অ্যান্টিবায়েটিক মিমক্স ক্যাপসুল শুধু দানাদার পাউডারে প্রস্তুত!

আরোগ্য লাভের জন্য বাজারে থাকা অ্যান্টিবায়েটিক মিমক্স ক্যাপসুল কিনে সাধারণ রোগীরা শুধু প্রতারিতই হচ্ছেন না, রীতিমত স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। এই ক্যাপসুলটি এমোক্সিসিলিন (জেনারিক) গ্রুপের একটি বাণিজ্যিক ওষুধের নাম। কিন্তু ভয়ঙ্কর বিষয় যে, মিমক্স ক্যাপসুলের নমুনা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে এমোক্সিসিলিন শনাক্ত হয়নি। সরকারের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদনের কপি মানবকণ্ঠের হাতে এসেছে। মিমক্স ৫০০ মিলিগ্রামের ক্যাপসুলটির উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে চট্টগ্রামের এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড। নমুনা পরীক্ষার পর সরকারি বিশ্লেষক তার মতামতে উল্লেখ করেছেন, মিমক্সের পরীক্ষিত নমুনায় এমোক্সিসিলিন শনাক্ত হয়নি, যা মান বহির্ভূত। নমুনার বর্ণনায় বলা হয়েছে, ক্যাপসুলের ভেতরে সাদা দানাদার পাউডার পাওয়া যায়। এটির ব্যাচ নম্বর ০১১২১২। নোয়াখালীর ওষুধ প্রশাসন কার্যালয় থেকে নমুনা পাঠানো হয়।

রাজধানীর মহাখালীর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরির প্রতিবেদনের কপির তথ্য অনুযায়ী, মিমক্সের ক্যাপসুলটি একটি বাণিজ্যিক নাম। এটির জেনেরিক নাম হলো এমোক্সিসিলিন বিপি। কিন্তু মিমক্সে এমোক্সিসিলিন বিপি একটুও শনাক্ত না হওয়ায় বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছে। ১০টির ক্যাপসুলে ব্লিস্টারে পরিবেশিত। এর ভেতরে পাউডারের গড় ওজন ৩৯০.২ মিলিগ্রাম।

সরকারী বিশ্লেষক ডাক্তার মো. হারুন-অর-রশীদ তার মতামতে নমুনা পরীক্ষার পর মিমক্সে এমোক্সিসিলিন শনাক্ত হয়নি বলে উল্লেখ করেন। এই ক্যাপসুল মান বহির্ভূত বলে তিনি প্রতিবেদন দেন। ড্রাগ অ্যাক্ট ১৯৪০ এর সেকশন ২৫(১) ও সেকশন ২৬ অনুযায়ী গভর্নমেন্ট অ্যানালিস্ট কর্তৃক ওষুধের নমুনা পরীক্ষা করে বিশ্লেষণের এই সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়।

একই সঙ্গে এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজের ইনডোমেথাসিন ক্যাপসুলে ইনডোমেথাসিন শনাক্ত হলেও দাবির সঙ্গে এর মিল পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ইনডোমেথাসিন ২৫ মিলিগ্রাম/ক্যাপসুল বলা হয়েছে। কিন্তু পরীক্ষায় পাওয়া গেছে ২৪.১১ মিলিগ্রাম ক্যাপসুল। ক্যাপসুলের পাউডারের গড় ওজন ১২৭.৮১৫ মিলিগ্রাম। ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক মো. মাসুদুজ্জামান নেত্রকোনা থেকে নমুনা পাঠান জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে।

