আওয়ামী লীগে একক প্রার্থী বিএনপিতে কোন্দল চরমে

জাতীয় সংসদের জামালপুরের ৫টি আসনের মধ্যে জামালপুর-৩ আসনটি হচ্ছে সবচেয়ে আলোচিত এবং আওয়ামী লীগের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি বলে পরিচিত। জামালপুর-৩ আসনটি মেলান্দহ ও মাদারগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত। এ আসনের একক হেভিওয়েট প্রার্থী নিয়ে খোস মেজাজে রয়েছে আওয়ামী লীগ। আর দলীয় কোন্দল ও একাধিক প্রার্থী নিয়ে বেকায়দায় রয়েছে বিএনপি।

জামালপুর-৩ আসনের নির্বাচনী এলাকার রাজনৈতিক ময়দানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই শক্তিশালী প্রার্থী। এ আসনে আগামী সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এলাকার রাজনৈতিক ময়দান উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ইতিমধ্যে ঢাকঢোল পিটিয়ে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী জামালপুরের উন্নয়নের কর্ণধার মির্জা আজম এমপি এই আসনের একক প্রার্থী। সম্প্রতি তিনি এক অনুষ্ঠানে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে অতীতে তার সব ভুল ক্ষমা চেয়ে ভোট প্রার্থনাও করেছেন। তিনি বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর তার নির্বাচনী এলাকা ছাড়াও পুরো জেলায় ব্যাপক উন্নয়ন কাজ করে যাচ্ছেন। উন্নয়নের পাশাপাশি দলকেও করেছে সুসংগঠিত। তার নির্বাচনী এলাকায় দলীয় কোনো কোন্দল নেই। নেই অন্য কোনো প্রার্থীও।

এই আসনে বিএনপির রয়েছে একাধিক প্রার্থী। দলেও রয়েছে কোন্দল-উপকোন্দল। রাজনৈতিক নানা প্রতিকূলতার মধ্যে এবারো বিএনপির একজন শক্তশালী প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন ৯০ এর গণআন্দোলনের অন্যতম ছাত্র নেতা বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহজলবায়ু বিষয়ক সম্পাদক ও মেলান্দহ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল।

বিএনপির চেয়ে আওয়ামী লীগ ভোটের দিক থেকে শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে। দুটি পৌরসভা ও দুই উপজেলায় মোট নির্বাচনী ১৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ আসনটি। মেলান্দহ উপজেলায় পুরুষ ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ১৮ হাজার ২৮১ এবং নারী ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৮২ জন এবং মাদারগঞ্জ উপজেলায় পুরুষ ভোটার সংখ্যা ৯৪ হাজার ২৮৭ এবং নারী ভোটার সংখ্যা ৯৩ হাজার ২২৫ জন (০৬-০৯-১৮ ইং পর্যন্ত)। সব মিলিয়ে জামালপুর-৩ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ২৪ হাজার ৫৭৫ জন।

নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত টানা ৫টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মির্জা আজম এই আসনের এমপি নির্বাচিত হন। মির্জা আজম তার নির্বাচনী এলাকার রাস্তাঘাট, ব্রিজ কালভার্টসহ বহু শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, পল্লী উন্নয়ন ভবন, জামালপুর শহরে ৫শ’ শয্যা বিশিষ্ট শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শতাধিক কোটি টাকা ব্যয়ে নগর স্থাপত্য (সাংস্কৃতিক পল্লী) ২টি বাইপাস সড়কসহ ১০ হাজার কোটি টাকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ চলমান রেখেছেন। আরো প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ বরাদ্দের অপেক্ষায় রয়েছে। জেলার সবচেয়ে অবহেলিত পিছিয়ে পড়া জনপদ দুই উপজেলায় এখন উন্নয়ন ও অগ্রগতির যে চিত্র দৃশ্যমান তার অনেকটাই মির্জা আজমের অবদান।

সারা জেলার সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করাসহ এবারের নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে মির্জা আজম নির্বাচনী প্রচারে ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা করেছেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিনি মেলান্দহ-মাদারগঞ্জের আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনগুলোকে গতিশীল করতে প্রতিমাসেই কোথাও কর্মিসভা, কোথাও বিশেষ বর্ধিত সভাসহ সাংগঠনিক মেলারও আয়োজন করেন। নেতাকর্মীদের সর্বক্ষণিক চাঙ্গা রাখতে নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে বর্তমান সরকারের উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরছেন। তার সফল নেতৃত্বে এ আসনের আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান সারা জেলার মধ্যে মডেল হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ষষ্ঠবারের মতো মির্জা আজমকে এমপি হিসেবে নির্বাচিত করতে আগাম প্রস্তুতি সেরে নিচ্ছেন।

