অর্থবছরের শুরুতেই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা

চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের শুরুতেই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে মোট ৭ হাজার ৩৫২ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪৯ শতাংশ বেশি।

চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার সময় সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। নতুন অর্থবছরের শুরু থেকে একাধিকবার তিনি এ বিষয়ে কথা বলেছিলেন। তবে এখনো তা কমানো হয়নি। আগামী নির্বাচনের আগে সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানো হবে না বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। সুদহার কমানো হলে সাধারণ সঞ্চয়কারীদের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে, এমন ভাবনা থেকেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সুহদার না কমলেও সঞ্চয়পত্র ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ মুদ্রানীতি ঘোষণাকালে গভর্নর ফজলে কবির মুদ্রানীতি বাস্তবায়নে সঞ্চয়পত্রের উচ্চ সুদকে অন্যতম ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ তাদের বিভিন্ন পর্যালোচনায়ও সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর পক্ষে মতামত দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান মনে করে, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা রক্ষায় সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানো উচিত। কেননা বর্তমানে ব্যাংক আমানতের সুদহার গড়ে ৩ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। সেখানে সঞ্চয়পত্রের সুদহার ১১ শতাংশের বেশি।

সুদহার তুলনামূলক বেশি থাকার কারণে সঞ্চয়পত্র বিক্রি এমনিতেই বাড়ছিল। তবে অর্থমন্ত্রীর ঘোষণার পর সারাদেশে সঞ্চয়পত্র বিক্রির হিড়িক পড়ে। চাপ এত বেশি ছিল যে, অনেক শাখায় সঞ্চয়পত্রের সংকট দেখা দেয়। গত অর্থবছরে এ খাত থেকে নিট ৫২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে সরকারের ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংক আমানতের সুদহার কম থাকায় এবং পুঁজিবাজারে পুরোপুরি আস্থা ফিরে না আসায় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। বর্তমানে ব্যাংকে মেয়াদি আমানতে ৩ থেকে ৬ শতাংশ সুদ পাওয়া যায়। অথচ পাঁচ বছর আগেও ১২ শতাংশের বেশি সুদ পাওয়া যেত। অন্যদিকে সঞ্চয়পত্রের সুদহার ২০১৫ সালের মে মাসে কিছুটা কমানোর পরও ১১ শতাংশের ওপরই রয়েছে। এ কারণে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ দিন দিন বাড়ছেই।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মানবকণ্ঠকে বলেন, ব্যাংকের তুলনায় সুদহার বেশি হওয়ায় এবং কোনো ধরনের ঝুঁকি না থাকায় বর্তমানে সঞ্চয়পত্রে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করছেন গ্রাহকরা। তিনি বলেন, সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগকে সাধারণ মানুষ এখনো নিরাপদ মনে করছে। কেননা দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক বলা যাচ্ছে না। আবার শেয়ারবাজারের মন্দাভাবও পুরোপুরি কাটছে না। তাই সঞ্চয়পত্রেই সাধারণ মানুষ বেশি বিনিয়োগ করছে। সঞ্চয়পত্রের সুদহার না কমানোর সরকারি সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক উল্লেখ করে তিনি বলেন, সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। সঞ্চয়পত্রের স্কিমগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

সঞ্চয় অধিদফতরের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে জুলাইয়ে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের আয় থেকে আগের সঞ্চয়পত্রের মূল ও সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পর যা অবশিষ্ট থাকে, তাকে বলা হয় নিট বিক্রি। জুলাই মাসে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে পরিবার সঞ্চয়পত্র। পরিবার সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭১৪ কোটি টাকা, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে নিট বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৩২০ কোটি টাকা, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে ৪৮০ কোটি টাকা এবং ৬৪৮ কোটি টাকার পেনশনার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। মূলত এই চার ধরনের সঞ্চয়পত্রের বিক্রিই বেশি হয়ে থাকে।

প্রসঙ্গত, চলতি অর্থবছর সঞ্চয়পত্র থেকে ৩০ হাজার ১৫০ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এদিকে আশার তুলনায় সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেশি হওয়ায় গত অর্থবছরজুড়েই ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার চাহিদা ছিল কম। সরকার এখন ব্যাংক থেকে যে অর্থ ঋণ নিচ্ছে, তার চেয়ে পরিশোধ করছে বেশি। গত জুলাই ও আগস্ট দুই মাসেই ব্যাংকগুলোর দেনা বাবদ সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

জানা গেছে, বর্তমানে ৫ বছর মেয়াদি পারিবারিক সঞ্চয়পত্রে সুদের হার ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ, ৫ বছর মেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্রে সুদের হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ হয়েছে। ৩ বছর মেয়াদি ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে ১১ দশমিক ৪ শতাংশ সুদ দেয়া হয়। অন্যদিকে ৩ বছর মেয়াদি ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং ৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ সুদ দেয়া হয়।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.