সরকারি বিশ্লেষক নমুনা পরীক্ষার পর তার মতামতে উল্লেখ করেছেন, ইনডোমেথাসিনের পরীক্ষিত নমুনাটির দাবির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়, ফলে এ ক্যাপসুলটিও মানবহির্ভূত। ইনডোমেথাসিনের (ব্যাচ নম্বর ৯এইচ১৬) আরো নমুনা সংগ্রহ করা হয় নওগাঁ এলাকা থেকে। ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক মরুময় সরকার ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে এই নমনুা প্রেরণ করেন। এই নমুনায় পাউডারের গড় ওজন মিলেছে ১৩০.৫৪ মিলিগ্রাম। ইনডোমেথাসিনের পরিমান শনাক্ত হয় ২২.৫৯ মিলিগ্রাম/ক্যাপসুল। নমুনার গায়ে দাবি করা আছে ২৫ মিলিগ্রাম। একই ক্যাপসুলে দু’ধরণের তথ্য পাওয়া যায়। এটিও মান বহির্ভূত বলে বিশ্লেষণ করে সনদ প্রদান করেছেন সরকারি বিশ্লেষক।

দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, নিম্নমানের অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন ও বাজারজাতকারী, চোরাই পথে আসা আমদানি নিষিদ্ধ ওষুধ আমদানি এবং বাজারজাতকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ রয়েছে আদালতের পক্ষে। তারা বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা ‘জিএমপি’ (গুড ম্যানুফ্যাকটরি প্র্যাকটিস) অনুসরণ না করে অনেক কোম্পানি নিম্নমানের অ্যান্টিবায়েটিক, স্টোরাইড ও ক্যান্সার প্রতিরোধক ওষুধ উৎপাদন ও বিপণন করছে। এতে জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে। ওষুধের মান ঠিক রাখতে উৎপাদন পদ্ধতি, লোকবল, ফ্যাক্টরির অবস্থান, পদ্ধতি, প্যাকেট, বোয়িংসহ নানা নির্দেশনা রয়েছে জিএমপি নীতিমালায়। এ নীতিমালাটি বাংলাদেশের প্রচলিত আইনেও স্বীকৃত। ফলে জিএমপি লঙ্ঘন করে ওষুধ উৎপাদন সম্ভব নয়।

ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ১৯৮২ এর ১৫ (১) ধারা অনুসারে প্রতিটি ওষুধ উৎপাদনকারী কোম্পানি অবশ্যই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জিএমপি অনুযায়ী ওষুধ উৎপাদন করবে। কিন্তু এলবিয়নসহ অন্তত ২৮টি প্রতিষ্ঠান এ ধরনের নিয়ম ভঙ্গ করছে। এমনকি এলবিয়ন ল্যাবরেটিজ লিমিটেড বিভিন্ন নামকরা প্রতিষ্ঠানের ওষুধের মতোই বাণিজ্যিক নাম দিয়ে ওষুধ উৎপাদন করছে, কিন্তু কোনো নিয়মনীতি মানছে না। এ ছাড়া সবচেয়ে কম দামেও বাজারে ওষুধ ছড়িয়ে দিচ্ছে। তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যা বিভিন্ন সংস্থা এখন খতিয়ে দেখা শুরু করেছে।

মান বহির্ভূত ও নকল ওষুধ তৈরির অপরাধে এর আগে এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের চট্টগ্রামের চাঁদগাঁও কারখানাটি সিলগালা করেছিলেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। পরে সংশ্লিষ্ট দফতরের অনুমতি পাওয়ার পর কারখানার স্থান পরিবর্তন করে সীতাকুণ্ডে নতুন করে কারখানা স্থাপন করেছে এলবিয়ন। আর সেখানে মানহীন ওষুধ তৈরি হচ্ছে। এ প্রতিষ্ঠানের মালিকের নাম নিজাম উদ্দিন। তার ও অন্যান্য পরিচালকের ওপর সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের নজরদারি আছে। দায়িত্বশীল সূত্র এ তথ্য জানায়। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কারখানায় যে কোনো সময় অভিযান চালাতে পারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. রইসুল উদ্দিন মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের পণ্যই অন্যরা নকল করেছিল। এ বিষয়ে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। বিষয়টি ওষুধ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা অবগত আছেন।’

এদিকে এলবিয়ন একই জায়গায় মানুষ ও গবাদিপশুর ওষুধ উৎপাদন করছে বলে জানিয়েছেন নজরদারি করা একটি সংস্থা। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে বলেও জানা গেছে।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.