অস্তিত্বে জলতরঙ্গ: অন্বেষণের সত্তা, সত্তার অন্বেষণ

অস্তিত্বে জলতরঙ্গ: অন্বেষণের সত্তা, সত্তার অন্বেষণ

যে কোনো লেখাকে কোনোভাবে টেক্সট বলা যায় না। লিখলেই যেমন ’কেউ কবি হয় না’। কবিতা কিংবা সাহিত্যের অন্য মাধ্যম হোক আন্তঃসম্পর্কের চিহ্নায়নের মধ্য দিয়ে যে অস্তিত্ব জটিল বাস্তবতা সৃষ্টি করে তা সম্পর্ক স্থাপনের অভিজ্ঞান, যা সত্য ও ছায়া সত্যের মধ্যে মিথষ্ক্রিয়া ঘটায়। কবিতা জ্ঞানের নয়, অস্তিত্বের অভিজ্ঞান। কবিতা সেখানে ভাষা পরাবিবরণের, ইশারার ও দ্যুতিময়তার, যেখানে চিহ্নবিশ্ব নিত্য পাঠভেদে ভিন্নার্থ নিয়ে উন্মোচিত হয়। এ প্রসঙ্গে সক্রেটিসকে স্মরণ করা যায়। তার একটি উক্তি এখনো গতিশীল ও ইস্পাতস্ফুলিঙ্গময়। অতি ব্যবহৃত হলেও বেশ ওজনদার, হীরেখণ্ড। তা হলো, ‘নিজেকে জানো।’ খ্রিস্টের জন্মের পূর্বে বলা কথাটি এখনো ওজন হারায়নি, বরং যাপনের সর্বত্র দীপ্যমান অনির্বাণের মতো প্রোজ্জ্বল, বাতিঘর। এর অন্বেষণ পরিচালিত করে একজন কবি (এখানে কবি অর্থে শিল্পের সব মাধ্যম সম্পৃক্তদের বোঝানো হয়েছে।)

আত্মাভিজ্ঞানের দিকে, যার ব্যত্যয় একজন কবিকে ‘অপর’ হিসেবে চিরনির্দিষ্ট করে এবং একই সঙ্গে সংকোচনের পাশাপাশি অর্জিত চিন্তার বিচ্ছুরণকে নেতিবাচকভাবে বিস্তৃত করে কবির মননবিশ্ব ও তার যথাপ্রাপ্ত স্থানিকতার ইতিবাচকতা। ফলে, প্রতিবেদন কাঠামোর আবহে যাবতীয় সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞান মুছে যেতে থাকে এবং সামাজিকায়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একজন কবি তার নির্মাণের ঐক্যের আন্তঃসম্পর্কের বুনন সম্বন্ধে গড়ে তোলেন নতুন চিহ্নবিশ্ব। আর এর মধ্য দিয়ে পরাগায়ন ঘটে মানুষ ও জগতের বৈচিত্র্যে স্বতঃস্ফূর্ত পরাব্যাপ্তি, অবাস্তব হয়ে ওঠে ভাষাপৃথিবীর অভিঘাতগুলো এবং আত্তীকৃত অভিঘাতের কাছে কবির নিজস্ব সামগ্রিক যাপন প্রক্রিয়া, যেমন- রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উপনিবেশের বীক্ষা, নতুন অভিজ্ঞতায় অবগুণ্ঠিত হয়। চিন্তার অচলায়তন ভেঙে চেতনার সামগ্রিকতার রূপ হয়ে ওঠে নৈর্ব্যক্তিক ভাষায় অনন্ত পরিসর। এ নির্মাণ কেবল সৃষ্টির আনন্দেই গ্রন্থিত সব চেনা পৃথিবীর সঙ্গে কবিকে, তার পরিবেষ্টিত মানুষ ও জগতের বৈচিত্র্যের সঙ্গে আত্মীয়তার সেতুবন্ধন তৈরি হওয়ার আনন্দেই তার অস্তিত্বের অববাহিকতায় নিরন্তর ভাঙচুর হতে থাকে। কিন্তু কিসের আনন্দে এ দ্বিবাচনিক ব্যাপ্তি, যে ব্যাপ্তি বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনায় তার দ্যোতক ও দ্যোতিতের ক্রিয়া-বিক্রিয়ায় ব্যাপকতা স্পষ্ট করে। তার অখণ্ডতা (Synecdoche) নির্দেশ করে টেক্সটকে জাগিয়ে তোলে কাব্যশিল্পের অনুসন্ধিৎসার বিমোচনে বহুমাত্রিক মেটাফর। তবে জীবন-জীবিকার অন্বেষণে এবং ক্রমশ কঠিন হয়ে আসা জীবনসংগ্রামে কম-বেশি মেজাজ হয়ে ওঠে লড়িয়ে, স্বার্থবোধ তীক্ষ্ণ থেকে তীক্ষ্ণতর হতে থাকে, চিন্তা-চেতনা-ভাবনা-বেদনা হয় একান্ত আত্মকেন্দ্রিক। এ আত্মমগ্নতার অন্য পিঠ হচ্ছে বিচ্ছিন্নতাবোধ, যা কিছুটা স্বেচ্ছাবলম্বিত মানসিক মুখোশ। কোথাও স্বেচ্ছায়, কোথাও বা রাষ্ট্র ঈশ্বরদের আদেশে।

