আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে একাধিক প্রার্থী

চুয়াডাঙ্গা-১ (সদর-আলমডাঙ্গা) আসনটি দুটি উপজেলার ২০টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা হচ্ছে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৯৯১ জন। এদের মধ্যে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা হচ্ছে ২ লাখ ১২ হাজার ৮৪০ জন এবং নারী ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ১৪ হাজার ১৫১ জন। অন্য এলাকার মতো এ আসনেও আগ্রহী প্রার্থীরা আগেভাগেই নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে মাঠে নেমে পড়েছেন। প্রার্থীরা বিলবোর্ড দিয়ে জনগণকে শুভেচ্ছা জানাতে চাচ্ছেন। তবে বিএনপি ছাড়া অন্য কোনো দলের নেতাকর্মী মাঠে নেই। জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ, জাসদসহ অন্য কোনো দলের কার্যক্রমও চোখে পড়ে না। বলা যায়, এখানে অস্তিত্ব সংকট রয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টির।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৭৩ সালের সংসদ নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে আওয়ামী লীগের ব্যারিস্টার বাদল রশিদ ৫৫ হাজার ৮০৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাসদ প্রার্থী শাহে ইসলাম ১২ হাজার ১১১ ভোট পান। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে বিএনপি থেকে মিয়া মোহাম্মদ মনসুর আলী ৩৮ হাজার ১৮৮ ভোট পেয়ে এমপি নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের ব্যারিস্টার বাদল রশিদ ১৩ হাজার ৮৬ ভোট পান। এরপর ১৯৮৬ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী মকবুল হোসেন ৩৪ হাজার ৮২৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার সেলুন পান ৩১ হাজার ৬৫ ভোট। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী মিয়া মোহাম্মদ মনসুর আলী ৫৫ হাজার ৩২৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ প্রার্থী সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার সেলুন পান ৫৩ হাজার ৫৩৫ ভোট। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে বিনা ভোটে বিএনপির প্রার্থী শামসুজ্জামান দুদু কয়েক মাসের জন্য এমপি নির্বাচিত হন। পরবর্তীকালে একই বছরের ১২ জুন সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী শামসুজ্জামান দুদু দ্বিতীয়বারের মতো ৮৯ হাজার ৭০৮৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ প্রার্থী সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার সেলুন ৭৭ হাজার ৪৭৯ ভোট পান। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী শহিদুল ইসলাম বিশ্বাস ১ লাখ ৫১ হাজার ৭৬৩ ভোট পেয়ে এমপি নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ প্রার্থী সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার সেলুন ১ লাখ ১৩ হাজার ৩৩৩ ভোট পান। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার সেলুন ১ লাখ ৮৪ হাজার ৬৯৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৮৯ ভোট পান। সর্বশেষ ২০১৪ সালে আলোচিত সংসদ নির্বাচনেও আবার সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার এমপি নির্বাচিত হন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বর্তমান জাতীয় সংসদের হুইপ চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের এমপি সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার সেলুন শক্ত অবস্থায়। এর বাইরে এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি শিরিন নাঈম পুনম, কেন্দ্রীয় যুবলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ শামসুল আবেদীন খোকন, জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি এবং চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার চেয়ারম্যান আসাদুল হক বিশ্বাস, চুয়াডাঙ্গা পৌর মেয়র এবং যুবলীগ নেতা ওবাইদুর রহমান চৌধুরী জিপু, বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির সাধারণ সম্পাদক দিলীপ কুমার আগারওয়াল ও জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মাহবুব হোসেন মেহেদী।

অপরদিকে, বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান এবং সাবেক এমপি শামসুজ্জামান দুদু। জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস, সাবেক যুগ্ম সচিব ড. এম এ সবুর, ইয়ুথ ফোরামের উপদেষ্টা অব. লে. কর্নেল কামরুজ্জামান, আলমডাঙ্গা পৌরসভার সাবেক মেয়র এবং বিএনপি নেতা মীর মহিউদ্দীন, তরুণ নেতা শরিফুজ্জামান শরীফ ও জাতীয় পার্টির জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট সোহরাব হোসেন।

বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, সদর-আলমডাঙ্গা এলাকায় উন্নয়নের কাজ করতে চাই। এলাকার বেকারত্ব নিরসন করে সুখে-দুঃখে এলাকার সাধারণ মানুষের পাশে থাকতে চায়। সেক্ষেত্রে আমার দল ও আমার নেত্রী যদি আমাকে যোগ্য মনে করে দলীয় মনোনয়ন দেন তাহলে সদর-আলমডাঙ্গার উন্নয়নের জন্য দেখা স্বপ্নগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস বলেন, বর্তমানে আমার দলের অনেক নেতাকর্মী জেল-হাজতে রয়েছেন। দলে বিভেদ না থাকলেও রয়েছে ব্যক্তি পছন্দ। তিনি বলেন, ১/১১ এর সময় রাজনৈতিক শূন্যতায় এ আসনে দলের ভাবমূর্তি অক্ষত রাখতে খালেদা জিয়ার নির্দেশে কাজ করে যাচ্ছি। তিনি আরো বলেন, এই আসনে বিএনপির সুনির্দিষ্ট ভোট ব্যাংক রয়েছে। অন্যদিকে সরকারি দলের ব্যাপক কোন্দল রয়েছে। এ দুটি বিষয়কে কাজে লাগাতে পারলে বিএনপির বিজয় সুনিশ্চিত।

বিএনপির আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী ড. আবদুস সবুর বলেছেন, দীর্ঘদিন দলীয় কর্মকাণ্ড না থাকায় নেতাকর্মীরা আগামী নির্বাচনে নতুন মুখ চাইছেন। তারা অতীতের নেতৃত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তা ছাড়া দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেও তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছে। তাই তিনি দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন।

চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের উন্নয়নের দাবিদার জাতীয় সংসদের হুইপ সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার সেলুন এমপি বলেন, এ অঞ্চলের যা উন্নয়ন হয়েছে তা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েই হয়েছে। আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও ত্যাগের পর আজ সারাদেশের মতো সদর-আলমডাঙ্গাকে বর্তমান সরকার যেভাবে সাজাতে শুরু করেছে তাতে বিএনপি-জামায়াতের ঈর্ষান্বিত হওয়ার কথা। কারণ ওনারা এ অঞ্চলের উন্নয়ন করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন।

তিনি বলেন, নির্বাচন হওয়ার পর বিগত ৯ বছর এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। অবহেলিত চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনর সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ও নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। বিগত সময়ের মতো এবারো তিনি আওয়ামী লীগের কাছে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন এবং পাবেনও আশা করছেন।
মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি শিরিন নাঈম পুনম বলেছেন, নারীদের জন্য চুয়াডাঙ্গা নিরাপদ নয়। প্রায়ই নারীদের ধর্ষণসহ নানা হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। বাল্যবিয়ে তো পিছুই ছাড়ছে না। উন্নয়নেও কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে চুয়াডাঙ্গা। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে তিনি দলের মনোনয়ন চাইবেন।

যুবলীগের কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য শামসুল আবেদীন খোকন বলেছেন, গত নির্বাচনেও তিনি দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। আগামীতেও চাইবেন। তিনি অরো বলেন, এ আসনে আওয়ামী লীগে বিভক্তি রয়েছে। তবে তিনি কোনো দ্বিধাবিভক্তিতে নেই।

বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির সাধারণ সম্পাদক দিলীপ কুমার আগারওয়াল বলেন, দলীয় নেত্রী প্রধানমন্ত্রী আমাকে মনোনয়ন দিলে অবশ্যই আমি ভালো কিছু উপহার দেব। আমি এগিয়ে যাচ্ছি। আমি তৃণমূল নেতাকর্মীদের নিয়ে এলাকায় উন্নয়নমূলক কাজ করে যাচ্ছি। তাই আমি মনোনয়ন পাব বলে আশা করি।

যুবলীগ নেতা ও চুয়াডাঙ্গা পৌরমেয়র ওবায়দুর রহমান চৌধুরী জিপু বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি জানিয়েছেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগে পরিবারতন্ত্র প্রথা চালু হয়েছে। তাই কোন্দলও শুরু হয়েছে। তবে দ্রুতই দলীয় কোন্দলের নিরসন ঘটবে বলে আশা প্রকাশ করে এই নেতা বলেন, সাংগঠনিকভাবে তিনি বেশ জনপ্রিয়। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে মনোনয়ন দেবেন বলে তিনি প্রত্যাশা করছেন।

জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি আসাদুল হক বিশ্বাস দলীয় কোন্দলের কথা স্বীকার করে বলেন, তিনি কোনো গ্রুপে নেই। তা ছাড়া কেন্দ্রীয়ভাবেই তাকে বলা হয়েছে মাঠে কাজ করতে। জনগণও তাকে নির্বাচনে চাইছে। চুয়াডাঙ্গা-মেহেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সাবেক এই সভাপতির বিশ্বাস, মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রে দল তাকে মূল্যায়ন করবে।

অধ্যাপক ডা. মাহবুব হোসেন মেহেদীও দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। তিনি সুযোগ পেলেই এ আসনে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসাসেবা ও বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ করছেন।

মানবকণ্ঠ/আরএ