অপরাধীর পরিচয় প্রকাশ করুন

অপরাধীর পরিচয় প্রকাশ করুন

শেষ পর্যন্ত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও কথাটি বলতে হলো। আমাদের দেশে এটি যেন একটি নিয়মিত সংস্কৃতিতে পরিণত হয়ে যাচ্ছে যে, প্রধানমন্ত্রী নিজ থেকে কোনো কিছু না বললে, তদারকি না করলে অন্যের কাছে অনেক কিছুই গুরুত্ব পায় না, গুরুত্ব দেয় না, সংশ্লিষ্টরা সে বিষয়ে গুরুত্ব উপলব্ধি করেন না। এমনকি কোনো কোনো সময় নির্বাচিত প্রতিনিধিকে নিজ এলাকার জনগণের জন্য মানবিক হতেও প্রধানমন্ত্রীকে বলে দিতে হয়। না হলে কেউ কেউ বুঝতে পারেন না যে তার মানবিক হওয়া জরুরি ছিল।

সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্ষণের শিকার যিনি তাকে নয়, যে ধর্ষণের মতো গর্হিত অপরাধ যে করেছে তার পরিচয় প্রকাশের ওপর প্রধানমন্ত্রী জোর দেয়ায় আশা করা যায়, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা হলেও পরিবর্তিত হবে। বর্তমান সময়ে ধর্ষণ একটি সামাজিক ব্যাধির নাম। নানাভাবে চেষ্টা চালিয়েও ব্যাধিটি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বরং মনে হচ্ছে দিন দিন এর ডালপালা আরো বিস্তৃত হচ্ছে। সমাজের এমন কোনো স্তর নেই যেখানে ধর্ষণ নামক ব্যাধির প্রবেশ ঘটেনি। যাকে বা যাদের কথা কেউ কখনো চিন্তাও করেনি তারাও এক একজন ধর্ষক হয়ে উঠছে। গত এক সপ্তাহ বা এর বেশিকাল সময়ের পত্রিকা ঘাঁটলেই মাদরাসা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ এবং বলাত্কারের সংবাদ নজরে পড়বে। অথচ এদের কাছে অভিভাবক তার সন্তানকে ধর্মীয় শিক্ষা এবং ধর্মীয় শিক্ষার আলোকে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ওঠার জন্য পাঠিয়ে থাকেন। কিন্তু এসব কী হচ্ছে? এটা ঠিক সবাই বা সব মাদরাসায় এ রকম হচ্ছে না বা সব মাদরাসার শিক্ষক এমন নন। কিন্তু একটি প্রশ্ন বা উদ্বেগ তো থেকেই যায়, শতকরা কতটি মাদরাসা বা মাদরাসার শিক্ষকের ওপর শতভাগ ভরসা করা যায়? কীভাবে নিরূপণ করা সম্ভব যে ঠিক এই প্রতিষ্ঠানটিতে সন্তান নিরাপদ থাকবে? তাকে শারীরিক, মানসিকভাবে লাঞ্ছনার শিকার হতে হবে না? দুঃখজনক বিষয় হলো শুধু যে শিশু, তরুণী বা নারীরাই ধর্ষণের শিকার হচ্ছে তা নয়। ছেলে শিশুরাও নানাভাবে সমগোত্রের বিকৃতিদের লালসার শিকার হচ্ছে এবং তা তাদের গুরুজনদের কাছ থেকে। প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান সময়ে যে কোনো বিষয়ে সামাজিক গণমাধ্যমে বিভিন্ন গ্রুপ বা সাইটে বিষয়টি সম্পর্কে অনেকে নিজেদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বলেন। সেইসব লেখা পড়ে স্তম্ভিত হতে হয়! কারণ সে সব লেখায় একজন পুরুষ তার জীবনে ঘটে যাওয়া যে সব চাপা কষ্টের কথা, যে সব অনাকাঙ্ক্ষিত, অযাচিত অভিজ্ঞতার কথা খুলে বলেন তা কোনো সভ্য সমাজের চিত্র তুলে ধরে না। বরং মানুষ হিসেবে আমাদের চিন্তা, মানসিকতার বিকৃতি, দীনতাই স্পষ্ট করে।

