অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় অশনি সঙ্কেত!

রনি রেজা :
জাতীয় সংসদের ভেতরে-বাইরে বিভিন্ন পক্ষের আপত্তি, উদ্বেগ ও মতামত উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস করা হয়েছে। কিঞ্চিৎ পরিবর্তনও আনা হয়েছে। অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট হিসেবে এটিকে উপস্থাপন করেছেন ডাক, টেলিযোযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। এ আইনকে ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘এই আইন নিয়ে গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সমালোচনা করার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে সাংবাদিকদের অভিমতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তাদের কথা অনুসারে যেসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন দরকার, তার সবই করা হয়েছে।’ মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী আশান্বিত হওয়াই স্বাভাবিক। সাংবাদিক প্রতিনিধিদের মতামতের ভিত্তিতে পরিবর্তন আনা হলে নিশ্চয়ই সেখানে কোনো বিতর্ক থাকার কথা নয়। কিন্তু আইনটি পাস হওয়ার পরও বিতর্ক থেমে নেই। এই আইনে বলা হয়েছে, আইনটি কার্যকর হলে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বাতিল হবে। কিন্তু নতুন এ আইনটিতেই বিতর্কিত ৫৭ ধারার বিষয়গুলো চারটি ধারায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়েছে। যা খুবই হতাশাজনক। এ ছাড়া পুলিশকে পরোয়ানা ও কারো অনুমোদন ছাড়াই তল্লাশি ও গ্রেফতারের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এই আইনে ঢোকানো হয়েছে ঔপনিবেশিক আমলের সমালোচিত আইন ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’। আইনের ১৪টি ধারার অপরাধ হবে অজামিনযোগ্য। বিশ্বের যে কোনো জায়গায় বসে বাংলাদেশের কোনো নাগরিক এই আইন লঙ্ঘন হয়, এমন অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে এই আইনে বিচার করা যাবে। এই আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ বিচার হবে ট্রাইব্যুনালে। অভিযোগ গঠনের ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে। এ সময়ে সম্ভব না হলে সর্বোচ্চ ৯০ কার্যদিবস সময় বাড়ানো যাবে। আইনে বলা হয়েছে, তথ্য অধিকারসংক্রান্ত বিষয়ের ক্ষেত্রে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর বিধানাবলি কার্যকর থাকবে। এ আইনে ডিজিটাল মাধ্যমে আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ; মানহানিকর তথ্য প্রকাশ; ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত; আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তি তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে অপরাধে জেল জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। বিরোধী দলের কয়েক সদস্যও আইনের বেশ কিছু ধারা নিয়ে আপত্তি তোলেন। তবে সেসব আপত্তি টেকেনি। আইনটি পাস হওয়ায় এক প্রকারের চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে সাংবাদিক মহলে। বুধবার সংসদে আইনটি পাস হওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকজুড়ে চলছে নানা আলোচনা। সাংবাদিকদের সব থেকে বড় সংগঠন ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের অর্থ সম্পাদক দীপ আজাদ তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘সাংবাদিকদের আপত্তি কেউ কানে নিলো না! বিতর্কিত ৫৭ ধারার বিষয়গুলো চারটি ধারায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়েছে। ফিরিয়ে আনা হলো সমালোচিত আইন ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের রক্ষাকবচ এই আইন। তথ্য লুকানোর আইন হলো। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়।’ স্ট্যাটাসটির কমেন্টবক্সও ছেয়ে গেছে সাংবাদিকদের হতাশামিশ্রিত মন্তব্যে। কেউ কেউ বলেছেন, ‘প্রেস রিলিজ প্রকাশ করা ছাড়া সাংবাদিকদের আর কোনো কাজ থাকল না। মাঝে মধ্যে ক্ষমতাসীনদের গুণকীর্তন করে দু’চারটা প্রতিবেদন করলেই চলবে, আর হয়তো কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে হবে না। কারণ, অধিকাংশ সময়ে অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে বিভিন্নভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে থাকেন, যা এই ধারা বলে এই অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট আইনের আওতায় পড়বে। সাংবাদিকদের পেশাদারিত্বের স্বার্থেই নানা সময়ে নানা কৌশল অবলম্বন করতে হয়। কখনো কখনো মিথ্যারও আশ্রয় নেয়া হয়। অনুসন্ধানের শেষ ধাপে এসে এ কৌশল অবলম্বন করতে হয়। যেটাকে আন্ডার কভার সাংবাদিকতা বলে। বিশ্বব্যাপী এসব অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনের প্রতি জনগণের আগ্রহও রয়েছে। রয়েছে রাষ্ট্রীয় কল্যাণও। এমন অনেক সংবাদই দেশে-বিদেশে নানা সময়ে আলোড়িত হয়েছে। শুধ– কি সাংবাদিকরা সত্য উদ্ঘাটনে কৌশল অবলম্বন করেন? রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দাবাহিনী থেকে শুরু করে অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে কৌশল অবলম্বন করা হয়। ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এক সন্দেহভাজন বোমা হামলাকারীকে ধরতে এফবিআই এজেন্ট অ্যাসোসিয়েট প্রেসের সাংবাদিক সেজে একটি সংবাদ প্রচার করেছিল। এফবিআইয়ের পরিকল্পনা ছিল এপির করা ওই সংবাদে যদি সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজন বোমা হামলাকারী ক্লিক করে তবে এফবিআই সেই বোমা হামলাকারীর কম্পিউটারে প্রবেশ করতে পারবে। এফবিআইয়ের ফাঁদে পা দিয়ে ফেক নিউজের লিংকটিতে ক্লিক করে বোমা হামলাকারী। এভাবেই এফবিআই এজেন্ট এপির সাংবাদিক সেজে যুক্তরাষ্ট্রের এক সন্দেহভাজন বোমা হামলাকারীকে আটক করে। এপির প্রধান নির্বাহী গ্যারি প্রুয়িট এক খোলা চিঠিতে বলেন, সন্দেহভাজন বোমা হামলাকারীকে শনাক্ত করতে গিয়ে এফবিআই এপির সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করায় বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকতা পেশা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
এফবিআইয়ের পরিচালক জেইমস কমলি তাদের এই পদক্ষেপকে নৈতিক ও আইনসিদ্ধ দাবি করে বলেন, সেই সময়ে জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের গাইডলাইন অনুযায়ী এই পদ্ধতিটি বিধিসম্মত ছিল। তবে বর্তমানে এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার আগে এখন সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হতে পারে। এই প্রক্রিয়াটি আইনসম্মত ও যথাযথ। শুধু গণমাধ্যমকর্মী নয়, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকেও এ ধরনের গোপনীয়তা রক্ষা করে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর সমাধান করতে হয়। যা রাষ্ট্রের কল্যাণেই করা হয়ে থাকে। একটি আইন পাস করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় নিরুৎসাহিত করা রাষ্ট্রের জন্যই ক্ষতিকর। আজ অবধি কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদনই রাষ্ট্রের ক্ষতির কারণ হয়নি বরং নানা সময়ে, নানা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ফলে রাষ্ট্র অনেক ভয়াবহ ক্ষতি থেকে রক্ষা পেয়েছে। এটি নিরুৎসাহিত করলে পক্ষান্তরে রাষ্ট্রেরই ক্ষতি ডেকে আনা বৈকি! শুধু ক্ষমতাসীনদের গুণকীর্তন করা, প্রেস রিলিজ প্রকাশ করা আর লাশ উদ্ধার, হারিয়েছে, মানববন্ধনের খবর প্রকাশের নাম সাংবাদিকতা নয়। এতে রাষ্ট্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জনগণের জানার বাইরে থেকে যায়। এ আইন বলবৎ থাকলে রাষ্ট্র ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়ার প্রাক্কালেও সাংবাদিকদের কিছু করার থাকবে না। ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ যত বড় অপরাধ আছে তা নিশ্চয়ই কেউ প্রকাশ্যে বা প্রমাণ রেখে করেন না। করতে চানও না। সাংবাদিকদের কৌশল অবলম্বন করে, নানা উপায়ে এসব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে হয়। ফলে রাষ্ট্রের কথা চিন্তা করেই অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট নামে পাস হওয়া আইনসহ সাংবাদিকদের আপত্তির বিষয়গুলো নিয়ে আরেকবার ভাবা সময়ের দাবি।