অন্যায়কে প্রতিহত করার ক্ষমতা জনগণের

অনেকবার শুনলাম। শুনে শিহরিত হলাম। ভয়ে কেঁপে উঠলাম। এ কী শুনছি! চোখের সামনে ভেসে উঠল ১৯৭১ সালের ভয়াবহ ২৫ মার্চের কালরাত্রির ছবি। মন বলছিল এই অডিও ক্লিপ ২০১৮ সালের ২৬ মের নয়, ১৯৭১ সালের যেন রেকর্ডকৃত কিংবা মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত কোনো একটি রেডিও নাটক হয়তো শুনছি কিংবা ফিল্ম দেখছি। গভীর রাতে মৃদু স্বরে বাবা ও মেয়ের কথোপকথনের মাঝে হঠাৎ হুঙ্কার, তারপর গুলির শব্দ এবং সেই সঙ্গে করুন আর্তচিৎকার। অভয় দিচ্ছিলাম নিজেকে, এমন ঘটনা স্বাধীন গণতান্ত্রিক একটি দেশের নয়, হতে পারে না। নিশ্চিত কোথাও ভুল হচ্ছে, অন্য কোথাও ঘটছে।

হয়তো ভুল শুনছি, ভুল দেখছি। ভুল হলেই শান্তি পেতাম। ভয় কেটে যেত। স্বস্তি পেতাম। কিন্তু চোখের সামনে দেখলাম সংবাদ সম্মেলনে একরামুল হকের স্ত্রী আর তার কন্যা দু’জনার বুক ফাটা কান্না। করুণ আর্তনাদ। পুরো ঘটনা সত্য বলে দাবি করছে একরামুল হকের পরিবার। প্রিয়জনকে এভাবে হারালে প্রিয়জনেরা এভাবেই কাঁদে। হত্যার বিচার চায়। প্রতিটি সন্তানই চায় তার বাবার নির্মম হত্যার বিচার। প্রতিটি সন্তানেরই বুকে বাজে বাবাকে হারানোর হাহাকার। অপ্রত্যাশিতভাবে হারানোর ব্যথার তুলনা কোনোকিছুর সঙ্গেই যায় না। যারা হারান, তারাই কেবল নিঃস্ব হন, হারানোর ব্যথা অনুভব করেন।

একরামুল হকের দুই কিশোরীর কন্যা তাহিয়াত ও নাহিয়ানের আহাজারির মধ্যে প্রশ্ন জেগেছে, কী অপরাধ ছিল তাদের বাবার। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, মাদকবিরোধী অভিযানে তিনি ক্রসফায়ারে নিহত হন। তাহিয়াত ও নাহিয়ানের বাবা একরামুল হক ছিলেন টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর । ১২ বছর তাদের বাবা টেকনাফ উপজেলার বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তার জানাজায় উপস্থিত মানুষের ঢল ও নেতৃত্বের এই লম্বা সময় হয়তো বলে দেয়, তিনি অনেকের কাছেই একজন জনপ্রিয় স্থানীয় নেতা ছিলেন। ঘটনাটি জানার পর থেকে কেন জানি তাহিয়াত আর নাহিয়ানের কষ্টটা আমার মনে হয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার বোন শেখ রেহেনার পিতৃহারার কষ্টেরই পুনরাবৃত্তি। অপ্রত্যাশিত পিতৃহত্যার এই কষ্ট, অবিকল মনে হয়েছে। দুটি হত্যাকাণ্ডই পরিবারের কাছে এক মহা বিস্ময় এবং এই বিস্ময় জন্মদাতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় সদস্য। মানুষের মন মাত্রই তো এমন, এক প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার সঙ্গে আরেক প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার সাদৃশ্য খুঁজে দেখে।

মাদকবিরোধী অভিযানের আরো আগে একটা অভিযান দরকার ছিল মাদক নির্মূলে। মাদক প্রবেশপথ থেকে শুরু করে মাদক বাজারজাতকরণের বিভিন্ন কৌশল, উপায়, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। বেশ দেরিতে হলেও মাদকবিরোধী অভিযানকে স্বাগত জানাই। যা সমর্থন করতে পারি না, তা হলো ক্রসফায়ার। বর্তমান মাদকবিরোধী অভিযান বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ার দ্বারা অলংকৃত। এই পর্যন্ত দেড়শ’র ঊর্ধ্বে মানুষ ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন মাদক ব্যবসা ও মাদকসেবনের অপবাদ ও অভিযোগে। প্রতিদিন টিভি ও পত্রিকার খবরে দেখছি ঢাকা শহরের দরিদ্র এলাকা, যেমন বস্তি, বাজার, দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় এই অভিযান বেশ জোরেশোরে চলছে।

হাজার হাজার ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল ইত্যাদি মাদকদ্রব্য উদ্ধার করছে তারা বস্তিতে বসবাসকারী নারী ও পুরুষের কাছ থেকে। এসব দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় কী করে মাদক পৌঁছায় দায়িত্বশীল মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও সুদক্ষ, সুসজ্জিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকতে, সেই প্রশ্নে না গিয়ে বিস্মিত হয়ে বরং বলি, একবারও অভিজাত এলাকা, যেমন বনানী, গুলশান, ধানমণ্ডি, বারিধারা এলাকায় এই অভিযান চোখে পড়ল না। ধরে নিতে পারি তালিকায় এসব এলাকা হয়তো পেছনে জায়গা পেয়েছে। যাই হোক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার পরিকল্পনা অনুযায়ী নিশ্চয়ই সততার সঙ্গে কাজ করবে, সেই আশা করতেই পারি। কারণ আমরা চাই এই দেশটা মাদকমুক্ত দেশ হোক।