জবরদস্তি, বলপ্রয়োগী আদেশ অবশ্য নিন্দনীয়, নেতিবাচক এবং শেষ পর্যন্ত অফলপ্রসূ। কিন্তু স্বেচ্ছায় ও সোৎসাহে যদি সাহিত্যিকরা তাদের বহু যত্নে-গড়া এ শক্তিমাধ্যমকে শ্রেণিযুদ্ধ ও সমাজ গঠনের মোক্ষম অস্ত্ররূপে ব্যবহার করে তাতে দোষের বা নিন্দার কিছু নেই। মহৎ কাজের মহান অস্ত্র হওয়ায় সাহিত্যের অগৌরব হয় না। অগৌরব হয় তখনই যখন এসব সাহিত্যিক নামধারী কিংবা তাদের সারথি রাজনৈতিক নেতা আদেশ জারি করে-শুধু এটাই সৎ সাহিত্য, রাষ্ট্রিকযত্নে ও সমাদরে লালনীয় সাহিত্য; বাদবাকি সব লেখাই অসৎ, বুর্জোয়া, ফ্যাসিস্ট, ঝুট সব হে ইত্যাদি স্লোগান সর্বস্ব; তাই শুধু নিন্দনীয় নয়, কঠোর হাতে দমনীয়। শ্রেণিস্তরের সঙ্গে সাহিত্যের দৃষ্টিভঙ্গি সমান্তরাল থাকার কারণে তার উদ্ভব অস্বীকার করার কারণ নেই। সমান্তরালের মনোপলি দৃষ্টি ভেঙে পরিপূরকতার বাইনোকুলার স্বরের মধ্যে এটি উপ্ত।

বিশুদ্ধ বিজ্ঞান এমন কি তার বিশুদ্ধতম শাখা বিশুদ্ধ গণিত, কোথাও অবদমিত হয়েছে বলে কখনো শোনা যায়নি। এর মূল কারণ অবশ্য এই যে, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ ও ফলিত বিজ্ঞানের মধ্যবর্তী সীমারেখা স্থির নয়, সদা চলনশীল. কখনো বা গতিশীল। আজো যেটা বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের অন্তর্গত, অর্থাৎ জ্ঞানপিপাসা মেটানো ছাড়া মানুষের আর অন্য কোনো কাজে লাগছে না, তার ফলে ফলিত হয়ে কোনো ভয়াবহ আয়ুধ, মৃতসঞ্জীবনী কিংবা নিছক বিলাসদ্রব্য উৎপাদনের কাজে লেগে যাবে কিনা

