অশুভ প্রতিযোগিতায় মৃত্যুর মিছিল হলো পাহাড়ে

রাঙ্গামাটিতে মোট নিহত ১১৪, বাঙালি ৫৯, পাহাড়ি ৫৫ জন

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধসযুগ যুগ ধরে যে পাহাড়ে জুমচাষ করার কথা ভাবতাম- সেই পাহাড়ে বসত করার কথা ভাবেনি পাহাড়ের আদিবাসীরা। কিন্তু যখন ঝাঁকে ঝাঁকে বহিরাগত লোক এসে ওই পাহাড়টি দখল শুরু করে। আর সরকার যখন ওই অবৈধ দখলদারদের বাড়িতে বিদ্যুৎ, পানি, সড়কের ব্যবস্থা করে দেয় তখন আদিবাসীরা আফসোস করে- আমরা কেন বসতি করলাম না? এ আফসোস থেকে এই অবৈধ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় পাহাড়িরা। আর এই প্রতিযোগিতাই যেন কাল হলো।

প্রকৃতি নিষ্ঠুর হয়ে মাটিচাপা দিয়ে কেড়ে নিল শত মানুষের প্রাণ। এমনটি হয়েছে মঙ্গলবার রাঙ্গামাটিতে পাহাড়ধসের ঘটনায়।

অতীতের পাহাড়ধসে পাহাড়িরা মারা না গেলেও এবার মারা গেছে অর্ধেকের বেশি। এখানে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা মিলে পাহাড়ির মৃতের সংখ্যা ২০ শিশুসহ ৫৫ জন। মারা যাওয়াদের মধ্যে অধিকাংশ চাকমা সম্প্রদায়ের। বাঙালি মারা গেছেন ৯ শিশুসহ ৫৯ জন। রোববারের তথ্যমতে রাঙ্গামাটিতে পাহাড়ধসে মারা গেছেন ১১৪ জন।

রাঙ্গামাটি শহরের সবচেয়ে বেশি মারা গেছে ভেদভেদী, শিমুলতলি, রাঙাপানি, যুব উন্নয়ন এলাকা, সাপছড়ি এলাকায়। এসব এলাকায় পাহাড়ধস হয়েছে ব্যাপক।

রাঙ্গামাটি শহরের প্রবেশমুখে শিমুলতলি এলাকায় গত ১০ বছর আগে বাংলাদেশ টেলিভিশন কেন্দ্র, বেতারকেন্দ্র ভবন ছাড়া কোনো বসতি ছিল না। কিন্তু গত কয়েক বছরের মধ্যে এলাকা দ্রুত অবৈধ দখলে চলে যায়। টেলিভিশন ভবন কর্তৃপক্ষ জেলা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিলেও কাজ হয়নি। দ্রুত বেড়ে যায় অবৈধ বসতি। পৌরসভা, বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ এসব অবৈধতার স্বীকৃতি দিয়ে এসব এলাকায় দেয় সড়ক, বিদ্যুৎ এবং পানি। এতে উৎসাহিত হয়ে দ্রুত বেড়ে যায় অবৈধ বসতি। পরিত্যক্ত ভূমির দামও দ্রুত বেড়ে যায় সেখানে। সম্প্রতি সবচেয়ে বেশি পাহাড়ধস হয় শিমুলতলি এলাকায়। এখানে প্রতিটি পাহাড় ও পাহাড়ের উপত্যকা এখন ধ্বংসস্তূপ। এসব পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে সব বসতি এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়েছে।

রাঙ্গামাটি

গণপূর্ত বিভাগ বলছে, এসব এলাকায় এখন পুনরায় বসতি যাওয়া মানে শতভাগ মৃত্যুর মুখে চলে যাওয়া। সেখানে বসতি করার আর পরিবেশ নেই।

পরিবেশকর্মী ললিত সি চাকমা বলেন, আগে পাহাড়িরা এভাবে পাহাড়ধসে মারা যায় তার উদাহরণ খুব একটা নেই। কিন্তু এখন অশুভ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার কারণে এবার তারা মারা পড়েছেন।

তিনি বলেন, পাহাড়িরাা চিন্তা করছেন আমার চোখে দেখা পাহাড়ে অন্যরা সুন্দর বাড়ি করেছে। অথচ আমিও তো করতে পারতাম কিন্তু করিনি। তারা করলে আমি কেন পারব না? এই প্রবণতা থেকে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।

পাহাড়ে বসতবাড়ি নির্মাণে পাহাড়িদের মধ্যে মূল্যবোধ প্রথা আছে যে, দুই ঝিরি বা তিন ঝিরির মুখোমুখি স্থানে বাড়ি নির্মাণ করা অশুভ। পাহাড়ের উপত্যকায় বাড়িঘর নির্মাণ অশুভ। এগুলো বুড়োবুড়িরা বলতেন। এগুলোর বিজ্ঞানভিত্তিক কোনো গবেষণা না থাকলেও এসব দুর্যোগ প্রমাণ করেছে বুড়োবুড়িদের বলে যাওয়া কথার যথার্থতা আছে। কিন্তু অশুভ প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে বুড়োবুড়িদের কথা ভুলে যাওয়া হয়েছে, ফলে এত বড় দুর্যোগ হলো।