ক্রসফায়ার বিচারবহির্ভূত একটি হত্যাকাণ্ড। যা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন করে এবং সংবিধানের বিরোধিতা করে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যা বড্ড বেমানান। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সমাজের শৃঙ্খলাবোধ ভেঙে দেয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সহায়ক হয়, হতে পারে। এতে মানুষের ভেতর যে সুপ্ত হিংসা, বিদ্বেষ, ক্ষোভ, ব্যক্তি স্বার্থপরতা থাকে, তা প্রকাশ পায় নিজস্ব নিয়মে, আক্রমণাত্মকভাবে। যেমন একজন ব্যক্তি খুব সহজে অপর ব্যক্তিকে ফাঁসিয়ে দিয়ে প্রতিশোধ নেয়ার কথা ভাবতে পারেন। ভেবেও থাকেন কেউ কেউ। যারা অভিযান পরিচালনা করছেন, তাদের সবাই যে দায়িত্বের প্রতি সৎ, নিষ্ঠাবান, নৈতিক মূল্যবোধে উজ্জ্বল তা ভাবাও বোকামি। কারণ এমন তথ্যও প্রকাশ পেয়েছে যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো কোনো সদস্য মাদক ব্যবসায় জড়িত। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরেও এমন দৃষ্টান্তের খোঁজ পাওয়া গেছে। সবচাইতে বড় ভয়ের জায়গা হলো, যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে, কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে সেই দলের কোনো কোনো নেতাকর্মী

পুলিশ প্রশাসনকে ব্যক্তি গোষ্ঠী স্বার্থে ব্যবহার করেন আবার রয়েছে নিরীহ মানুষের ভোগান্তি। আমরা প্রায় বলি সামাজিক অবক্ষয়ের শিকার আমাদের তরুণ সমাজ, যুবসমাজ। এই বলা-কওয়া লাগামছাড়া হয় যখন সমাজে কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে। পরিবারের কী ভূমিকা হওয়া উচিত, সমাজের কী ভূমিকা হওয়া উচিত ইত্যাদি অনেক কথাই বলি। যা বলা হয় না কখনো, রাষ্ট্র কী করছে সামাজিক অবক্ষয় রোধে। মূল্যবোধ তৈরিতে কি সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র তৎপর ইত্যাদি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বেশ ভালো জানেন কোন পথে, কাদের সহায়তা বা ব্যর্থতায় এবং কীভাবে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে মাদক প্রবেশ করছে আমাদের দেশে। সেসব ক্ষেত্রে অপারেশন না করে মাদকবিরোধী অভিযানে মানুষ হত্যা করে দেশকে মাদকমুক্ত করার স্বপ্ন, এক ধরনের ছেলেখেলা বৈকি। সেই সঙ্গে মাদকের অবাধ প্রবেশকে সমর্থন দেয়া এবং মাদকের মূল হোতাদের বাঁচিয়ে রাখা। প্রায়ই কোনো কোনো মানুষকে বলতে শুনি, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য প্রচুর অর্থের দরকার হয়। এই অর্থের জোগানদাতারা হলেন ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের ভালো সম্পর্ক রাখতে হয় রাজনৈতিক অস্তিত্বের স্বার্থে। ফলে ব্যবসায়ীদের অন্যায় কার্যকলাপের সহজে বিচার হয় না। এক্ষেত্রে তেমন কোনো লেনদেন নাই থাকুক, সেই কথা ভেবে শান্তি পাই।

একরামুল হকের ঘটনায় একজন মন্ত্রী বললেন, ভালো কাজে ভুল হতে পারে। একরামুল হককে হত্যা করার বিষয়টি যদি ভুল বলে মনে করা হয়, তাহলে অন্যায় কোনটি মাননীয় মন্ত্রী? একটা কথা আমাদের মনে রাখা দরকার, যে কোনো অন্যায়কে প্রতিহত, প্রতিরোধ করার চূড়ান্ত ক্ষমতা রাখেন একমাত্র জনগণ। কীভাবে? অন্যায়কারীকে জনসমর্থন না দিয়ে। ক্ষতিগ্রস্ত বা অতিষ্ঠ জনগণের মুক্তির একমাত্র হাতিয়ার হলো শাসকের ওপর থেকে আস্থা তুলে নেয়া। জনগণের বিদ্রোহ, কামানের গোলার চাইতে শক্তিশালী। ইতিহাসের কাছ থেকে সেই শিক্ষা নেয়া যায়। কেন ভুলে যাচ্ছেন তারা?

পরিশেষে বলি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে ইঙ্গিত করে। সরকারের কাছে আবেদন, বিচার ব্যবস্থাকে অরাজনৈতিকভাবে তার পথে সুষ্ঠুভাবে চলতে দিন। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা পাক। তাতে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং পরিবেশ হবে জনগণের বেঁচে থাকার, স্বপ্ন দেখার অনুকূলে। সুতরাং, নো মোর ক্রসফায়ার, প্লিজ সরকার! লেখক: কথাসাহিত্যিক

মানবকণ্ঠ/এএএম