অস্ত্রহীন বিশ্বযুদ্ধ শুরু আজ

ফিফা বিশ্বকাপ। বহু প্রত্যাশার এক আসর। চার বছর পর পর ফিফার সবচেয়ে বড় ওই মঞ্চে শুরু হয় ফুটবলের মহারণ। চলে অস্ত্রহীন যুদ্ধ। যেখানে নেই কোনো সহিংসতা; দেখা মেলে পায়ের ছন্দে জাদুর খেলা। সবটাই একটি মাত্র খেতাবের জন্য। সংখ্যাটা ‘এক’ হলেও সেই একটিই কিন্তু অনেক বেশি। কেননা, ওটা যে বিশ্বকাপের শিরোপা। এক কথায়, ফুটবল বিশ্বে ‘সোনার হরিণ’। ওই সোনার হরিণ জয়ের মঞ্চ আজ উন্মোচন হচ্ছে রাশিয়ায়। তাই আপাতত ফুটবল অঙ্গনে প্রশ্নটাও একই, সোনার হরিণ হবে কার?

এ প্রশ্নের উত্তর পেতে অপেক্ষায় থাকতে হবে আজ থেকে ঠিক ৩২তম দিন পর্যন্ত। ওই দিন বিশ্বকাপের ৬৪তম ম্যাচে মুখোমুখি হবে দুই ফাইনালিস্ট। অর্থাৎ ফাইনাল ম্যাচ। যে ম্যাচ সমাপ্ত হওয়ার পরই খুঁজে পাওয়া যাবে সোনার হরিণ জয়ী দলকে। তার আগে তো থাকছেই ফুটবল ধামাকা। যে ধামাকায় কেঁপে ওঠবে রাশিয়ার ১১টি শহর। ফুটবল রঙে রঙিন হয়ে ওঠবে স্বাগতিকদের ১২ ভেন্যু। আর তাতে রং ছড়াতে থাকছে বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব টপকে আসা সেরা ৩২ দল। সবমিলে, ফুটবলারদের মিলনমেলায় আরেকটি জমজমাট আসর দেখার অপেক্ষাতেই ফুটবল বিশ্ব।

কিন্তু সেই অপেক্ষার প্রহর সইছে না কারো! কেননা, সবাই যে আদা-জল খেয়ে নেমেছে আজ থেকে শুরু হতে চলা বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎ চ্যাম্পিয়ন দলকে খুঁজতে। নিজ নিজ বিশ্লেষণ শেষে একেক জন এগিয়ে রাখছে ভিন্ন ভিন্ন দলকে। তবে আসুন না, চ্যাম্পিয়ন দলকে বিশ্লেষণটা হোক শেষ থেকেই। শেষ কোথায়? অবশ্যই ব্রাজিল বিশ্বকাপ। যেখানে শেষ হাসিটা ছিল জার্মানদের মুখে। সেই জার্মানিই কিন্তু রাশিয়াতেও ‘হট’ ফেভারিট। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা এবার ছিনিয়ে নেবে ‘ডাবল’ শিরোপার স্বাদ- এমনটাই স্বপ্ন সাজিয়েছেন কোচ জোয়াকিম লো।

ব্রাজিল বিশ্বকাপের আরেকটু পেছনে তাকালেই দেখা যাবে ‘আশাহত’ আর্জেন্টিনাকে! আশাহত তো বটে। ২০১৪ সালে অতিরিক্ত সময়ে গোল খেয়ে রানার্সআপ হয়েই তুষ্ট থাকতে হয়েছে লিওনেল মেসিদের। সেই মেসিবাহিনী এবার আরো শক্ত-অভিজ্ঞ। বলা যায়, দেশটির বিশ্বকাপ ইতিহাসে এবারই সবচেয়ে বেশি ভালো দক্ষ দল পেয়েছে দু’বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। মেসি ছাড়াও কোচ হোর্হে সাম্পাওলি পেয়েছেন ডি মারিয়া, গঞ্জালো হিগুয়েন, সার্জিও আগুয়েরোদের মতো বিশ্ব’খ্যাত তারকাদের। তাই ধারণা করা হচ্ছে, বার্সেলোনার মহানায়ক মেসির শূন্যহাত রাশিয়ায় ভরিয়ে দেয়ার ভালো সুযোগই রয়েছে সাম্পাওলি এবং তার শিষ্যদের।

