেন। তবে ওই সময় মহাজোট সরকার গঠন করায় রাজনৈতিক চাপে ছিলেন মেজবাহ। ওই চাপ উপেক্ষা করে যেটুকু সরকারি সহায়তা পেয়েছেন তা দিয়ে এলাকার উন্নয়ন করেছেন।

২০১৪ সালের সর্বশেষ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। কিন্তু মেজবাহ এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছেন। এ আসন থেকে মেজবাহর সঙ্গে মনোনয়ন যুদ্ধে রয়েছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাজিব আহসান। রাজিব মনোনয়ন চাইলেও এলাকার সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই বললেই চলে। এলাকায় তার পরিচিতি আসে ছাত্রদলের পদ পাওয়ার পর। তবে রাজিব জানিয়েছেন, তিনি মনোনয়ন চাইবেন। দল থেকে মনোনয়ন দেয়া হলে নির্বাচনে অংশ নেবেন। এ জন্য তিনি কোনো তদবির করবেন না। মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হবে। তবে স্থানীয় বিএনপির প্রবীণ নেতারা জানিয়েছেন, এ আসন হচ্ছে বিএনপির ঘাঁটি। তাছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হবে আওয়ামী লীগের। সেই আওয়ামী লীগ দু’ভাগে বিভক্ত। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এ বিভক্তি কাজে লাগবে বিএনপির।

২০১৪ সালের নির্বাচনে ডামি প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বরিশাল-৪ আসনে এমপি নির্বাচিত হয়ে পংকজ নাথ মেহেন্দীগঞ্জ ও হিজলার উন্নয়নে কাজ করেছেন। কাজ করলেও তার বিরুদ্ধে সাংবাদিক নির্যাতন থেকে শুরু করে শিক্ষক ও দফতরি নিয়োগে রয়েছে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ। দলীয় নেতাকর্মীদের হামলা-মামলা দিয়ে নির্যাতন। টিআর, কাবিখা ও ৪০ দিনের কর্মসূচির টাকা লুটপাটসহ এন্তার অভিযোগ রয়েছে। তবে বেশি অভিযোগ হচ্ছে এমপি পংকজ অনুসারীদের বিরুদ্ধে। তার নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে বনায়নের গাছ লুট করেছে। বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়িতে চালানো হয় হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাট। এসব কারণে বিভিন্ন পত্রিকায় শিরোনাম হয়েছেন এমপি পংকজ।

সেখানকার আওয়ামী লীগের প্রধান সমস্যা হচ্ছে তারা দু’ভাগে বিভক্ত। আর এ বিভাজন স্পষ্ট হয় মেহেন্দীগঞ্জ আওয়ামী লীগের সভাপতি মইদুল ইসলাম বরিশাল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর। পংকজ নাথের অনুসারীরা মইদুলের ওপর হামলাও চালিয়েছে। তাদের একত্রিত করার জন্য বরিশাল ও ঢাকায় হাসানাত আব্দুল্লাহর উপস্থিতিতে সভা হলেও মনের মিল হয়নি। এখনো পংকজ ও মইদুল অনুসারীরা ভিন্ন পথে চলছে। পংকজ স্বেচ্ছাসেবকের নেতাকর্মীদের নিয়েই রাজনীতি করছেন। আর এ বিভক্তির কারণে পংকজ অনুসারীদের হাতে মইদুলের অনুসারীরা হামলার শিকার হয়েছেন। এ আসনে পংকজের সঙ্গে মনোনয়ন যুদ্ধে রয়েছেন সেখানকার প্রয়াত এমপি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদের মেয়ে ড. শাম্মি আহমেদ। মহিউদ্দিন এমপি থাকাকালীন ওই এলাকার উন্নয়নে কাজ করেছেন। তার ছিল এলাকায় ব্যাপক প্রভাব। শাম্মি ওই প্রভাবকে কাজে লাগাতে মনোনয়ন চাইছেন। তার দাবি দল থেকে তাকে মনোনয়ন দেয়া হলে তিনি এমপি নির্বাচিত হবেন।

এ ছাড়া দল থেকে মনোনয়নের জন্য দৌড়ঝাঁপ করছেন মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা আফজালুল করিম। তার পিতা নুরুল করিম খায়ের মাস্টার ওই এলাকা থেকে একবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে এমপি নির্বাচিত হন। তিনিও আওয়ামী লীগ নেতা ছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী দল থেকে তাকে মনোনয়ন না দেয়ায় খায়ের মাস্টার স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে দলীয় প্রার্থীকে পরাজিত করেন। খায়ের মাস্টারের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাতে চান তার ছেলে আফজালুল করিম। এ কারণে ওই আসন থেকে দলের কাছে মনোনয়ন চাইবেন আইনজীবী আফজাল। আইনজীবী হওয়ার কারণে হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের হতদরিদ্র জনগণ এবং দলীয় নেতাকর্মীদের বিনাপারিশ্রমিকে মামলা পরিচালনা করায় তার বেশ নাম রয়েছে। আরো যারা মনোনয়ন চাইছেন তারা কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। একইসঙ্গে স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে মোবাইলে দলের খবরাখবর নিচ্ছেন বলে স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এ ব্যাপারে মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বরিশাল জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মইদুল ইসলাম জানান, দল থেকে যাকে মনোনয়ন দেয়া হবে নেতাকর্মীরা তাকে বিজয়ী করতে কাজ করবে। দ্বন্দ্ব থাকতেই পারে তবে তা নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলবে না।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মো. ইউনুস এমপি বলেন, বড় দলে দ্বন্দ্ব থাকতেই পারে। তবে আগামী নির্বাচনে এর সামান্যতম প্রভাব পড়বে না। সভানেত্রী যাকে মনোনয়ন দেবেন তাকে জয়লাভ করতে সবাই একযোগে কাজ করবেন বলে মনে করেন এ সিনিয়র নেতা।

মানবকণ্ঠ/এসএস