অন্তর্কোন্দলে আওয়ামী লীগ বিএনপির অস্তিত্ব প্রায় বিলীন

মানিকগঞ্জে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয়হীনতায় পুড়ছে জেলার আওয়ামী রাজনীতি। সেইসঙ্গে জেলার চলমান কর্মকাণ্ড ও টেন্ডার বাণিজ্য, সরকারি জমি দখলসহ সব কর্মকাণ্ড পরিচালিত করতে গড়ে উঠেছে আওয়ামী লীগের একাংশের সিন্ডিকেট।

এ ছাড়া ১৬ বছর যাবত মহিলা আওয়ামী লীগ, ১২ বছর যাবত যুবলীগ, ৯ বছর ধরে স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ৭ মাস যাবত ছাত্রলীগের জেলা পর্যায়ের কোনো কাউন্সিল নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বয়স বাড়তে বাড়তে ঝিমিয়ে গেছে কাউন্সিল না হওয়া অন্য অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো। তবে জেলা আওয়ামী লীগের একাধিক সাবেক শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন মতভিন্নতায় অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয়হীনতাই এর একমাত্র কারণ।

এদিকে, বিএনপিরর ঘাঁটি খ্যাত জেলার ৭ উপজেলাতেই বিএনপির আধিপত্য বিস্তার ছিল গত ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত। ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার ৩টি আসনেই আওয়ামী লীগ জয়ী হয়ে রাজনীতি অঙ্গনে প্রভাব বিস্তার করে। ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করায় জেলার ৩টি আসনের মধ্যে মানিকগঞ্জ-৩ আসনে জাহিদ মালেক স্বপন, মানিকগঞ্জ-২ আসনে কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগম ও মানিকগঞ্জ-১ আসনে এ এম নাইমুর রহমান দুর্জয় আওয়ামী লীগ প্রার্থী থেকে জয় লাভ করে। সেইসঙ্গে মানিকগঞ্জ-৩ আসনের এমপি জাহিদ মালেক স্বপন প্রধানমন্ত্রীর গুড লিস্টে নাম থাকায় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালে সম্মেলনের মাধ্যমে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে অ্যাডভোকেট গোলাম মহিউদ্দিন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে গাজী কামরুল হুদা নির্বাচিত হন। এরপর দীর্ঘ এক যুগ পর গত ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি মানিকগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অ্যাডভোকেট গোলাম মহিউদ্দিন পুনরায় সভাপতি নির্বাচিত হন। আর ভোটের মাধ্যমে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন আগের কমিটির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম।

অভিযোগ রয়েছে উপজেলা, পৌরসভাসহ বিভিন্ন ইউনিটের যেসব কমিটি হয়েছে, তাতে মূলত স্থানীয় সংসদ সদস্যদের পছন্দের ব্যক্তিরা পদ পেয়েছেন এবং কাউন্সিলরদের ভোটে নেতা নির্বাচন না করে মনোনীত ব্যক্তিদের দিয়ে কমিটি করায় অতীতে দলের দুঃসময়ের সক্রিয় নেতারা হতাশ ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন।

একাধিক সিনিয়র নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে ও সংশিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মানিকগঞ্জ-৩ আসনের এমপি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন নিজের আস্থাভাজনদের নিয়ে কমিটি গঠন ও নিজের আস্থাভাজন জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুলতানুল আযম খান আপেল, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আফসার উদ্দিন সরকারকে নিয়ে আওয়ামী লীগের একাংশের একটি সিন্ডিকেট গড়ে জেলার সব কাজ নিয়ন্ত্রণ করছেন। এখানে অন্য নেতাকর্মীর অবস্থান না থাকায় ভেতরে ভেতরে চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এই ক্ষোভ থেকেই দলের মাঝে দূরত্ব, দ্বন্দ্ব এবং সমন্বয়হীনতা সৃষ্টি হয়েছে।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম জানান, অভ্যন্তরীণ কোনো কোন্দল এবং সমন্বয়হীনতা রয়েছে বলে মনে হয় না। তবে বিভিন্ন টেন্ডার, হাট-ঘাট, বালুমহাল ইজারা নিয়ে দলীয় কিছু নেতাকর্মীদের মাঝে একটু মনোমালিন্য সৃষ্টি হতে পারে। বিষয়টি দলীয়ভাবে সমঝোতা হবে। কোনো রকম সহিংসতা কিংবা নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হবে না।

অপরদিকে, রাজনীতিতে অনেকটাই অস্তিত্বহীন মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপি। দেশের বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত মানিকগঞ্জ। যে কোনো দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন জেলার ৭ উপজেলার নেতাকর্মীরা। রাজনীতিতে গ্রুপিং কোন্দল ও সমন্বয়হীনতার কারণে দীর্ঘ এক যুগ পার হলেও করা যায়নি জেলা বিএনপির কমিটি। অবশেষে ২০১৩ সালে জেলা বিএনপির ১৬ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন হলেও ৩ বছরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা সম্ভব হয়নি। এমনকি কোন্দল ও সমন্বয়হীনতার কারণে কমিটি গঠনের পর কমিটির সদস্যরা এক টেবিলে বসতে পারেনি।

