আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে ধূম্রজাল, বিএনপির একক প্রার্থী

টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। নেতৃত্ব সংকটে পড়েছে আওয়ামী লীগ। ঘাটাইলে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের কোনো কমিটি নেই। আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে কার্যক্রম চলছে। অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে দিশেহারা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। বর্তমান এমপি আমানুর রহমান খান রানা হত্যা মামলার আসামি হয়ে এক বছরের বেশি সময় ধরে হাজতবাস করছেন। এ অবস্থায় আগামী নির্বাচনে তার মনোনয়ন পাওয়া প্রায় অনিশ্চিত। এ সুযোগে মাঠে নেমেছেন আওয়ামী লীগের কয়েক নেতা।

অপরদিকে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল কাজে লাগিয়ে নির্বাচনী মাঠে জয় পেতে তৎপর রয়েছে বিএনপি। টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) সংসদীয় আসনের ১৪ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ভোটার ৩ লাখ ১৮ হাজার ১০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫৮ হাজার ৫২৮ এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৫৯ হাজার ৪৭২ জন। এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন এমপি আমানুর রহমান খান রানা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান, সোনালী ব্যাংকের পরিচালক মো. নুরুল আলম তালুকদার, সাবেক এমপি ডা. মতিয়ার রহমানের ছেলে তানভীর রহমান, সুপ্রিম কোর্টের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ড. শহীদুল ইসলাম । সম্ভাব্য প্রার্থীরা বিভিন্ন কৌশলে আগাম নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। স্ব স্ব অবস্থান থেকে তারা সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, সেবামূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডসহ দোয়া মাহফিল, ব্যানার-ফেস্টুন ও পোস্টারের মাধ্যমে প্রার্থিতার জানান দিচ্ছেন।

এ আসনটি মূলত বিএনপির আসন হিসেবে পরিচিত। ১৯৮৮ সালের সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী খান মোহন এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টানা তিনবার বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফর রহমান খান আজাদ নির্বাচিত হন। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনে দীর্ঘদিন দখলে থাকা আসনটি বিএনপির হাতছাড়া হয়। দীর্ঘ ২১ বছর পর এ আসনটি দখলে আসে আওয়ামী লীগের। বিশিষ্ট চিকিৎসক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মতিউর রহমান আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়েই এমপি নির্বাচিত হন। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফর রহমান খান আজাদকে পরাজিত করেন তিনি। ডা. মতিউর রহমান ২০১২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর মারা যাওয়ায় আসনটি শূন্য হয়। ওই বছরের ১৮ নভেম্বর শূন্য আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পান উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা শহিদুল ইসলাম লেবু। কিন্তু তার মনোনয়নকে প্রত্যাখ্যান করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করেন তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক আমানুর রহমান খান রানা। ঘাটাইল আসনে সরকার দলীয় এমপি আমানুর রহমান খান রানা ২০১৪ সালে ভোটারবিহীন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এরপর থেকেই শহিদুল ইসলাম লেবু ও রানার মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাতের শুরু হয়েছে। দু’জনের সমর্থকদের মধ্যে ঘটছে প্রতিনিয়ত হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা। এসব কারণে দলের মধ্যে বিভেদ আরো বেড়েছে। ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে সাধারণ এবং মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে। দলের ভেতর গড়ে উঠেছে আরেক দল। এমপি আমানুর রহমান খান রানা খুনের অভিযোগে জেলহাজতে থাকলেও এমপি রানা আবারো মনোনয়ন পাবেন বলে তার অনুসারীরা জনগণের মাঝে প্রচারণা চালাচ্ছেন। এমপি রানার অনুসারী ঘাটাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম খান হেস্টিং বলেন, আগামী নির্বাচনে ঘাটাইলে এমপি রানার বিকল্প কেউ নেই। অধিকাংশ মানুষ রানার পক্ষে এবং রানাকেই এমপি হিসেবে দেখতে চায়। আসন ধরে রাখতে চাইলে অবশ্যই রানাকে মনোনয়ন দিতে হবে। অন্য কেউ মনোনয়ন পেলে এখানে বিএনপি জয়লাভ করবে।

তবে এসব বিষয় উড়িয়ে দিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম লেবু বলেন, একজন খুনিকে প্রধানমন্ত্রী আর মনোনয়ন দেবেন না। ঘাটাইলের জনগণ ভুল করে ভোট দিয়েছিল। কালো টাকা ও পেশিশক্তি দিয়ে সে জয় পেয়েছিল। তার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমিই প্রতিবাদ করেছি। ঘাটাইলবাসীর কাছে রানা অতীত। উপনির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে মনেনায়ন দিয়েছিলেন। ১৪টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি অত্যন্ত মজবুত এবং নেতকর্মীরা সবাই ঐক্যবদ্ধ। নেতাকর্মীরা আমার পক্ষে রয়েছেন। আবারো মনোনয়ন পেলে প্রধানমন্ত্রীকে নৌকা উপহার দিতে পারব।

