একাদশ জাতীয় নির্বাচন : কুমিল্লা (৭)

আওয়ামী লীগে দ্বন্দ্ব আর বিএনপির গলার কাঁটা এলডিপি

 

আওয়ামী লীগে দ্বন্দ্ব আর বিএনপির গলার কাঁটা এলডিপিআওয়ামী লীগে দ্বন্দ্ব আর বিএনপির গলার কাঁটা এলডিপি

কুমিল্লা উত্তরের রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র হলো চান্দিনা। এই চান্দিনার ১৩টি ইউনিয়ন আর ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত কুমিল্লা-৭ সংসদীয় আসন। পূর্বের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই আসনটিতে আওয়ামী লীগ এবং এন্টি আওয়ামী লীগ সমানে সমান। গত ১০টি সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করেছে পাঁচবার আর পরাজিত হয়েছে পাঁচবার। এবার এই আসনে প্রার্থী নিয়ে আওয়ামী লীগের দ্ব›দ্ব প্রকাশ্যে। ক্ষমতাসীন দলের ৫ বারের এমপি অধ্যাপক আলী আশরাফ আতঙ্কে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. প্রাণ গোপালকে নিয়ে।

অপরদিকে, চান্দিনার বিএনপির রাজনীতির প্রাণ হিসেবে খ্যাত চান্দিনা উপজেলা এবং জেলা উত্তর বিএনপির সভাপতি খোরশেদ আলম মারা যাওয়ার পর একদিকে রয়েছে তাদের নেতৃত্ব শূন্যতা আর অপরদিকে রয়েছে গলার কাঁটা হিসেবে এলডিপির কেন্দ্রীয় মহাসচিব অ্যাড. রেদোয়ান আহমেদ। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী প্রয়াত খোরশেদ আলম মাত্র দুই হাজারের কিছু ভোটে আওয়ামী লীগের আলী আশরাফের কাছে হেরে যান। আর তৃতীয় হন এলডিপির অ্যাড. রেদোয়ান আহমেদ। এবার এলডিপি বিএনপির গলার কাঁটা হলো এ জন্য যে, অ্যাড. রেদোয়ান আহমেদ দলের কেন্দ্রীয় মহাসচিব। ৩০০ আসনের মধ্যে কর্নেল (অব.) অলি আহমদ যদি নিজেরটা ছাড়া আরেকটি আসনে চান সেটি হবে কুমিল্লা-৭। তখন জোটের স্বার্থে হয়তো বিএনপি এ সম্ভাবনাময় আসনটি ছেড়ে দিতে পারে। এই ভয়ে অস্থির কুমিল্লা উত্তর জেলার প্রাণকেন্দ্র চান্দিনা বিএনপি।

জানা যায়, ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের অধ্যাপক আলী আশরাফ। ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি হন বিএনপির অ্যাডভোকেট রেদোয়ান আহমেদ। ১৯৮৬ সালে তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি হন আওয়ামী লীগের অধ্যাপক আলী আশরাফ। ১৯৮৮ সালে বিএনপি ছেড়ে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে এমপি হন অ্যাডভোকেট রেদোয়ান আহমেদ। ১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে এমপি হন অ্যাডভোকেট রেদোয়ান আহমেদ। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির প্রশ্নবিদ্ধ ৬ষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে এমপি হন ফিড্রম পার্টির তৎকালীন কো-চেয়ারম্যান বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি কর্নেল (অব.) রশিদ। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের ৭ম সংসদ নির্বাচনে এমপি হন আওয়ামী লীগের অধ্যাপক আলী আশরাফ। ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগ দিয়ে অ্যাডভোকেট রেদোয়ান আহমেদ আবারো এমপি হন। পরে বিএনপি সরকারের শেষ দিকে অ্যাডভোকেট রেদোয়ান ২০০৬ সালে কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিতে (এলডিপি) যোগ দেন। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে এবং ২০১৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ বিতর্কিত দশম সংসদ নির্বাচনেও অধ্যাপক আলী আশরাফ পঞ্চম বারের মতো এমপি নির্বাচিত হন।

আওয়ামী লীগ: স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত দুটি নির্বাচনসহ এই পর্যন্ত ১০টি সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা ৭ সংসদীয় আসন থেকে মোট পাঁচবার নৌকা প্রতীক নিয়ে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন সাবেক ডেপুটি স্পিকার অধ্যাপক আলী আশরাফ। দল এবং মহাজোটে এবার তিনি কঠিন প্রতিদ্বন্ধিতায় রয়েছেন। এবার মনোনয়ন দৌঁড়ে তার সঙ্গে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. প্রাণ গোপাল। চান্দিনা উপজেলা এবং পৌর কমিটি এমপি আশরাফের পক্ষে থাকলেও কিছু ইউপি চেয়ারম্যানসহ দলের একটি অংশ রয়েছে ডা. প্রাণ গোপালের সঙ্গে। সম্প্রতি একটি দৈনিকে আওয়ামী লীগের বেশ কিছু আসনে যে চ‍ূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করে সেখানে কুমিল্লা-৭ সংসদীয় আসনে এমপি আলী আশরাফের জায়গায় ডা. প্রাণ গোপালের নাম রয়েছে। যদিও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এই সংবাদের পক্ষে বিপক্ষে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ডা. প্রাণ গোপাল সমর্থকরা নিশ্চিত করে দাবি করেন এবার মনোনয়ন পাচ্ছেন তাদের নেতা ডা. প্রাণ গোপালই। যদিও এ কথার সমর্থনকে বোগাস বলে উড়িয়ে দেন আলী আশরাফের সমর্থকরা।

