আওয়ামী লীগের ভোটের সঙ্গীরাই বিএনপির সতীর্থ!

আওয়ামী লীগের ভোটের সঙ্গীরাই বিএনপির সতীর্থ!স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার পরিচালনাকারী তিন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ এবার নতুন রূপে সাজছে। চারবার সরকারে থাকা বিএনপি এবং দুইবার সরকারে থাকা জাতীয় পার্টির প্রধান বিরোধী হিসেবে সংসদ কাঁপানো আওয়ামী লীগ এবার একক সংখ্যাগরিষ্টতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে। সঙ্গতকারণেই সংসদে সরকারি দলের ভ‚মিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে দলটি। এক্ষেত্রে যাদের প্রধান বিরোধী হিসেবে ছয়টি সংসদে তারা প্রতিনিধিত্ব করেছে সে দল দুটোই এবার বসছে তাদের বিরোধী হিসেবে।

সেই সঙ্গে জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলসহ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ভোটের জোট মহাজোটের শরিকদের সবাই এবার প্রথমবারের মতো সংসদে বসছে বিরোধী দলের আসনে। সবমিলিয়ে সরকার এবং সংসদে আওয়ামী লীগের সতীর্থ বলে দৃশ্যমান আর কেউ নেই। তবে নিজেরা না চাইলেও শপথ না নেয়া বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বিরোধিতার সঙ্গী হিসেবে সবাইকেই পাচ্ছে। অবশ্য এটি নির্ভর করছে বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টের সংসদে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্তের ওপর।

শেষপর্যন্ত যদি তারা সংসদে যোগ দেয়ার ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে সংসদে প্রতিনিধিত্ব পাওয়া সব দলই থাকবে তাদের কাছাকাছি, পাশাপাশি। সংসদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবেই ভাবছেন। তাদের মতে, ভোট অনুষ্ঠান নিয়ে সরকারের সমালোচনা থাকলেও গত দশম সংসদের মতো এবারের সংসদ নিরস হবে না। এত বেশি বিরোধী দল এর আগে সংসদ কখনো পায়নি। বিরোধীদের মধ্যে অতীতে সরকার পরিচালনাকারী বড় দুটি দলও রয়েছে। বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সংসদে যোগ দিলে এবারের সংসদ সবচেয়ে বেশি কার্যকর ও প্রাণবন্ত হবে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিজয়ের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ পাঁচবার ও বিএনপি চারবার এবং জাতীয় পার্টি দুইবার বিজয়ী হয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ প্রথম, সপ্তম, নবম, দশম ও এগারতম সংসদে এবং বিএনপি দ্বিতীয়, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও অষ্টম সংসদে জয় পায়। অন্যদিকে, জাতীয় পার্টি তৃতীয় ও চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়। এর আগে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি টানা দুইবার করে সরকার গঠন করলেও কোনো দল টানা তিনবার সরকার গঠন করতে পারেনি। এবার আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয়বার সরকার গঠন করার অনন্য নজির গড়েছে।

এদিকে বাংলাদেশের তিনটি সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন বর্তমান সরকার প্রধান শেখ হাসিনা। ১৯৮৬ সালে জাপা নেতৃত্বাধীন তৃতীয় সংসদে, ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন পঞ্চম ও অষ্টম জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। টানা তিনবার ক্ষমতার মসনদে থাকা আওয়ামী লীগ পালন করে বিরোধী দলের দায়িত্ব। এবার আওয়ামী লীগের বিরোধী দল হিসেবে সংসদে থাকছে আগের সরকার পরিচালনাকারী সবাই।

সংসদ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ঘিরে নতুন সাজে সাজছে জাতীয় সংসদ ভবন। সংসদ ভবন ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হচ্ছে। সংসদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত গণপূর্ত অধিদফতরের কর্মীরা ভবন সাজানোর কাজ করছেন। এবারই প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাচ্ছে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম। এ দলের কোনো নেতা এর আগে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হননি। এবার নির্বাচিত দুই সদস্য হলেন- সিলেট-২ আসন থেকে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মোকাব্বির খান ও মৌলভীবাজার-২ আসন থেকে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর। এদের মধ্যে মোকাব্বির খান গণফোরামের দলীয় প্রতীক উদীয়মান সূর্য নিয়ে নির্বাচন করলেও সুলতান মনসুর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক হিসেবে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেছেন।

আগামী ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় প্রথম অধিবেশনটি দীর্ঘ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। অধিবেশনের প্রথম দিনে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ভাষণ দেবেন। অধিবেশন শুরুর দিনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করবে সংসদ। এ লক্ষ্যে সংসদ সচিবালয়ের প্রস্তুতি চলছে। সংবিধান অনুযায়ী বছরের প্রথম অধিবেশন শুরুর দিন রাষ্ট্রপতি সংসদে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন। পরে রাষ্ট্রপতির ওই ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব জানাতে সাধারণ আলোচনা হয়।

আবার চলতি সংসদের কোনো এমপি মারা গেলে অধিবেশন শুরুর পর মুলতবি করা হয়। তাই এবারের অধিবেশন শুরুর পর মুলতবি দিয়ে ওই দিনই আবারো শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে। সংসদ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের দুইবারের সাধারণ সম্পাদক এবং সদ্য বিদায় নেয়া সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুতে শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করা হবে প্রথমে। এই প্রস্তারের ওপর মরহুমকে নিয়ে আলোচনার পর সংসদের বৈঠক কিছুক্ষণ মুলতবি দেয়া হবে। এরপর রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেবেন।

গত ৩০ ডিসেম্বর ২৯৯ সংসদীয় আসনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর নির্বাচিতরা গত ৩ জানুয়ারি সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে চার ধাপে শপথ নেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী সংবিধান ও কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী প্রথমে নিজে শপথ গ্রহণ করেন এবং শপথ বইয়ে স্বাক্ষর করেন। পরে অন্যদের শপথ বাক্য পাঠ করান। সেদিন অসুস্থতার কারণে আওয়ামী লীগের সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম শপথ নিতে পারেননি। পরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এ ছাড়া বিএনপির ৬ জন ও ঐক্যফ্রন্টের ২ জন শপথ নেননি।

এবারের সংসদে ২৫৭টি আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করা আওয়ামী লীগ সরকারি দলে থাকবে এককভাবে। আর ২২টি আসন পাওয়া জাতীয় পার্টি, ৬টি আসন পাওয়া বিএনপি, ৩টি আসন পাওয়া ওয়ার্কার্স পাটি, বাসদ, ২টি আসন পাওয়া গণফোরাম, ২টি আসন পাওয়া বিকল্প ধারা বাংলাদেশ, ২টি আসন পাওয়া জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), ১টি করে আসন পাওয়া তরিকত ফেডারেশন, জাতীয় পার্টি (জেপি) এবং ৩টি আসনে জয়ী হওয়া স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সবাই বিরোধী দলের আসনে বসবেন।

মানবকণ্ঠ/এএম