আওয়ামী লীগে নূর অপ্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি-জামায়াতে টানাটানি

নীলফামারী জেলার সদর উপজেলা নিয়ে নিয়ে নীলফামারী-২ আসন। আসনটিতে রয়েছে ১৫টি ইউনিয়ন, একটি পৌরসভা। ভোটার সংখ্যা (২০১৪) দুই লাখ ৭৫ হাজার ৩০৯। এর মধ্যে পুরুষ এক লাখ ৩৭ হাজার ৭৯৪ এবং নারী এক লাখ ৩৭ হাজার ৫১৫ জন।

দেশ বিদেশে খ্যাতি অর্জনকারী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এ আসনের নির্বাচিত এমপি।

আসাদুজ্জামান নূরের নির্বাচনী এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেই কেউ। বিএনপি, জামায়াতেও একক মনোনয়ন প্রত্যাশী। তবে ওই দুই দলে রয়েছে জোটের ভাগাভাগির অস্বস্তি। অপরদিকে মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টি আগাম হাল ছেড়েছে আসনটির।

আওয়ামী লীগে নূর অপ্রতিদ্বন্দ্বী: জেলায় আওয়ামী লীগের রাজনীতির অভিভাবক নীলফামারী-২ আসনের এমপি সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের আসনে দলের অন্য কোনো নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন না। জেলা শহরে বাড়ি হলেও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দেওয়ান কামাল আহমেদ মনোনয়ন চাচ্ছেন আসাদুজ্জামান নূরের আসন বাদে নীলফামারী-৪ আসনে।

একইভাবে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মমতাজুল হক মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন নূরের আসন (নীলফামারী-২) বাদে বাকি তিনটি আসনের যে কোনোটিতে। শুধু দলীয় নেতাই নন, জাতীয় পাটির কোনো নেতাই মনোনয়ন চাচ্ছেন না এ আসনে।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও নীলফামারী পৌরসভার পরপর পাঁচবারের নির্বাচিত মেয়র দেওয়ান কামাল আহমেদ নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ আংশিক) আসনে আগামী সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চাওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। তিনি জেলা শহরের থানাপাড়ার স্থায়ী বাসিন্দা হলেও নীলফামারী-৪ আসন থেকে মনোনয়ন চাওয়ার ব্যাপারে বলেন, ‘সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর আমাদের মুরুব্বি, আমাদের অভিভাবক। তিনি এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন করছেন। নূর ভাই যতদিন নীলফামারী-২ (সদর উপজেলা) আসনে নির্বাচন করবেন, ততদিন আমি এ আসনে মনোনয়ন চাইব না।’

অপরদিকে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মমতাজুল হক বলেন, ‘নীলফামারী-২ বাদে যে কোনো আসন থেকে আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন চাইব। জেলায় আওয়ামী লীগের রাজনীতির অভিভাবক নূর ভাই যে আসনের প্রার্থী আমি সেখানে মনোনয়ন চাওয়ার সাহস রাখি না।’

এদিকে জেলা জাতীয় পার্টির সম্প্রতি বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি সাবেক এমপি শিল্পপতি জাফর ইকবাল সিদ্দিকীর বাড়ি জেলা সদরে। তিনিও দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন সদরের বাইরে নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) ও নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ আংশিক) আসন থেকে।

জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব সাজ্জাদ পারভেজ মনোনয়ন চাচ্ছেন নীলফামারী-৩ (জলঢাকা-কিশোরগঞ্জ আংশিক) আসন থেকে। তিনি বলেন, ‘নীলফামারী সদর আসাদুজ্জামান নূরের নির্বাচনী এলাকা। তিনি দীর্ঘদিনের এমপি, সরকারের একজন শক্তিশালী মন্ত্রী। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটগত সম্পর্ক আছে জাপার। আগামীতে জোটগত নির্বাচন হলে তিনিই (নূর) মনোনয়ন পাবেন। এ কারণে জাপা থেকে কেউ আগ্রহ প্রকাশ করছেন না এ আসনে।’