কবি শব্দের মাধ্যমে ভালোবাসা-বেদনায় দগ্ধ শব্দনির্মাতা, কবি, কথাশিল্পী এবং মহাকাব্যিক ও নাট্যকারদের বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ শিল্পের সব মাধ্যমকে চিহ্নিত করা এ শব্দের দ্বারা ধরে নিতে পারি। জ্ঞানী এবং কবি, দু’জনই এক অনেকান্ত জগতের ত্রিকৌণিক কিন্তু অভিন্নরূপে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ, বিভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে বাইনোকুলারের সত্যোপল চোখে অবলোকন করে থাকে। স্বকীয় চিত্তের ঈষৎবর্জিত মুকুলে প্রতিবিম্বিত করে। একজন বুদ্ধি ও যুক্তি-তর্ক দিয়ে বুঝতে চায় তার যতটা বোধগম্য, ততটা সুশৃঙ্খলিত ও নিয়মানুগ। এ বোধগম্য রূপই সত্য বলে চিহ্নিত। অন্যজন হৃদয় ও উপলব্ধি দিয়ে পঞ্চ ইন্দ্রিয়ানুভবের মধ্যে জগতের বৈচিত্র্য, বিশ্বভূবন ও মানুষকে পেতে চায়; তুলির কৌশলী আঁচড় ও রঙের প্রদীপ্ত ব্যঞ্জনায় বিভিন্ন রৈখিক মাত্রায় রূপায়িত করে। উপলব্ধি অর্থে এখানে প্রখর সূক্ষ্ম সমাজ সচেতনতাকে বুঝানো হয়েছে। এ অনুভূত রূপ সুন্দর বলে আখ্যায়িত। যে বুদ্ধির কাজ অর্থাৎ জ্ঞানান্বেষণ কখনই অনুভূতিবর্জিত নয় এবং অনুভূতির প্রকাশ অর্থাৎ বিশুদ্ধ কাব্য কখনো বুদ্ধি ও বুদ্ধিগ্রাহ্যজ্ঞানের স্পর্শ এড়াতে পারে না। তবে মাত্রার তারতম্য নিয়ে কথা, এ তারতম্য বেশি হলে মাত্রাভেদে গুণভেদে পরিণত হয়, অন্তত প্রতিভাত হয়ে ওঠে। এখানে ‘সুন্দর’ কথাটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। তার মধ্যে নয়-ছয়ভাবে বিক্ষিপ্ত, অনেকটা সীমিত কুৎসিতের স্থান আছে। সব খণ্ড-খণ্ড সুন্দরের ইঙ্গিত তাৎপর্যবহ ব্যঞ্জনায় গ্রন্থিত হয়; সব খণ্ড সত্যের মধ্যে এ পরম সত্যের কুৎসিতের আভাস। প্রথমটি প্রতিফলিত হয় আমাদের কবিতায়-সাহিত্যে আর দ্বিতীয়টি দর্শনে-বিজ্ঞানে। বরং এ প্রতিবিম্বিত আত্মীয়তা আরও কাছের করোটি-শিরায় প্রোথিত, প্রবহমান।

সাম্প্রতিক অনেক তরুণের রচনায়ও এ প্রবণতা লক্ষযোগ্য। তবে শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, আল মাহমুদ, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, আজীজুল হক, সৈয়দ শামসুল হক, ওমর আলী, বেলাল চৌধুরী, আবুল হাসান, আবদুল মান্নান সৈয়দ, সিকদার অমিনুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী, মোহাম্মদ রফিক, মাহবুব সাদিক, সমুদ্র গুপ্ত; এবং ছোটগল্পে ও কথাসাহিত্যে আবু ইসহাক, শওকত ওসমান, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শওকত আলী, মাহমুদুল হক, রশীদ করীম, সেলিনা হোসেন, কায়েস আহমদ, নাসরীন জাহান, মামুন হুসাইন, নাজিম ওয়াদুদ প্রমুখের উল্লেখিত রচনা, প্রকৃতঅর্থে, সৃষ্টির মোচড় অর্থাৎ স্বাক্ষর মেলে, যা একদিকে গভীর ও সুদূর ব্যাপ্তিতে গ্রন্থিত করে, পাশাপাশি শৈল্পিক মূর্চনার মাধ্যমে সামাজিকায়ন প্রক্রিয়াকেও প্রকাশ করে। সমকালীন ও আগামী পাঠকের কাছে উল্লেখিত শব্দশ্রমিকদের রচনার প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচিত হওয়া জরুরি। তার স্বরূপ অন্বেষণ করার মধ্যে দিয়ে আমাদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের বিকাশকে ব্যাপ্তিত ও সম্প্রসারিত করে নিতে পারা যায়।

মানবকণ্ঠ/এসএস