সাবেক ডেপুটি স্পিকার অধ্যাপক মো. আলী আশরাফ এমপি বলেন, আমি কারও হাত ধরে রাজনীতি করি না, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে লালন করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে দলের সব নেতাই আমাকে চেনেন, জানেন। সুতরাং মনোনয়ন নিয়ে আমার চিন্তার কোনো কারণ নেই।

কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ডা. প্রাণ গোপাল বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কাজ করছি। এবার দলের কাছে মনোনয়ন চাইব। আশা করি দল আমাকে মনোনয়ন দেবে। ৫ বারের এমপি আলী আশরাফকে রেখে কেন আপনাকে মনোনয়ন দেবে আওয়ামী লীগ জানতে চাইলে ডা. প্রাণ গোপাল বলেন, আওয়ামী লীগ সারাদেশে উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দিলেও চান্দিনায় তিনি দৃশ্যমান কিছুই করেননি। তার মাধ্যমে দলের নেতাকর্মীরা হামলা মামলার শিকার হয়ে নির্যাতিত হয়েছেন। সুতরাং আশা করি দল এবার আমাকে মনোনয়ন দেবে।

বিএনপি: বর্তমানে এলডিপির কেন্দ্রীয় মহাসচিব অ্যাড. রেদোয়ান আহমেদ এই আসন থেকে চারবার এমপি নির্বাচিত হলেও বিএনপির টিকিটে এমপি হয়েছেন ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় ও ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে। অষ্টম সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকারের একেবারে শেষ দিকে এসে বিএনপি ছেড়ে কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিতে (এলডিপি) যোগ দেন অ্যাডভোকেট রেদোয়ান আহমদ। তখন চান্দিনা উপজেলা বিএনপি নেতৃত্ব শূন্য হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে দলের হাল ধরেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম। পরে তিনি কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সভাপতিও হন। তার নেতৃত্বে কুমিল্লা ৭ সংসদীয় আসনের প্রতিটি এলাকায়, পাড়া মহল্লায় দল সংগঠিত ছিল। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে বৈরী পরিবেশে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মাত্র ২ হাজার ভোটে পরাজিত হন। নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের অধ্যাপক আলী আশরাফ। আর তৃতীয় স্থান অর্জন করে জামানত বাজেয়াপ্ত হয় এলডিপির রেদোয়ান আহমেদের। কিন্তু বিএনপির দুর্ভাগ্যবশত ২০১৭ সালে চান্দিনা বিএনপির কাণ্ডারি খোরশেদ আলম মারা গেলে দলটি মুরব্বি শূন্য হয়ে পড়ে। বর্তমানে খোরশেদ আলমের বিকল্প হিসেবে স্থানীয় নেতাকর্মীরা তার ছেলে অ্যাডভোকেট আতিকুল আলম শাওনকে নিয়ে এগোচ্ছেন বলে জানা গেছে। সম্প্রতি তাকে চান্দিনা উপজেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়েছে। রাজনীতিতে নবীন এই তরুণ কিভাবে বিএনপির মতো দলকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবেন তাই এখন দেখার বিষয়।
অন্যদিকে, বিএনপির ভেতরে চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে যে, জোটের রাজনীতি রক্ষা করতে গিয়ে যদি হাই কমান্ড এলডিপির অ্যাডভোকেট রেদোয়ান আহমেদকে মনোনয়ন দিয়ে দেয় তখন নানা ঘাত-প্রতিঘাতে টিকে থাকা চান্দিনা বিএনপির অবস্থা কি হবে। চান্দিনা পৌরসভা বিএনপির সভাপতি এবিএম সিরাজুল ইসলাম ভূইয়া বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে মাত্র ২ হাজার ভোটে ষড়যন্ত্র করে খোরশেদ আলম ভাইকে হারানো হয়েছিল। বর্তমান বিএনপি আগের থেকেও অনেক শক্তিশালী। হাই কমান্ড যে সিদ্ধান্ত দেবে সেটাই হবে আমাদের সিদ্ধান্ত।

এলডিপি: বিএনপি, জাতীয় পার্টি, স্বতন্ত্র আবার বিএনপি থেকে মোট চার এমপি নির্বাচিত হন এলডিপির কেন্দ্রীয় মহাসচিব অ্যাডভোকেট রেদোয়ান আহমেদ। এবার তিনি ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে এ আসন থেকে নির্বাচন করতে চাচ্ছেন। যেহেতু তিনি জোটভুক্ত একটি দলের কেন্দ্রীয় মহাসচিব তাই তার দলের নেতাকর্মীদের ধারণা, বিএনপি নেতৃত্বধীন ২০ দলীয় জোটের মনোনয়ন তিনিই পাবেন। এই হিসেবে রেদোয়ান আহমেদ ও তার কর্মীরা মাঠে রয়েছেন। সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রেদোয়ান আহমেদ জানান, ২০০৬ সালে আমরা এলডিপি গঠন করি, এরপর একটি পর্যায়ে ২০১২ সালে এসে আমরা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে তৎকালীন ১৮ দলীয় জোটে অংশগ্রহণ করি। আমি ২০ দলীয় জোটের শরীক দল এলডিপির মহাসচিব। আমি আশা করি, ২০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে মনোনয়ন পাব এবং নির্বাচিত হওয়ারও আশা রাখি। এ আসনে জাতীয় পার্টি (এরশাদ) থেকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন কুমিল্লা উত্তর জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি মো. লুৎফুর রেজা খোকন। তবে আলোচনা যাই হোক এখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে নৌকার সঙ্গে ধানের শীষের।

মানবকণ্ঠ/এসএ