পেছন থেকে হিসাব মেলাতে গেলে এবার একটু খটকা লাগবেই। কেননা, ব্রাজিল বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থানে হল্যান্ডকে পাওয়া যাচ্ছে না আসন্ন বিশ্বকাপের খেলা দলগুলোর মাঝে। হবেই বা কি করে? গত বিশ্বকাপে চমক দেখানো রোবেনরা তো এবার টপকাতে পারেনি বাছাইপর্বের বাধা। তবে ডাচদের কাছে হেরে ফিফার গত আসরে চতুর্থ স্থানে থাকা স্বাগতিক দল ব্রাজিলের কিন্তু রাশিয়া বিশ্বকাপ ঘিরে প্রত্যাশাটা আকাশচুম্বী। গেলবারের হতাশাটা এবার কড়ায়-গণ্ডায় পুষিয়ে নিতে চায় তিতের শিষ্যরা। আর ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে দামি তারকা নেইমারও মুখিয়ে স্বপ্নবাজ ব্রাজিলের ‘হেক্সার’ (বিশ্বকাপের ষষ্ঠ শিরোপা জয়) স্বপ্ন পূরণ করতে।

স্বপ্নটা কম নয় ফ্রান্সেরও। গত আসরে জার্মানির কাছে হেরে (১-০) গোলে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেয়া দলটি আসন্ন আসরে মাঠে নামবে তারকায় ভরপুর মূল একাদশ নিয়েই। কারণ আর্জেন্টিনার ন্যায় তাদের বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে শক্ত এবং দক্ষ দল পেয়েছে জিনেদিন জিদানের উত্তরসূরীরা। দিদিয়ের দেশমের ২৩ সদস্যের চূড়ান্ত স্কোয়াডে রয়েছেন পল পগবা, অলিভিয়ের জিরু, আতোয়ান গ্রিজম্যান, কিলিয়ান এমবাপে, স্যামুয়েল উমতিতি এবং রাফায়েল ভারানের মতো বাঘা বাঘা সব তারকা ফুটবলার। এসব তারকারা মাঠে নিজেদের সেরাটা দিতে পারলে যে কোনো প্রতিপক্ষের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়াবে দেশমের শিষ্যরা।

ভুলে গেলে চলবে না স্পেনের নাম? ২০১০ বিশ্বকাপ জয়ীরা এবার মাঠে নামবে প্রতিশোধ নেয়ার লক্ষ্যতেই। কারণ দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশ্বকাপের শিরোপায় চুমু আঁকা দলটি যে পরের বিশ্বকাপে ছিটকে গেছে গ্রুপ পর্ব থেকেই। সেই শোধ নিতে রাশিয়াকেই বেছে নিয়েছে স্প্যানিশরা। আর খেলোয়াড়দের সামর্থ্যরে বিবেচনায় ফুটবল বিজ্ঞরাও তাদের রেখেছে ফেভারিটদের কাতারে। কারণ সম্প্রতি শেষ হওয়ার মৌসুমে ঘরোয়া প্রতিযোগিতা লা লিগায় তুখোড় ফর্মে ছিলেন স্পেনের তারকা- ইসকো, মার্কিও আসেনসিও, লুকাস ভাসকেস, আইয়াগো আসপাস, রদ্রিগো এবং ডিয়েগো কস্তারা। তবে শেষ সময়ে অন্ধকার নেমে এসেছে স্প্যানিশ শিবিরে। রিয়াল মাদ্রিদের প্রধান কোচের দায়িত্ব নেয়ায় তাদের কোচ জুলেন লোপেটেগুইকে স্পেনের প্রধান কোচের পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে দেশটির ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। পুরো ঘটনাই ঘটে গেছে রাশিয়া বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার একদিন পূর্বে।