আওয়ামী লীগের কয়েক নেতা জানান, ঘাটাইলে উন্নয়মূলক কর্মকাণ্ড মুখ থুবড়ে পড়েছে। দলীয় এমপি প্রায় দুই বছর ধরে অনুপস্থিত। দলের আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম লেবুর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রানার সমর্থকরাও শহিদুল ইসলাম লেবুর কর্মী বাহিনীর হামলা ও পুলিশি মামলার ভয়ে বেশিরভাগ সময় আত্মগোপনে থাকেন। সে ক্ষেত্রে ঘাটাইলের উন্নয়নের জন্য যোগ্য প্রার্থী হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির অধিকারী অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান মনোনয়ন পেলে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয় পাওয়া সম্ভব। কামরুল হাসান খান এ বিষয়ে বলেন, ঘাটাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের অভিভাবক ছিলেন শামসুর রহমান খান শাজাহান। তার সঙ্গে থেকে দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে কাজ করেছি। মাঠ পর্যায়ে দলকে শক্তিশালী করতে সহযোগিতা করেছি। তা ছাড়াও সর্বোপরি ডাক্তার হিসেবেও জনগণের সেবা করে যাচ্ছি। এ কারণে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আমাকে চায়। নেত্রী মনোনায়ন দিলে অবশ্যই জয়ী হব।

ড. মো. নুরুল আলম তালুকদার হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। ২০১৩ সালে অবসর নিয়েছেন। অবসর নিয়েই তিনি রাজনীতির ময়দানে নেমে পড়েছেন। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখছেন। এলাকার জনগণের মাঝে দান-খয়রাত করছেন। বর্তমানে তিনি সোনালী ব্যাংকের পরিচালক। তিনি বলেন, আমরা তিন ভাই মুক্তিযোদ্ধা। এ দেশের জন্য আমার মা-বাবারও বিশেষ অবদান রয়েছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন ব্যাংকে চাকরি করার সুবাদে এলাকার জনগণের সামান্য হলেও উপকার করতে পেরেছি। ঘাটাইলে দলের মধ্যে যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল রয়েছে আমি মনোনয়ন পেলে কোন্দল নিরসন করে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে এক প্লাটফর্মে এনে নির্বাচন করতে পারব। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিএনপির যে কোনো প্রার্থীকে পরাজিত করার সক্ষমতা তার রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

সাবেক এমপি ডা. মতিয়ার রহমানের ছেলে তানভীর রহমানের আগমনকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন নেতাকর্মীরা। তিনি মনোনয়ন পেলে ঘাটাইলে নৌকার পালে নতুন হাওয়া লাগতে পারে বলে দাবি নেতাকর্মীদের। এ বিষয়ে তানভীর রহমান বলেন, হঠাৎ করে বাবার মৃত্যুতে আমরা দিশেহারা হয়ে পড়ি। এ ছাড়াও আমি বিদেশে পড়াশোনা করেছি। এ কারণে বিগত দুটি নির্বাচনে আসতে পারিনি। এবার মনোনয়ন প্রত্যাশা করছি। বাবার অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণ করতে চাই। প্রধানমন্ত্রীও এলাকায় কাজ করতে বলেছেন। তাই আসনটি পনুরুদ্ধার করতে বাবার উত্তরসূরি হিসেবে দল তাকে মূল্যায়ন করবে বলে তিনি প্রত্যাশা করছেন।

এদিকে ঘাটাইলে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি অত্যন্ত মজবুত ও শক্তিশালী। দলের অভ্যন্তরে নেতৃত্বের কোন্দল থাকলেও উপজেলার তৃণমূল পর্যায়ের সব নেতাকর্মী বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফর রহমান খান আজাদের প্রতি সবাই আস্থাশীল। ইতোমধ্যে তিনি ১৪টি ইউনিয়ন ও সব ওয়ার্ড কমিটি করে দলের নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করেছেন। দলে তার একক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তবে তাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে এবার প্রার্থী হবেন জেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ মাইনুল ইসলাম। এ ব্যাপারে ঘাটাইল পৌরসভা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক মেয়র মঞ্জুরুর হক মঞ্জু বলেন, উপজেলা বিএনপির সব নেতাকর্মী লুৎফর রহমান খান আজাদের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ। জনপ্রিয়তায় তিনি সব প্রার্থীর চেয়ে শীর্ষে রয়েছেন। ঘাটাইলে তার বিকল্প নেই। মনোনয়ন পেলে তিনি বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হবেন।

লুৎফর রহমান খান আজাদ বলেন, বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণের কোনো আস্থা নেই। আওয়ামী লীগের কাছ থেকে মানুষ মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। মন্ত্রী থাকাকালীন ঘাটাইল উপজেলার রাস্তাঘাট-অবকাঠামোসহ ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। জনগণ সে কারণে আমাকে সবসময়ই সমর্থন করছে। এ ছাড়াও জাতীয় কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে জনগণের যে সমর্থন দেখেছি তাতে আমি অভিভূত হয়েছি। আগামী নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হবেন বলে জানান তিনি।

জেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ মাইনুল ইসলাম বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক গণসংযোগ করে যাচ্ছি। এতে বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া পড়েছে এবং তারা আমাকে সমর্থন করেছে। জেলা বিএনপির নেতারা আমার পক্ষে রয়েছে। দলীয় মনোনয়ন পেলে বিপুল ভোটে জয়ী হবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এদিকে জাতীয় পার্টির উপজেলা সাবেক সভাপতি আবদুল হালিম ও বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের (বিএনএফ) জেলা শাখার আহ্বায়ক আতাউর রহমান খান (বড় ভাই) প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

মানবকণ্ঠ/এসএস