অতি পুরনো সংগঠন এ আসনে আওয়ামী লীগের রয়েছে অতীত ঐতিহ্য। সে ঐতিহ্য আরো অর্থবহ হয়ে উঠেছে সাংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে। ক্লিন ইমেজের ব্যক্তি সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের আদর্শের নেতৃত্বের প্রভাব পড়েছে গোটা জেলার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে। তার গ্রহণযোগ্যতা সকল স্তরের মানুষের কাছে। এলাকার উন্নয়ন, নিজস্ব উদ্যোগে বিভিন্ন জনহিতকর কাজ আরো গ্রহণযোগ্য করেছে তাকে।

বিএনপি: এ আসনে দলীয় একক মনোনয়ন প্রত্যাশী শিল্পপতি মো. সামসুজ্জামান। তিনি বর্তমানে কেন্দ্রীয় বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক (রংপুর বিভাগ) এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের রাজনীতি থেকে বিএনপির রাজনীতিতে প্রবেশ করেন তিনি। ২০০৭ সালে জেলা বিএনপির যগ্ম আহ্বায়ক, ২০০৯ সালে সাধারণ সম্পাদক, ২০১১ সালে আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করে পুনরায় জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আসেন।

পেশা জীবনে তিনি একজন শিল্পপতি। সুয়েটার এবং গার্মেন্টস এক্সেসরিজ উৎপাদনকারী ও রফতানিকারক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে এমএসএস ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি জেলা শহরের বাবুপাড়ার মরহুম অধ্যক্ষ মো. মুছার ছেলে।

আসনটি থেকে বিএনপি-জামায়াতের জোটগত নির্বাচনে জোটের হয়ে নির্বাচন করেছিলেন জামায়াতের প্রার্থী। সে সময়ে বিএনপির প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায় জোটের আসন ভাগাভাগিতে।

জেলা বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম মোস্তফা রঞ্জু বলেন, ‘এবারে দূর হয়েছে সে বাধা। বিগত আন্দোল-সংগ্রামে দলের সাধারণ সম্পাদক কেন্দ্রীয় নেতা মো. সামসুজ্জামানের নেতৃত্বে কাজ করছেন নেতাকর্মীরা। এসব কাজ করতে গিয়ে দল সুসংগঠিত হয়েছে, ভোটার বেড়েছে। পূর্বের চেয়ে আমাদের সাংগঠনিক শক্তি বেড়েছে, এ ছাড়া ওই নেতার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নাম নেই। আসনটি উদ্ধারে বিএনপির প্রার্থীই প্রয়োজন।’

এ ব্যাপারে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. সামসুজ্জামান বলেন, ‘এ আসনে একাধিকবার জামায়াতের প্রার্থীর পরাজয় ঘটেছে। বর্তমানে জামায়াতের চেয়ে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী। নেতাকর্মীরা সুসংগঠিত রয়েছেন। এবারের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীই প্রয়োজন আসনটিতে।’

জামায়াত: আসনটিতে বিএনপি-জামায়াত জোটের পক্ষে মনোনয়ন প্রত্যাশী জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির মনিরুজ্জামান মন্টু। তিনি ১৯৭২ সালে নীলফামারী সরকারি কলেজ থেকে বিএসসি পাসের পর ব্যবসায় যোগ দিয়ে বর্তমানে একজন সফল ব্যবসায়ী। ১৯৭৯ সালে যোগ দেন জামায়াতের রাজনীতিতে। জোটের প্রার্থী হয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

তিনি জানান, অন্য দলে মনোনয়ন প্রত্যাশার প্রতিযোগিতা হয়, সেটি জামায়াতে নেই। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের চাহিদার ভিত্তিতে কেন্দ্র প্রার্থী নির্বাচন করে দেয়।

এ আসনের প্রার্থী নির্বাচনের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘জোটগত নির্বাচনে আসনটিতে বরাবরই জামায়াতের ভাগে ছিল। এবারেও থাকবে, প্রার্থী আমাকে করা হলে আমি নির্বাচন করব।’

১০টি নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ: আসনটিতে আওয়ামী লীগ প্রথম, দ্বিতীয়, অষ্টম, নবম, দশম নির্বাচনে বিজয়ী হয়।

সিপিবি পঞ্চম নির্বাচনে (আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতায়), জাতীয় পার্টি তৃতীয়, চতুর্থ, সপ্তম নির্বাচনে, বিএনপি ষষ্ঠ নির্বাচনে (১৯৯৬, ১৫ ফেব্রয়ারি) ক্ষমতায় আসে।

মানবকণ্ঠ/এসএস