এ ছাড়া ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার পতনের চূড়ান্ত আন্দোলনের অংশ হিসেবে ডাকা অবরোধ, হরতালের পর ব্যর্থ হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির নেতারা। তৃণমূলের নেতারা অনেকেই ওই আন্দোলনের নাশকতার মামলায় জর্জরিত হয়ে ও গ্রেফতারের ভয়ে এখন মাঠছাড়া। পলাতক জীবনযাপন করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছেন নেতাকর্মীরা। আত্মগোপনে থাকার পর দিশেহারা হয়ে এসব নেতারা পরিবার-পরিজন এবং ব্যবসা-বাণিজ্য থেকেও বিচ্ছিন্ন থাকায় কীভাবে প্রকাশ্য জীবনযাপন করা যায় সে চেষ্টা করছেন। এর মধ্যে আবার বর্তমান কমিটির নেতৃত্বে সমন্বয়হীনতা ও গ্রুপিং থাকায় মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির রাজনীতিতে অনেকটাই অস্তিত্বহীন।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় পর গত ২০১৩ সালের ৮ জুন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৬ সদস্য বিশিষ্ট জেলা বিএনপির একটি কমিটি অনুমোদন দেন। এ কমিটিতে দলের সাবেক মন্ত্রী হারুণ অর রশিদ খান মুন্নুর মেয়ে আফরোজা খান রিতাকে সভাপতি, বিএনপি সরকারের সাবেক মন্ত্রী সামছুল ইসলাম খান নয়ামিয়ার পুত্র মঈনুল ইসলাম খান শান্তকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি গঠন করা হয়। এতে ওই কমিটিতে পদবঞ্চিত হন অনেক তৃণমূলের সিনিয়র নেতা ।

অভিযোগ রয়েছে, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কমিটিতে রাখা হয়নি। এ কারণে দলের কোনো কোনো নেতা এই কমিটিকে ‘উত্তরাধিকার পকেট কমিটি’ বলে আখ্যায়িত করেন। কমিটি গঠনের পর থেকেই দলীয় সমন্বয়হীনতায় সভাপতি আফরোজা খান রিতা, সাধারণ সম্পাদক মঈনুল ইসলাম খান শান্ত ও সহসভাপতি খন্দকার আবদুল হামিদের অনুসারীরা ৩ ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। দলীয় কর্মসূচিও পালিত হয় আলাদাভাবে। এমন পরিস্থিতিতে মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির। এরই মধ্যে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠন যুবদল, ছাত্রদল ও শ্রমিক দলের অনেকেই আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন।

এ ছাড়া, মানিকগঞ্জের ৭টি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বিএনপি সমর্থিত। দেশের চলমান রাজনীতির পরিস্থিতিতে সরকার কঠোর অবস্থানে থাকায় তারা অনেকে সরকার দলীয় লোক এবং এমপি ও মন্ত্রীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে আওয়ামী লীগ সেজে উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতা জানিয়েছেন, একটি দলের প্রাণ ভোমর হচ্ছে সভাপতি ও সম্পাদক। দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ২ জনই নিজেদের ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত। দলীয় কর্মসূচিতে তাদের তেমন একটা পাওয়া যায় না। তাছাড়া রাজনীতিতে সাংগঠনিক অদক্ষ হওয়ায় ৩ বছর পার হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারেনি। আর জেলা বিএনপির নেতৃত্বের দাবিদার মূলত সবাই নবাগত, অনভিজ্ঞ এবং দলের সাংগঠনিক ধারাবাহিকতার অনুপস্থিতি। জেলা বিএনপির অতীত গৌরবময় ঐতিহ্যের বিবর্তে সবাই দলের নিজেদের অবস্থানের জন্য মনোযোগী এবং মরিয়া হওয়ায় আজ জেলা বিএনপি অস্তিত্ব বিলীনের পথে বলেও জানান একাধিক তৃণমূলের নেতারা।

জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এস এ কবির জিন্নাহ বলেন, রাজনৈতিক হয়রানিমূলক বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় অনেক নেতাকর্মী গ্রেফতার আতঙ্কে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। যে কারণে কিছুটা দলীয় সাংগঠনিক দুর্বলতা রয়েছে। তবে আমার মনে হয় দলীয় কোনো কোন্দল নেই।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মঈনুল ইসলাম খান শান্ত বলেন, দলীয় সব কর্মসূচিতে উপস্থিত না থাকতে পারলেও নেপথ্যে থেকে দলকে সুসংগঠিত করতে কাজ করে যাচ্ছি। তৃণমূল থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলার সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছি।

আর জেলা বিএনপির সহসভাপতি খোন্দকার আব্দুল হামিদ বলেন, সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি গঠনের বিকল্প নেই। কেন্দ্র থেকে কমিটি চাপিয়ে দেয়া হলে যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি হয় না। মাঠ পর্যায়ের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের দিয়েই কমিটি গঠন করতে হবে।

মানবকণ্ঠ/এএএম