অভ্যন্তরীণ কোন্দলই বড় সমস্যা বিএনপির

সারাদেশে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও গ্রুপিংই এ মুহূর্তে দলের বড় সমস্যা বলে চিহ্নিত করেছে বিএনপি। একই সঙ্গে নেতাকর্মীদের নামে হাজার হাজার মামলাও তৃণমূলে দলের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে মনে করে সংসদের বাইরে থাকা ২০ দলীয় জোটের প্রধান এই দলটি।

সম্প্রতি ৫১ কমিটি সারাদেশ সফর শেষে যে রিপোর্ট তাদের শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়ার কাছে জমা দিয়েছে, তাতেই দলের এই চিত্র উঠে এসেছে। রিপোর্ট মৌখিক ও লিখিত উভয়ভাবে দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, এপ্রিল মাসে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, সহ-সভাপতি, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও কেন্দ্রীয় কমিটির অন্য নেতাদের নেতৃত্বে এই ৫১ কমিটি করা হয়। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সংবাদ সম্মেলনে এসব কমিটি করার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, এই টিমের নেতারা বিএনপির ৭৫টি রাজনৈতিক জেলায় কর্মিসভায় অংশ নেবেন। এসব টিম সারাদেশে কর্মিসভা ও দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারে নির্দেশনা দেবেন। সেখানে জাতীয় রাজনীতি নিয়ে তারা আলোচনা করবেন, সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন।

খালেদা জিয়ার কাছে জমা দেয়া ৫১ কমিটির অধিকাংশ রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রশাসন ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাধার কারণে অনেক স্থানেই তৃণমূল নেতাদের নিয়ে সভাসমাবেশ করতে পারেননি তারা। তবে অনেক স্থানেই অভ্যন্তরীণ

কোন্দল ও গ্রুপিংয়ের কারণে মারামারি হওয়ায় দলের সভাসমাবেশ পণ্ড হয়। এর মধ্যে চট্টগ্রাম উত্তর-দক্ষিণ, ঢাকা, বরিশাল, ঝিনাইদাহ, নড়াইলসহ আরো বেশ কয়েকটি জেলায় ‘অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও গ্রুপিংয়ে’ সভা পণ্ড হয়ে যায়। ৭ মের মধ্যে এসব সভা শেষ করতে নির্দেশ দেয়া হলেও এখন পর্যন্ত সভাসমাবেশ বা মতবিনিময় হয়নি অন্যূন ১০ থেকে ১২টি সাংগঠনিক জেলা কমিটির। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: বান্দরবান, ময়মনসিংহ উত্তর ও দক্ষিণ, চাঁদপুর, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, মানিকগঞ্জ প্রমুখ জেলা। এসব জেলায় অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণেই সমাবেশ করা যাচ্ছে না বলে জানা গেছে।

দলীয় কোন্দলে কর্মিসভা পণ্ড হয়ে যাওয়ার ঘটনায় চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গাজী শাহজাহান জুয়েল ও উত্তরের সদস্য সচিব কাজী আব্দুল্লাহ আল হাসানকে দলের সব পর্যায়ের পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। সেই সঙ্গে বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীমকে ‘আরো সর্তকতার সঙ্গে’ দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নীতি-নির্ধারকরা।

উল্লেখ্য, ২ মে চট্টগ্রাম উত্তর এবং ৩ মে দক্ষিণের কর্মিসভা দলীয় কোন্দলের কারণে মারামারিতে পণ্ড হয়ে যায়। তবে ৪ মে মহানগর বিএনপির কর্মিসভা হয়। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির কর্মিসভার সময় সংঘর্ষে আহত হন সহ-সভাপতি এনামুল হক।

চট্টগ্রামের ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত দলের সিনিয়র নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ঢাকায় ফিরেই মৌখিকভাবে সেখানকার কোন্দল নিয়ে রিপোর্ট করেন দলের নেত্রী খালেদা জিয়ার কাছে। এরপরই বিএনপি চেয়ারপার্সন চট্টগ্রামের নেতাকর্মীদের নিয়ে নিজের গুলশানের কার্যালয়ে বৈঠক করেন। অব্যাহতির চিঠি পাওয়া গাজী শাহজাহান জুয়েল ও আবদুল্লাহ আল হাসানও ছিলেন ওই বৈঠকে। আড়াই ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর সেদিন সিদ্ধান্ত হয় চট্টগ্রাম ‘উত্তর’ ও ‘দক্ষিণ’ জেলা কমিটি কেন্দ্র থেকেই করে দেয়া হবে।