সরকার বা প্রশাসন অবৈধ স্থাপনায় সড়ক, বিদ্যুৎ, পানি দিয়ে এক প্রকার অবৈধ দখলে উৎসাহিত করলে এ মৃত্যুর মিছিল কমবে না বরং বাড়বে। প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় বলেন, পাহাড়ে ‘আদিবাসীরা’ প্রকৃতিকে ঠিক রেখে জুমচাষ করে। প্রকৃতির কথা বিবেচনা করে তারা তাদের বাড়িঘর নির্মাণ করে। কিন্তু পার্বত্যাঞ্চলে সম্প্রতি সমতল অঞ্চলের মতো পাহাড় কেটে বাড়ি নির্মাণের প্রবণতা বেড়ে গেছে। যার কারণে এবার বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে, যা আগে কখনো হয়নি। পাহাড়কে নিয়ে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা ভাবার সময় এসেছে। এখানে যত্রতত্র বাড়ি নির্মাণ করা যাবে না।

রাঙ্গামাটি গণপূর্ত নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর উদ্দিন আহমদ বলেন, পাহাড়কে নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। এখান থেকে শিক্ষা নিতে হবে। এবারের পাহাড়ধসে রাঙ্গামাটির শহরে সরকারি অনেকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঝুঁকিপূর্ণ হয়েছে। বেসরকারি তো আছেই।

যেসব এলাকায় পাহাড়ধস হয়েছে সেখানে আর কোনোভাবে বসতি স্থাপন করা যাবে না। পরিবেশও নেই। পাহাড়ধসে অনেকে এলাকায় ভূমির সীমানাও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। মৃত্যু ঠেকাতে যারা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি করতে যাবে, তা জোর করে হলেও রোধ করতে হবে। সেসব এলাকায় পাহাড়ধস হয়েছে- সেসব এলাকার মাটি ভালোভাবে বসেনি। ফলে ফাটলের অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ করবে। এতে করে বৃষ্টি হলেও আবার পাহাড়ধস হবে। এটি গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক- জেলা প্রশাসন: গতকাল রোববার সকাল সাড়ে ১১টায় জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে ব্যবসায়ী ও সাংবাদিকদের নিয়ে মতবিনিময় সভায় জেলা প্রশাসক মানজারুল মান্নান বলেন, রাঙ্গামাটির বর্তমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। দ্রব্যমূল্যের দাম স্বাভাবিক। দু-একটি মিডিয়া ঘটনাস্থলে না এসে মনগড়া প্রতিবেদন তৈরি করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, তা ঠিক নয়।
চট্টগ্রাম থেকে কাপ্তাই সড়কপথে এবং কাপ্তাই থেকে রাঙ্গমাটি পর্যন্ত নৌপথে মালামাল আনা হচ্ছে। মালবাহী লঞ্চগুলোর মাধ্যমে যে কোনো ব্যবসায়ী মালামাল রাঙ্গমাটিতে আনতে পারবে। তাদের কাছ থেকে কোনো ভাড়া নেয়া হবে না। এ সময় ব্যবসায়ীরাও বলেন, বাজারের পরিস্থিতি স্বাভাবিক। দুর্যোগ শুরুর পর আতঙ্কে মানুষ অতিরিক্ত মাল মজুত করতে গিয়ে বাজারে দ্রব্যমূল্যের সংকট দেখা দেয়। এখন সেই পরিস্থিতি নেই। বাজারে প্রতিনিয়ত প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ বাজার মনিটরিং টিম কাজ করছে।

ত্রাণ কার্যক্রম বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণের তালিকা আগামীকাল (আজ সোমবার) প্রস্তুত হবে। বর্তমানে ত্রাণের কোনো ঘাটতি নেই। আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়া ক্ষতিগ্রস্তদের পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবির সদস্যরা খাদ্য সরবরাহ করছে। মোট ১৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে এ কার্যক্রম চলছে।

পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুত আছে প্রশাসনের কাছে। পৌর কাউন্সিলরদের সমন্বয়ে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ৫শ’ বান্ডেল ঢেউটিন আগামীকাল (আজ সোমবার) রাঙ্গামাটিতে পৌঁছবে।
যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়নি: রাঙ্গামাটির সঙ্গে চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগ গতকাল পর্যন্ত স্বাভাবিক হয়নি। দিনভর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হওয়ায় সড়ক সংস্কারের কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। খাগড়াছড়ির সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী আবু মুছা বলেন, চট্টগ্রাম থেকে সাপছড়ির শালবাগান, শালবাগান থেকে রাঙ্গামাটি পর্যন্ত যান চলাচল করছে। শালবাগান এলাকায় সড়কটি সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাওয়ায় বিকল্প সড়ক বানাতে হবে। এতে সময় ও অনেক অর্থ লাগবে।

বন্ধ আছে মোবাইল থ্রিজি সেবা: রাঙ্গামাটি শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও মঙ্গলবার পাহাড়ধসের ঘটনার পর মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে মোবাইল সেবা। কোনো মোবাইল অপারেটরের থ্রিজি সেবা কাজ করছে না। এতে ব্যাহত হচ্ছে ব্যাংকিংসহ অন্যান্য সেবা। নেটওয়ার্ক আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকায় দুর্ভোগে পড়েছেন মিডিয়া কর্মীরা।

উল্লেখ্য, মঙ্গলবার সকালে রাঙ্গামাটি জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসে ৪ সেনা সদস্যসহ ১১৪ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে রাঙ্গামাটি শহর এলাকায় মারা যান ৬৬ জন, কাউখালী উপজেলায় ২৩ জন, কাপ্তাই উপজেলায় ১৮ জন, বিলাইছড়িতে ৩ জন এবং জুরাছড়ি উপজেলায় মারা গেছেন ৪ জন। নিহত সেনাবাহিনীর সদস্যরা হলেন মেজর মাহফুজ, ক্যাপ্টেন তানভীর, ল্যান্স কর্পোরাল আজিজুল এবং সিপাহি শাহিন।

মানবকণ্ঠ/আরএ

Leave a Reply

Your email address will not be published.