অবশেষে মিয়ানমার থেকে আতপ চাল আমদানির সিদ্ধান্ত

রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কিছুটা শীতল হলেও, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষেত্রে এখনো সম্পর্ক বজায় রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় মিয়ানমার থেকে আপাতত ১ লাখ মেট্রিক টন আতপ চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। একই সঙ্গে আগাম মজুদ হিসেবে ২০১৮ সালের জন্য পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিরও সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে ।

বিগত কয়েক বছরে ধানের বাম্পার ফলনে বাংলাদেশ চালের ক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত দেশে পরিণত হয়। কিন্তু এ বছর হঠাৎ হাওর এলাকায় পাহাড়ি ঢলে বিস্তৃত এলাকার বোরো জমি তলিয়ে যায়। একই সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও অকাল বৃষ্টি, অতি বৃষ্টি, ব্লাষ্টরোগ, পাহাড়ি ধস আর বন্যার কারণে চালের বাজার অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে। এ সব বিবেচনায় সরকার খাদ্য নিশ্চিত করতে চাল আমদানির উদ্যোগ নেয়। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক দরপত্রের পাশাপাশি সরকার থেকে সরকারে অর্থাৎ জিটুজি পর্যায়ে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ইতিমধ্যে ভিয়েতনামের সঙ্গে ২ লাখ ৫০ হাজার মে. টন চাল আমদানির চুক্তি হয়েছে। আর সেই চুক্তি মোতাবেক পর্যায়ক্রম চাল আসতে শুরু করেছে। ভিয়েতনামের পাশাপাশি থাইল্যান্ড ও ভারতের সঙ্গে চাল আমদানির ব্যাপারে যোগাযোগ হয়। এমনকি আলোচনাও হয়। কিন্তু ওই দুদেশের সঙ্গে চালের দরদাম নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় আলোচনা সফল হয়নি বলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে। সূত্রটি আরো জানায়, দুদেশের সঙ্গে আলোচনা সফল না হলেও, কম্বোডিয়ার সঙ্গে আলোচনা সফল হয়েছে। ফলে ওই দেশ থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার মে. টন চাল আমদানির ব্যাপারে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে।

এদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অপর একটি সূত্রে জানা গেছে, চাল আমদানির ব্যাপারে মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বেশ ইতিবাচক মনোভাব দেখায়। যার ফলে মিয়ানমারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউনিয়ন মিনিস্টার জিটুজি পর্যায়ে চাল সরবরাহের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করে। একই সঙ্গে ২৫ আগস্ট খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র পাঠায় তারা। এই আমন্ত্রণপত্র পেয়ে মন্ত্রী কিছুটা দ্বিধায় পড়ে যান। কারণ একই সময়ে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ শুরু করে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, চিঠিতে খাদ্যমন্ত্রীকে ৭ সেপ্টেম্বর মিয়ানমার সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। এই আমন্ত্রণের চিঠি নিয়ে খাদ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীকে মিয়ানমার সফরের অনুমতি দেন। এই সফর নিয়ে পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংসদে খাদ্যমন্ত্রীকে বেশ কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। তবে খাদ্যমন্ত্রী তার যথাযথ বক্তব্য জানিয়ে দেন।

জানা গেছে, মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের চাল আমদানির ব্যাপারে সমঝোতা স্বাক্ষর করা হয়েছে। আর এই স্বাক্ষরটি হয় খাদ্যমন্ত্রী মিয়ানমারে সফরকালে। চাল আমদানির চুক্তিটি হয় পাঁচ বছরের জন্য। অর্থাৎ ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সময়ের জন্য। সরকার থেকে সরকার পর্যায়ে সর্বোচ্চ তিন লাখ টন চাল আমদানি করা যাবে। চালের দাম নির্ধারিত হবে চাল কেনার সময় আন্তর্জাতিক দরদামের ওপর ভিত্তি করে। বর্তমানে দেশে সরকারি মজুদ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়ায় সরকারিভাবে চাল আমদানির জন্য ১০ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে মিয়ানমার সরকারের প্রতিনিধিদলকে বাংলাদেশের আমন্ত্রণ জানানো হয়। এই আমন্ত্রণের প্রেক্ষিতে মিয়ানমার সরকার সম্প্রতি তাদের সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘মিয়ানমার রাইস ফেডারেশনের ১১ সদস্য বিশিষ্ট প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে পাঠায়। ১৭ সেপ্টেম্বর প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বাংলাদেশের কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। যে কমিটি জিটুজি পদ্ধতিতে কেনা কাটার বিষযটি দেখভাল করবে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, আমদানির শর্ত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সেই আলোচনায় ১ লাখ টন আতপ চাল তারা রফতানি করবে। যেখানে ৫ শতাংশ ভাঙা দানা বিশিষ্ট আতপ চালের দাম পড়বে টন প্রতি ৪৪৫ মার্কিন ডলার। তবে আলোচনা শেষে ৩ ডলার কমে অবশেষে ৪৪২ ডলারে এসে সমঝোতা হয়। মোট এক লাখ টন আতপ চালের জন্য সরকারের ব্যয় হবে ৩৬৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকা আর ডলার ধরা হয়েছে ৮৩ টাকা হিসেবে।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.