স্পেনের ঠিক উল্টো পথে পর্তুগাল। স্প্যানিশ শিবিরে সমস্যা উঁকি দিলেও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দল এগিয়ে যাচ্ছে দেশটির ফুটবল কর্মকর্তাদের ভালোবাসায়। যদিও রাশিয়ায় ফেভারিটদের তালিকায় নেই তারা। কারণ এক রোনালদো ছাড়া যে আর কোনো বড় তারকাই নেই ২০১৬ ইউরো জয়ীদের দলে। তাতে অবশ্য ফার্নান্দো সান্তোসের দলকে নেয়া যাবে না হালকাভাবে। কেননা, এক পর্তুগিজ যুবরাজই কিন্তু যথেষ্ট ১১ সদস্যের একটি দলকে নাকানিচুবানি খাওয়াতে। যেমনটা হয়েছিল গত ইউরোতে। ফেভারিট না হয়েও ওই মঞ্চে শিরোপায় চুমু এঁকেছিল পর্তুগাল। সেটা এক রিয়াল মাদ্রিদের সুপারস্টার রোনালদোর কাঁধে ভর করেই। তাই সেরকম আরেকটি চমক দেখানোর অপেক্ষাতে সান্তোসের শিষ্যরা। ছুটবে ‘সোনার হরিণ’খ্যাত বিশ্বকাপের শিরোপা জয়ের পথেই।

পর্তুগালের ন্যায় অবস্থা মিসরের। দলটি নেই বিশ্বকাপের সেরা দলগুলোর মাঝে। এক তারকাতেই ভরসা আরব দেশের দলটির। হেক্টর কুপারের শিষ্যদের সব স্বপ্নই ‘মোহাম্মদ সালাহকে’ ঘিরে। গেল মৌসুমে লিভারপুলকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে তোলা মিসরীয় জাদুকরের ওপর নির্ভরশীল দেশটির জাতীয় ফুটবল দল। যদিও ওই ফাইনালে চোট পেয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে উরুগুয়ের বিপক্ষে খেলা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তায় সালাহ। তবে তাদের কোচ কুপারের বিশ্বাস, অল্প সময়ের জন্য হলেও প্রথম ম্যাচে ‘টেলস্টারে’ পায়ের জাদু দেখাতে পারবেন সালাহ। পারবেন দলের স্বপ্ন একধাপ এগিয়ে নিতে।

এতক্ষণ গেল রাশিয়া জয় করতে পারে এমন সম্ভাবনাময় দলগুলোর আলোচনা। তবে ৯০ মিনিটের ফুটবল খেলায় এসব হিসেব-নিকেশ দেখিয়ে পিছিয়ে রাখা যাবে না কোনো দলকে। কারণ ৩২ দলই কিন্তু পেরিয়ে এসেছে বাছাইপর্বের কঠিন বাধা। তাই রাশিয়ার মাটিতে চমক দেখাতেই পারে লুইস সুয়ারেজের উরুগুয়ে, লুকাকুর বেলজিয়াম, গ্যারেথ সাউথগেটের ইংল্যান্ড। ফুটবলের বিশ্ব দরবারে নিজেদের মেলে কৃপণতা করবে না স্বাগতিক রাশিয়া, সুইজারল্যান্ড, কলম্বিয়া, পেরু, ডেনর্মাক, ক্রোয়েশিয়া, নাইজেরিয়ার তারকা খেলোয়াড়রাও। রাশিয়ায় নজর থাকবে বিশ্বকাপে প্রথবমারের মতো খেলা পানামা এবং আইসল্যান্ডের দিকে। এ যাবতকাল পর্যন্ত বিশ্বকাপ খেলা দলগুলোর ভেতর জনসংখ্যায় (৩৩২৫২৯) সব থেকে ক্ষুদ্রতম দেশ আইসল্যান্ডের রাশিয়ার টিকিট পেয়েই পূরণ হয়েছে অনেক বড় স্বপ্ন। একই আনন্দে আনন্দিত পানামাও। তাই অনেকটা নির্ভার হয়েই রাশিয়ায় খেলবে দল দুটি।

সবমিলে, রাশিয়ায় সোনার হরিণ জয়ী ভবিষ্যৎ দল খুঁজতে গেলে শেষ হবে না বিশ্লেষণের। যার ফলাফল থেকে যাবে ‘শূন্য’। তাই আপাতত একটুকুই বলা যায়, রাশিয়ায় ২০১৮ ফিফা বিশ্বকাপে ডাচরা না থাকলেও ‘হল্যান্ড’ হয়ে উঠতে পারে যে কোনো দলই!

মানবকণ্ঠ/এএএম