অনেকেই এতদিন ইনিয়ে বিনিয়ে নারীর চলাফেরা, পোশাক-পরিচ্ছদকে দায়ী করার চেষ্টা করেছেন। বলার চেষ্টা করেছেন নারীর পোশাকই একজন পুরুষের মধ্যে ধর্ষণেচ্ছা জাগিয়ে দেয়ার জন্য দায়ী। জানি না একজন ধর্মীয় শিক্ষকের দ্বারা শিশু শিক্ষার্থীকে বলাত্কারের পক্ষে তারা কী যুক্তি দাঁড় করাবেন। মানুষ নামের এইসব দুর্বৃত্ত শুধু যে এখানেই থেমে যাচ্ছে তা নয়, অপরাধ লুকাতে কাউকে কাউকে হত্যাও করছে।

ধর্ষণ বা বলাত্কারের শিকার যে-ই হোন না কেন, এটি তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ওপর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কারণ আমাদের সমাজ ধর্ষককে নয়, ধর্ষণের শিকার ব্যক্তি ও তার পরিবারের দিকে বাঁকা চোখে তাকায়। নানা ধরনের কটু মন্তব্য করে। কেউ একবার ভেবেও দেখে না, এ ধরনের পরিস্থিতিতে তিনি বা তার পরিবারের কেউ পড়লে বিষয়টি কতটা যন্ত্রণাদায়ক হতো।

গণমাধ্যমে ধর্ষিতার ছবি প্রকাশ না করার বিষয়ে নীতিগত একটি সিদ্ধান্ত রয়েছে। অধিকাংশ পত্রিকা বা টিভি চ্যানেল এটি রক্ষা করে চলেও। তা সত্ত্বেও কিছু কিছু নিউজ সাইট তা রক্ষা করে না বা ধর্ষিতা সম্পর্কে এমন নির্ভুল তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে যে তাতে ধর্ষিতার ছবি প্রকাশ না করলেও স্থানীয়ভাবে তাকে চিনতে কারো বেগ পেতে হয় না।

এছাড়া কিছু কিছু সংবাদে ঘটনার এমন নিখুঁত এবং বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয় যে তাতে মনে হয় প্রতিবেদক নিজে ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন। পত্রিকার কাটতি বা পাঠককে আগ্রহী করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের অসততার আশ্রয় নেয়া হয় জানি। তা সত্ত্বেও প্রতিটি মানুষের জানা এবং বোঝা উচিত যে, সব বিষয় নিয়ে বাণিজ্য করা যায় না, উচিতও না।

ধর্ষণ বিষয়ক সময়োচিত মন্তব্যটি করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নারী দিবসের একটি অনুষ্ঠানে শিশু এবং নারী ধর্ষণকে অত্যন্ত গর্হিত একটি অপরাধ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী এ সময় ধর্ষিতা নারীর পরিচয় গোপন রেখে ধর্ষণকারীকে সমাজের সবার কাছে তুলে ধরার জন্য গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, যারা ধর্ষণ করে তাদের প্রতি ঘৃণা এবং আমি বলব তাদের নাম, পরিচয় ভালোভাবে প্রচার করা কর্তব্য, যাতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ তাকে ঘৃণার চোখে দেখে। তাছাড়া আইনগত ব্যবস্থা তো তাদের বিরুদ্ধে নেয়া হবেই। এ সব অপরাধীর বিরুদ্ধে তার সরকার মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সাজার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলেও তিনি জানান।

এটিই নীতি হওয়া উচিত। বিরুদ্ধাচরণ যখন করবেনই ধর্ষকের বিরুদ্ধে করুন। তবে তা কেন প্রধানমন্ত্রীকে বলতে হবে? একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে, একজন মানুষ হিসেবে প্রত্যেকের উচিত ধর্ষণ রোধে সোচ্চার ভূমিকা রাখা। ধর্ষককে সামাজিকভাবে হেয় করা, লজ্জিত করাটাও এক ধরনের শাস্তি। তাকে এটা দেয়া উচিত। আইনি যা শাস্তি রয়েছে তা তো সে পাবেই। ভালোমানুষির মুখোশ খুলতে চাইলে ধর্ষকের মুখোশ ছিঁড়ে ফেলুন। সমাজ চিনুক, ধর্ষক লজ্জিত হোক, সবার সামনে তার মাথা নত হোক, হেনস্থা হোক সে। এসব দেখে নানা অজুহাতে যারা ধর্ষণের মতো গর্হিত অপরাধে আগ্রহী হতে চাইবে তারাও সতর্ক হবে।
– লেখক: সাংবাদিক, গল্পকার

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.