বৈঠকে উপস্থিত এক জ্যেষ্ঠ নেতা মানবকণ্ঠকে বলেন, এ রকম গ্রুপিংয়ের জন্য কয়েক নেতাকে বৈঠকে সতর্ক করে দেয়া হয়। আমাদের চেয়ারপার্সন বলেছেন, তিনি আর কোনো গ্রুপিং দেখতে চান না। সাংগঠনিক শৃঙ্খলা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। যারা মানবে না তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

১৬ মে রাজধানীতে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমানের উপস্থিতিতে দুই গ্রুপের মারামারিতে ঢাকা জেলার কর্মিসভাও পণ্ড হয়ে যায়। ওইদিন রাতেই তারা দু’জন গুলশান কার্যালয়ে গিয়ে পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দেন। এ ব্যাপারে খালেদা জিয়া উষ্মা প্রকাশ করে সেখানকার নেতাকর্মীদের এ ব্যাপারে সতর্ক করে দেন বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া ৫১ কমিটির পৃথক পৃথক রিপোর্টে তৃণমূল নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা দলের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়। তারা এতে বলেন, এসব মামলার অধিকাংশই ২০০৭ সালে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের। বাকিগুলো আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত এবং বর্তমান আমলে করা। এগুলোর বেশিরভাগই ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালের। খালেদা জিয়াসহ কেন্দ্রীয় ১৫৮ নেতার বিরুদ্ধে প্রায় ৪ হাজার ৩৩১ মামলা রয়েছে বলে জানা যায়।

উল্লেখ্য, বিএনপির দফতরের হিসাব অনুযায়ী, কেন্দ্রীয়সহ সারাদেশে দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ২১ হাজার ৬৮০টি মামলা হয়েছে। এতে আসামির সংখ্যা ৪ লাখ ৩ হাজার ৮৭৮ জন। আর দলের স্থায়ী কমিটির ১২ জন সদস্যের বিরুদ্ধেই আছে ২৮৮টি মামলা।

রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, এসব মামলা থাকার কারণে নেতাকর্মীরা দলীয় কাজে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না। এতে দলের স্বাভাবিক কার্যক্রম বিঘ্ন হচ্ছে।
‘দলীয় কোন্দলের’ ব্যাপারে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী মানবকণ্ঠকে বলেন, বিএনপি একটি বড় দল। এ দলের নেতৃত্ব দেয়ার মতো অনেক ব্যক্তিই যোগ্য। সুতরাং নেতৃত্বে যাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা থাকবেই। এ প্রতিযোগিতা কখনো কখনো সীমা ছাড়িয়ে যায়। এ ব্যাপারে আমাদের দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বেশ কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।

রিপোর্টের ব্যাপারে জানতে চাইলে দলের ভাইস চেয়ারম্যান শওকত মাহমুদ জানান, আমরা রিপোর্ট জমা দিয়েছি। যেসব বিষয় রিপোর্টে উল্লেখ থাকতে বলা হয়েছে, তা আমরা উল্লেখ করেছি।

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স তার অধীনে থাকা দলের ময়মনসিংহ উত্তর ও দক্ষিণ জেলায় সমাবেশ না হওয়ার ব্যাপারে বলেন, যেহেতু কেন্দ্র থেকেই ওই দুটি সাংগঠনিক জেলার কমিটি করে দেয়া হবে, সেহেতু ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) সম্মতি নিয়েই সেখানে সমাবেশ করা হয়নি।

বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুল এ ব্যাপারে বলেন, ৫১ কমিটির সারাদেশের সফরের কারণে দলে প্রাণশক্তি ফিরে এসেছে। দলীয় নেতাকর্মীরা চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।

কোন্দলের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিএনপির মতো বড় একটি দলে নেতৃত্বে প্রতিযোগিতা থাকবে। আপনারা যাকে কোন্দল বলছেন, আমরা একে ‘নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা’ বলি। এটা থাকা খুবই স্বাভাবিক। তিনি একে একটি দলের সুস্থতারও লক্ষণ বলে মনে করেন।

মানবকণ্ঠ/এসএস

One Response to "অভ্যন্তরীণ কোন্দলই বড় সমস্যা বিএনপির"

  1. Pingback: অভ্যন্তরীণ কোন্দলই বড় সমস্যা বিএনপির - মানবকণ্ঠ