তিনি একই আসন থেকে টানা ৫ বার এমপি হয়ে এবার বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। তিনি বর্তমানে জামালপুরে আওয়ামী রাজনীতিতে হিরো হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। যেন তার কোনো বিকল্প নেই। ২০০১ সালে এমপি মির্জা আজম নানা দলীয় প্রতিকূলতাসহ জোটের জোয়ার এবং বাবুল-দিদার বাহিনী কর্তৃক প্রায় সময় অবরোধ থাকায় এবং মির্জা আজম-দিদার পাশা দ্ব›দ্ব সংঘাতের পটভ‚মিতে ঘড়ি মার্কার স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক ছাত্রনেতা মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের জাঁকজমকপূর্ণ নির্বাচনী প্রচারাভিযান এবং বিএনপি জামায়াত বাবুলের পক্ষে শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করার পরেও এলাকার মানুষজন শেষ পর্যন্ত বিপুল ভোট দিয়ে জিতিয়ে দেয় মির্জা আজমকে। এ কারণে মির্জা আজম জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় হুইপ ও বাংলাদেশ আওয়ামী-যুবলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। বরাবরের ন্যায় এবারো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামালপুরের ৫টি আসনের মধ্যে তিনি সবচেয়ে সুবিধাজনক স্থানে রয়েছেন।

এ আসনের দুটি উপজেলায় বিএনপির রাজনৈতিক ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সাবেক নেতা মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল বিএনপিতে যোগদানের পর থেকে মির্জা আজম বিরোধী একটি সেন্টিমেন্ট তৈরি করে এখনো তিনি মাঠে রয়েছেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় জলবায়ু বিষয়ক সম্পাদক এবং মেলান্দহ উপজেলা বিএনপির সভাপতির পদে রয়েছেন। দুই উপজেলার বিএনপির মধ্যে জনপ্রিয় হলেও দলীয় কোন্দলের কারণে তিনি ২০০১ সালে জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন বঞ্চিত হন। ওই নির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘দেয়াল ঘড়ি’ প্রতীকে অংশ নিয়ে প্রায় ৪০ হাজার ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মির্জা আজমের কাছে হেরে যান। এর পরও তিনি মাঠ ছাড়েননি। পরাজিত হওয়ার পরপর বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল ফের ফিরে আসেন বিএনপিতে। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার আশীর্বাদপুষ্ট মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল আগামী নির্বাচনেও বিএনপি থেকেই ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন প্রত্যাশী। এ আসনে মির্জা আজমের সঙ্গে ভোটযুদ্ধে নামার মতো বিএনপির বিকল্প প্রার্থী না থাকায় তার মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।

২০০১ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পরাজিত হয়েও এলাকায় জনগণের জন্য ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন তিনি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল মাঝে মধ্যে ঢাকা থেকে মেলান্দহ ও মাদারগঞ্জ উপজেলার এসে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে তিনিই সবচেয়ে এগিয়ে। এ আসনে বিএনপির একক সম্ভাব্য প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল নির্বাচনী এলাকায় দলীয় নেতাকর্মী নিয়ে দলমত নির্বিশেষে মেলান্দহবাসী হিসেবে তাকে একটি ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার আবেদন জানাচ্ছেন ভোটারদের কাছে।

তবে দলের নেতাকর্মীরা বলছেন, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল দলের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে আওয়ামী লীগ সরকারের নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছেন। এখনো তিনি জেলে রয়েছেন। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ হলে এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারলে এবার তিনি নির্বাচিত হবেন বলে মন্তব্য দলীয় নেতাকর্মীদের।

মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ আসনের বিএনপির আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী হলেন কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী গোলাম রব্বানী। তিনিও দলীয় মনোনয়ন চাইবেন। দল তাকে মনোনয়ন দিলে তিনি নেতাকর্মী ও এলাকার মানুষদের সঙ্গে নির্বাচনে লড়াই করবেন। মানুষ আওয়ামী লীগের দুঃশাসন থেকে রক্ষা পেতেই বিএনপির প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন বলে তিনি মনে করেন। আর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিও করেন তিনি।

এই আসনে বিএনপির অপর সম্ভাব্য প্রার্থী হলেন জাতীয় পার্টি থেকে সদ্য যোগদানকারী বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার দৌলুতুজ্জামান আনসারী। এলাকায় তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। রাজনীতির পাশাপাশি তার নির্বাচনী এলাকার সাধারণ মানুষকে সাহায্য সহযোগিতা করে আসছেন। দল যদি নির্বাচনে অংশ নেয়, তাহলে তিনিও মনোনয়ন চাইবেন।

ইঞ্জিনিয়ার মো. দৌলতুজ্জামান আনসারী বলেন, তার নির্বাচনী এলাকার মেলান্দহ ও মাদারগঞ্জ উপজেলার বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের অসংখ্য নেতাকর্মীরা তাকে এমপি হিসেবে পেতে চান বলে তিনি জানান। দল যদি তাকে মনোনয়ন দেয় তা হলে এ আসনের সাধারণ মানুষ তাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। এ আসনে ধানের শীষ প্রতীক পেতে এলাকায় গণসংযোগের পাশাপাশি কেন্দ্রেও লবিং করছেন।

এই আসনে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় ও শক্তিশালী প্রার্থীর বিপক্ষে বিএনপির যিনি মনোনয়ন পাবেন তার পক্ষ হয়ে নেতাকর্মীরা সব দ্বন্দ্ব ভুলে গিয়ে ভোটের দিন ভোট কেন্দ্র নিজেদের দখলে রাখতে পারলেই বিএনপির প্রার্থীর বিজয় হবে বলে মনে করছেন সচেতন সাধারণ ভোটাররা।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